kalerkantho

মঙ্গলবার । ৪ মাঘ ১৪২৮। ১৮ জানুয়ারি ২০২২। ১৪ জমাদিউস সানি ১৪৪৩

অরক্ষিত রেলপথে বছরে মৃত্যু ১৭৮ জনের

সজিব ঘোষ   

৯ ডিসেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



অরক্ষিত রেলপথে বছরে মৃত্যু ১৭৮ জনের

পাঁচ দিন আগের কথা। গত শনিবার সকালে চট্টগ্রামের খুলশী এলাকার জাকির হোসেন রোডের লেভেলক্রসিংয়ে ট্রেনের ধাক্কায় পুলিশসহ মারা যায় তিনজন। চট্টগ্রামের এই ঘটনার দুই দিন পর গত মঙ্গলবার ময়মনসিংহের গৌরীপুরের শ্যামগঞ্জ লেভেলক্রসিংয়ে ট্রেনের ধাক্কায় আরো একজনের মৃত্যু হয়। এ সময় অন্য একজনের পা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

অরক্ষিত লেভেলক্রসিংয়ে ট্রেনের ধাক্কায় মৃত্যুর সঙ্গে রেলপথে কাটা পড়ে মৃত্যুর ঘটনাও ঘটছে অহরহ। গতকাল বুধবারই নীলফামারীতে ট্রেনে কাটা পড়ে তিন ভাই-বোনসহ চারজন নিহত হয়েছে। আর মঙ্গলবার রাতে ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জের সেনুয়ায় ট্রেনে কাটা পড়ে একজনের মৃত্যু হয়।

ট্রেনে কাটা পড়ে এ বছর কত মানুষ মারা গেছে, সেই সংখ্যা জানাতে পারেননি ঢাকা জেলা রেলওয়ের পুলিশ সুপার সাইফুল্লাহ আল মামুন। তবে রেল পুলিশের একটি সূত্র বলছে, এ বছর এখন পর্যন্ত দেড় শতাধিক মানুষ ট্রেনে কাটা পড়ে বা ট্রেনের ধাক্কায় মারা গেছে। দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরে রেলপথে ৮৫৫

দুর্ঘটনায় ৯১৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। সেই হিসাবে গেল ছয় বছরে গড়ে প্রতিবছর ১৭৮ জন করে মানুষ রেললাইনে মারা পড়েছে।

রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, সারা দেশে তিন হাজার কিলোমিটার রেলপথে থাকা তিন হাজার ৩৯৮টি ক্রসিংয়ের মধ্যে এক হাজার ৩৬১টি অবৈধ। আর বৈধ-অবৈধ ক্রসিংয়ের মধ্যে অরক্ষিত দুই হাজার ৫৪টি। অবৈধ ক্রসিংয়ের বেশির ভাগেই স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগ (এলজিইডি) ও ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) রাস্তা।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের (এআরআই) এক গবেষণার তথ্য বলছে, দেশের মোট অবৈধ লেভেলক্রসিংয়ের মধ্যে ইউনিয়ন পরিষদ ও এলজিইডির রাস্তা রয়েছে ৪২৭টি করে, সড়ক ও জনপথ বিভাগের ২৪, পৌরসভার ১১০, সিটি করপোরেশনের ৩২, একাধিক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের রয়েছে ২৭, জেলা পরিষদের ১৩ ও চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের তিনটি। এ ছাড়া ১২৭টি ক্রসিং কার আওতায় আছে তা জানা যায়নি।

ট্রেন দুর্ঘটনায় এমন মৃত্যুর দায় মূলত কার—সেই সমীকরণ মেলানো কঠিন বলে মনে করছেন বাংলাদেশ রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অবকাঠামো) মো. কামরুল আহসান। তিনি বলেন, ‘এ ক্ষেত্রে মানুষের সচেতনতা বাড়ানো উচিত। রেলপথ হাঁটার জন্য না। আমাদের দেশের যে বাস্তব অবস্থা, এতে পুরো রেলপথ ঘিরে সংরক্ষিত রাখা সম্ভব নয়। সব বৈধ লেভেলক্রসিংয়ে গেটম্যান আছে। তবু বলব, রেলপথ পার হওয়ার সময় মানুষকে সাবধান হতে হবে।’

যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক শামছুল হক ট্রেন দুর্ঘটনায় মানুষের মৃত্যুর জন্য দায়ী করলেন অসমন্বিত উন্নয়নকে। তিনি বলেন, ‘সব জায়গায় বৈধ লেভেলক্রসিং থাকলে এত মৃত্যু হতো না। সড়কের সঙ্গে রেলের কোনো সমন্বয় নেই। এই সমন্বয়ের দায়িত্ব পরিকল্পনা কমিশনকে নিতে হবে। উন্নয়ন করে যদি গতি কমিয়ে সমাধান করতে হয়, তাহলে উন্নয়নের মাধ্যমে গতি বাড়ানোর দরকার কি?’

লেভেলক্রসিংয়ে দুর্ঘটনার কারণ জানতে চাইলে ঢাকা জেলা রেলওয়ে পুলিশ সুপার সাইফুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘ট্রেন আসার আগে সিগন্যালে সবাইকে থামতে বলে সতর্ক করা হয়। এর পরও অনেক সময় অনেকে তা মানতে চায় না। মানুষ সচেতন না হলে এ ধরনের মৃত্যু কোনোভাবে বন্ধ করা যাবে না।’

বাংলাদেশ রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (পরিচালক) সরদার শাহাদাত আলী বলেন, ‘ট্রেনের এমন দুর্ঘটনা কমানোর জন্য সচেতনতার বিকল্প নেই। দুই পক্ষকেই সচেতন হতে হবে। রেলপথ মানুষের চলাচলের জন্য নয়। রেলের যত গেট আছে, সেটা বৈধ হোক অবৈধ হোক, সব জায়গাতেই সাবধানতা চিহ্ন দেওয়া থাকে। যতটুকু সম্ভব রেলপথ ঘিরে রাখা হয়। আবার আমাদের দিক থেকেও সক্ষমতা আরো বাড়াতে হবে।’

জানতে চাইলে রেলওয়ে প্রধান যান্ত্রিক প্রকৌশলী (পূর্ব) মো. বোরহান উদ্দিন বলেন, ‘একেক লোকোমোটিভের (ইঞ্জিন) সক্ষমতা একেক রকম। আগে মিটারগেজ রেলপথের জন্য এক হাজার ৬০০ হর্স পাওয়ারের লোকোমোটিভ বেশি ব্যবহার হতো। এখন নতুন ইঞ্জিনগুলো দুই হাজার ২০০ হর্স পাওয়ারের হয়। চাইলেই একটা ইঞ্জিনকে তত্ক্ষণাত্ থামানো সম্ভব নয়। এর সঙ্গে ওজন ও গতিসহ অনেক কিছুই যুক্ত থাকে।’



সাতদিনের সেরা