kalerkantho

বুধবার । ১২ মাঘ ১৪২৮। ২৬ জানুয়ারি ২০২২। ২২ জমাদিউস সানি ১৪৪৩

৫ কোটি টাকার সৌরবাতি ৬ বছরেই অকেজো

মাদারীপুর সংবাদদাতা   

৮ ডিসেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



৫ কোটি টাকার সৌরবাতি ৬ বছরেই অকেজো

মাদারীপুরের রাজৈর পৌর শহরের ৫১৭টি স্থানে প্রায় পাঁচ কোটি টাকা খরচ করে স্থাপন করা হয়েছিল সৌর সড়ক বাতি (খুঁটিসহ)। কিন্তু স্থাপনের পাঁচ-ছয় মাস পর থেকেই বাতি নষ্ট হতে থাকে। আর ছয় বছরে অকেজো হয়ে পড়েছে বেশির ভাগ বাতি। সচল বাতিগুলোও জ্বলে নিভু নিভু করে।

বিজ্ঞাপন

পৌরবাসীর অভিযোগ, বাতি ও খুঁটিগুলো রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়নি। এগুলোর মানও ভালো না। বেশ কিছু বাতি, খুঁটি ভেঙে গেছে। বাতি ঠিকমতো জ্বলছে কি না, মাঝে মাঝে তা পরীক্ষা এবং মেরামত করার কথা থাকলেও স্থাপনের পর কাউকে তারা তা করতে দেখেনি। তা ছাড়া সব সড়কে সৌরবাতি স্থাপন করা হয়নি। ফলে রাতে শহরের সড়কে আলো না থাকায় বেড়েছে চুরি-ছিনতাইয়ের ঘটনা। বাতি রক্ষণাবেক্ষণ ও দ্রুত টেকসই বাতি স্থাপনের দাবি জানিয়েছে এলাকাবাসী।

পৌরসভা কার্যালয় থেকে জানা যায়, ১১ বর্গকিলোমিটার আয়তনের রাজৈর পৌরসভা ২০১২ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে সরকারের জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ডের অর্থায়নে রাজৈর পৌর শহরে ৫১৭টি সৌর সড়ক বাতি স্থাপন করে ঢাকার পল্লী দারিদ্র্য বিমোচন ফাউন্ডেশন নামের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। এই প্রকল্পে ব্যয় হয় চার কোটি ৯৯ লাখ টাকা। ২০১৫ সালের ৩০ জুনের মধ্যে বাতিগুলো স্থাপন করা হয়। বাতিগুলো স্থাপনকারী প্রতিষ্ঠানের দুই বছর মেরামতের দায়িত্ব ছিল। তারপর থেকে রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে পৌর কর্তৃপক্ষ।

‘গ’ শ্রেণির এই পৌরসভার ৬ নম্বর ওয়ার্ডের কুণ্ডুপাড়ায় গিয়ে দেখা যায়, সড়কের পাশে মাটিতে কয়েকটি সৌরবাতির খুঁটি ভেঙে পড়ে আছে। সঙ্গে তার ও অন্যান্য যন্ত্রাংশ পানি-কাদায় লেপ্টে আছে। কিছু খুঁটি দাঁড়িয়ে থাকলেও বাতিগুলো অকেজো। কুণ্ডুপাড়ার বাসিন্দা সুজন কুণ্ডু বলেন, ‘আমার বাড়ির গেটের সামনেই রাস্তার পাশে একটি সৌরবাতি প্রায় এক বছর ধরে পড়ে আছে। পৌরসভা থেকে এখনো কেউ খোঁজ নিতে আসেনি। খুঁটিটি নিয়েও যায়নি। ’

৮ নম্বর ওয়ার্ডের আলমদস্তার মোল্লাবাড়ি গলির বাসিন্দা মো. জসিম হোসেন ও জাহাঙ্গীর শিকদার জানান, তাঁদের গলির প্রায় সব বাতি অনেক বছর ধরেই নষ্ট। অনেকগুলো ভেঙে পড়ে গেছে। দু-একটা জ্বলে নিভু নিভু করে।

রাজৈর বাসস্ট্যান্ডের তিন্নি ভিলার সামনেই একটি সৌরবাতির খুঁটি হেলে পড়ে আছে। খুঁটির মাথায় সৌরবাতির অর্ধেক দেখা গেল। শানেরপাড় মোড় এলাকায় খুঁটিতে বাতির একটি অংশ ভেঙে ঝুলে আছে। কয়েক বছর ধরে এখানে বাতি জ্বলে না। পুরো শহরের অলিগলিতে প্রায় একই চিত্র।

শহরের দক্ষিণপাড়ার বাসিন্দা মো. হায়দার ফকির বলেন, ‘কোটি কোটি টাকা খরচ করে লাইটগুলো বসাইল। এহন তো জ্বলে না। রাতে রাস্তাগুলো অন্ধকার থাকায় চুরি-ছিনতাইয়ের ঘটনা বেড়েছে। ’

টেকেরহাটের বাসিন্দা করিম বলেন, ‘টেকেরহাট বন্দর এলাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখানের রাস্তার লাইটগুলো জরুরি ভিত্তিতে মেরামত বা নতুন করে স্থাপন করা দরকার। তাহলে চুরি-ছিনতাই অনেক কমে যাবে। মানুষ নির্ভয়ে চলাফেরা করতে পারবে। ’

বেপারীপাড়ার রিফাত হোসেন বলেন, ‘স্থাপনের পর এসব বাতি খুব বেশি দিন জ্বলেনি। কোথাও খুঁটি চুরি হয়ে গেছে। এসব এখন কেউ দেখে না। আমাদের পৌর নাগরিকদের অনেক সমস্যা হচ্ছে। ’

রাজৈর পৌরসভার মেয়র নাজমা রশিদ বলেন, ‘শহরের সড়কের বাতি স্থাপনের কাজ আগের মেয়রের আমলে হয়েছিল। বর্তমানে পৌরসভায় জনবলের অভাব রয়েছে। তার পরও দায়িত্ব নেওয়ার পর যে কম্পানি বাতিগুলো স্থাপন করেছিল, আমরা তাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। তাদের টেকনিশিয়ান দিয়ে নষ্ট বাতিগুলো ঠিক করা যায় কি না দেখছি। তবে আমি নতুনভাবে সড়কবাতি স্থাপনের জন্য স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে গিয়েছিলাম। তারা নতুন প্রকল্প দিতে বলেছে। আমরা প্রকল্প তৈরি করছি। ’

রাজৈর পৌরসভার সাবেক মেয়র শামীম নেওয়াজ মুন্সী বলেন, ‘সড়কবাতি স্থাপন প্রকল্পটি পল্লী দারিদ্র্য বিমোচন ফাউন্ডেশন বাস্তবায়ন করেছিল। তাদের দুই বছর পর্যন্ত সার্ভিস করার কথা ছিল। আমি মেয়র থাকার সময় মেরামতের জন্য অনেকবার তাদের খবর দিয়েছি, কিন্তু তারা তেমন সাড়া দেয়নি। তা ছাড়া এগুলো সংরক্ষণের জন্য পৌরসভার টেকনিশিয়ান ছিল না। এখন এগুলোর বয়স ছয় বছরের বেশি হয়ে গেছে। ’

মাদারীপুর উন্নয়ন সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি অ্যাডভোকেট মাসুদ পারভেজ বলেন, ‘রাজৈর পৌরবাসীর সুবিধার জন্য জলবায়ু ট্রাস্টের পাঁচ কোটি টাকা খরচ করে সড়কবাতিগুলো বসানো হয়েছিল। অথচ বাতিগুলো কয়েক বছরের মধ্যে অকেজো হয়ে গেল। এখন বাতিগুলো দেখভাল করারও কেউ নেই। প্রকল্পটি জনগণের কোনো কাজে আসছে না। তাই আমরা বলতে পারি, প্রকল্পটির মূল উদ্দেশ্য ছিল লুটপাট করা। তা-ই করা হয়েছে। ’

তিনি বলেন, ‘সরকারের অর্থ সঠিকভাবে টেকসই উন্নয়নে ব্যয় করা উচিত। রাজৈরবাসীর নাগরিক সেবার মান বাড়াতে উন্নতমানের সৌরবাতি স্থাপনের দাবি জানাচ্ছি। ’

 



সাতদিনের সেরা