kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৩ মাঘ ১৪২৮। ২৭ জানুয়ারি ২০২২। ২৩ জমাদিউস সানি ১৪৪৩

বিতর্কিতদের হাতেও নৌকা

তৈমুর ফারুক তুষার   

৯ ডিসেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



বিতর্কিতদের হাতেও নৌকা

ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনের পঞ্চম ধাপেও আওয়ামী লীগের প্রার্থী তালিকা নিয়ে চলছে তুমুল বিতর্ক। এই তালিকায় রয়েছে সাবেক জেএমবি নেতা, সাবেক বিএনপি নেতা ছাড়াও হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ড পাওয়া ব্যক্তিদের নাম। আছে চাল আত্মসাতের অভিযোগে সাময়িক বরখাস্ত হওয়া এক চেয়ারম্যানের নামও। তিনটি ইউনিয়নে দেওয়া হয়েছে গেল নির্বাচনে দলীয় বিদ্রোহী প্রার্থীদের মনোনয়ন।

বিজ্ঞাপন

দলীয় তৃণমূলের যাচাই-বাছাইয়ে এক ভোট পাওয়া নেতার হাতেও উঠেছে আওয়ামী লীগের প্রতীক নৌকা।

এর আগের চারটি ধাপের ইউপি নির্বাচনের আওয়ামী লীগের মনোনয়ন তালিকা নিয়েও বিতর্ক উঠেছিল। পরে স্থানীয় নেতাকর্মীদের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে কিছু কিছু মনোনয়ন পাল্টানো হয়।

গত ২ ডিসেম্বর থেকে পঞ্চম ধাপের ইউপি নির্বাচনের প্রার্থী ঘোষণা শুরু করে আওয়ামী লীগ। এই তালিকায় বিতর্কিত ব্যক্তিরা স্থান পাওয়ায় মনোনয়নপ্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তৃণমূলের নেতাকর্মীরা। কোনো কোনো এলাকায় বিক্ষুব্ধ নেতাকর্মীরা প্রতিবাদ সমাবেশও করেছেন। সাভারের আমিনবাজারের আলোচিত ছয় ছাত্র হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ড পাওয়া ব্যক্তিও মনোনয়ন তালিকায় ঠাঁই পেলে ক্ষোভে ফুঁসে ওঠেন স্থানীয় নেতাকর্মীরা। পরে সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে মনোনয়ন বোর্ড।

গত শনিবার রাত ১০টা ৫ মিনিটে গণমাধ্যমে পাঠানো আওয়ামী লীগের প্রার্থী তালিকায় ঢাকার সাভারের আমিনবাজার ইউনিয়নে আনোয়ার হোসেনের নাম ছিল। গত ২ ডিসেম্বর সাভারের ছয় ছাত্র হত্যা মামলায় আনোয়ারের মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষিত হয়। তিনি মনোনয়ন পাওয়ায় স্থানীয় নেতাকর্মীরা বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। এই প্রেক্ষাপটে মনোনয়ন ঘোষণা করার এক ঘণ্টা পরই তা বদলানো হয়। ওই দিনই আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক বিপ্লব বড়ুয়া স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, প্রকাশিত তালিকায় অসাবধানতাবশত একটি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান পদে মনোনীত প্রার্থীর বদলে ভুল নাম লিপিবদ্ধ করা হয়। আমিনবাজার ইউনিয়নে রকিব আহম্মেদ আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়েছেন।

সিরাজগঞ্জের তাড়াশের সগুনা ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়েছেন ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সভাপতি ও বিএনপির সাবেক নির্বাচিত চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম চৌধুরী। এ মনোনয়নের বিরুদ্ধে এরই মধ্যে সগুনা ইউনিয়নে বিক্ষোভ করেছেন আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা। বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে নজরুল ইসলাম বলেন, ‘আমি বর্তমানে তাড়াশ উপজেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি। ’

পাঁচ বিদ্রোহী প্রার্থী পেয়েছেন নৌকা : আওয়ামী লীগের মনোনয়ন তালিকায় গেল নির্বাচনের তিন বিদ্রোহী প্রার্থীর নাম রয়েছে। তাঁরা গেলবার আওয়ামী লীগের প্রার্থীর বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। দ্বিতীয় ধাপের নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগের নীতি নির্ধারণী পর্যায়ের নেতারা জানিয়েছিলেন, বিদ্রোহীরা এবার মনোনয়ন পাবেন না। কিন্তু পঞ্চম ধাপের প্রার্থী তালিকায় আওয়ামী লীগের সেই অবস্থান নড়বড়ে দেখা গেছে।

মুন্সীগঞ্জের গজারিয়া ইউনিয়নে মনোনয়ন পেয়েছেন মো. শফিউল্লাহ। তিনি গেল নির্বাচনে নৌকার বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন।

গত ১ ডিসেম্বর গজারিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে মনোনয়ন বোর্ডের কাছে পাঠানো প্রার্থী তালিকায় তিনজনের মধ্যে সবশেষে ছিল শফিউল্লাহর নাম। তৃণমূল আওয়ামী লীগের ভোটের ফলাফলে দেখা যায়, অন্য দুই প্রার্থী পান আটটি করে ভোট, শফিউল্লাহ পান মাত্র এক ভোট। মনোনয়ন বোর্ডের কাছে পাঠানো তালিকায় এ ভোটের ফলও উল্লেখ করা ছিল। তার পরও শফিউল্লাহই পান মনোনয়ন। গত নির্বাচনে রাজশাহীর বাগমারার দুটি ইউনিয়নে বিদ্রোহী প্রার্থী মনোনয়ন পেয়েছেন। হামিরকুৎসা ইউনিয়নে নৌকার বিরুদ্ধে ভোট করে জয়ী হয়েছিলেন আনোয়ার হোসেন। যোগীপাড়া ইউনিয়নে বিদ্রোহী প্রার্থী হয়ে পরাজিত হয়েছিলেন এম এফ মাজেদুল। দুজনকেই এবার নৌকার প্রার্থী করা হয়েছে।

নওগাঁর পত্নীতলার দুটি ইউনিয়নেও গেল নির্বাচনের বিদ্রোহী প্রার্থী এবার মনোনয়ন তালিকায় ঠাঁই পেয়েছেন। ২০১৬ সালে অনুষ্ঠিত মাটিন্দর ইউপি নির্বাচনে জাহাঙ্গীর আলম এবং পত্নীতলা ইউনিয়নে মোশারফ হোসেন চৌধুরী আওয়ামী লীগের মনোনয়ন না পেয়ে বিদ্রোহী প্রার্থী হন। দুজনই এবার মনোনয়ন বাগিয়ে নিয়েছেন।

রাজশাহী থেকে আমাদের নিজস্ব প্রতিবেদক রফিকুল ইসলাম জানান, বাগমারার গোয়ালকান্দি ইউনিয়নের জেএমবি নেতা আলমগীর হোসেন এবারও আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়েছেন। আলমগীরের সঙ্গে জেএমবির শীর্ষ নেতা সিদ্দিকুর রহমান ওরফে বাংলা ভাইয়ের একাধিক ছবি ও ভিডিও ফুটেজ এখনো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আলোচিত। তাঁর বিরুদ্ধে হত্যাচেষ্টা, লুটপাট, ভাঙচুরসহ অন্তত পাঁচটি মামলা এখনো বিচারাধীন।

গোয়ালকান্দি ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি জাহেদুল ইসলাম বলেন, ‘আলমগীর এলাকায় অশান্তি ছাড়া কিছুই দিতে পারেননি। তিনি বাংলা ভাইয়ের সহযোগী ছিলেন। ’

জানতে চাইলে আলমগীর হোসেন বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে বেশ কয়েকটি মামলা দেওয়া হয়েছিল। তবে আমি বাংলা ভাইয়ের সঙ্গে ছিলাম না। দলের জন্য কাজ করি বলেই দল আমার প্রতি আস্থা রেখে এবারও নৌকা দিয়েছে। ’

বাগমারা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক গোলাম সারওয়ার বলেন, ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ মনোনয়নপ্রত্যাশীদের তালিকা করে উপজেলা কমিটিতে দিয়েছে। উপজেলা কমিটি সেটা জেলায় দিয়েছে, জেলা কেন্দ্রে পাঠিয়েছে। তালিকায় চার-পাঁচজনের নাম ছিল। কেন্দ্র যাঁকে পছন্দ করেছে, তাঁকে মনোনয়ন দিয়েছে।

রাজশাহী জেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও বাগমারা উপজেলা চেয়ারম্যান অনিল কুমার সরকার বলেন, ‘আমি এসব বিষয়ে মন্তব্য করতে পারব না। দল যাকে মনোনয়ন দিয়েছে, তিনিই আমাদের প্রার্থী। ’

আমাদের ভোলা সংবাদদাতা ইকরামুল আলম জানান, ভোলা সদরের রাজাপুর ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়েছেন বর্তমান চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান খান। তিনি গত বছর দুর্নীতির অভিযোগে সাময়িক বরখাস্ত হয়েছিলেন। গত ১৩ সেপ্টেম্বর উচ্চ আদালত এক আদেশে মিজানুর রহমানকে বরখাস্তের সিদ্ধান্তটি তিন মাসের জন্য স্থগিত করেন। এই স্থগিতাদেশ আগামী ১৩ ডিসেম্বর শেষ হবে।

২০২০ সালের ২৩ মার্চ তৎকালীন ভোলা সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে রাজাপুর ইউপি চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান খানের বিরুদ্ধে ১২ ইউপি সদস্য লিখিত অভিযোগ দেন। তাঁরা অভিযোগপত্রে উল্লেখ করেন, মিজানুর রহমান সরকারি গাছ দরপত্র ছাড়াই কেটে দুই লাখ টাকায় বিক্রি করেন। তিনি টাকার বিনিময়ে বয়স্ক ভাতা, বিধবা ও স্বামী পরিত্যক্তা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা বিতরণ করেছেন। ঘুষ নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর উপহারের ঘর ও মুক্তিযোদ্ধার ঘর বরাদ্দ দিয়েছেন। সর্বশেষ জেলেদের জন্য বরাদ্দ হওয়া চালের ৪০ মেট্রিক টন আত্মসাৎ করেছেন।

অভিযোগের পর মিজানুর রহমানের দুর্নীতি তদন্তে ভোলার জেলা প্রশাসক একটি কমিটি করেন। তদন্তে অপরাধের প্রমাণ মিললে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের কাছে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সুপারিশ করা হয়। পরে ওই বছরের ২৩ এপ্রিল স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় মিজানুর রহমান খানকে সাময়িক বরখাস্ত করে।

জানতে চাইলে ভোলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবদুল মমিন টুলু বলেন, ‘বিগত সময়ে দুর্নীতির অভিযোগে রাজাপুরের চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান সাময়িক বরখাস্ত হওয়ায় এবং তৃণমূল নেতাদের ভোট মূল্যায়ন করে অন্য একজন প্রার্থীর নাম এক নম্বরে রেখে মনোনয়ন বোর্ডের কাছে তালিকা পাঠিয়েছিলাম। ’

অভিযোগের ব্যাপারে মিজানুর রহমান বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে যত অভিযোগ উঠেছে, সব মিথ্যা। আমি ষড়যন্ত্রের শিকার। ’

জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের স্থানীয় সরকার জনপ্রতিনিধি মনোনয়ন বোর্ডের সদস্য আব্দুর রহমান বলেন, ‘বিতর্কিতদের মনোনয়ন দেওয়ার অভিযোগ একেবারেই সত্য নয়। ’



সাতদিনের সেরা