kalerkantho

বুধবার । ১২ মাঘ ১৪২৮। ২৬ জানুয়ারি ২০২২। ২২ জমাদিউস সানি ১৪৪৩

গরিবের মুখে পানি দিতেও চুরি

মো. মোস্তাফিজুর রহমান কমলগঞ্জ (মৌলভীবাজার)   

৬ ডিসেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



গরিবের মুখে পানি দিতেও চুরি

কমলগঞ্জের শ্রীনাথপুর গ্রামের উপকারভোগীর নলকূপের গোড়ায় পাকা করা হয়নি। ছবি : কালের কণ্ঠ

বাসাবাড়িতে একটি নলকূপ (অগভীর নলকূপ বা শ্যালো টিউবওয়েল) বসাতে কত খরচ হয়? মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলা সদরের দোকানি ও কারিগরদের কাছে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, কলতলা পাকা করাসহ একটি নলকূপ বসাতে খরচ পড়বে ১১ হাজার থেকে ১২ হাজার টাকা। কোথাও যদি পাইপ বেশি লাগে আর পাকা জায়গাটা যদি বড় করা হয়, তাহলে হয়তো আরো দু-তিন হাজার টাকা বেশি লাগতে পারে। সব মিলিয়ে গড়ে ১৩ থেকে ১৪ হাজার টাকায় ভালোভাবে কাজ সারা সম্ভব।

অথচ এই কমলগঞ্জের বিভিন্ন ইউনিয়নের দারিদ্র্যপীড়িতদের জন্য সরকারিভাবে যে নলকূপ বসানো হয়েছে, এর জন্য বরাদ্দ ধরা হয়েছে প্রতিটি ৩০ হাজার টাকা।

বিজ্ঞাপন

তার পরও নিয়মমতো কাজগুলোও করা হয়নি। কোথাও কোথাও কাজ না করেও, অর্থাত্ নলকূপ না বসিয়েই পুরো কাজের বিল তুলে নেওয়া হয়েছে। এভাবে অসহায় গ্রামবাসীর কল্যাণে সরকারের নেওয়া প্রকল্পের বেশির ভাগ টাকাই লুটে নেওয়া হয়েছে।

মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলা পরিষদ প্রতিবছর এডিপির (বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি) বরাদ্দ থেকে ইউপি চেয়ারম্যানদের জন্য টেন্ডার ছাড়াই প্রজেক্ট কমিটির মাধ্যমে দুই লাখ টাকার প্রকল্প নেওয়ার সুযোগ দেয়। চেয়ারম্যানরা ইচ্ছানুযায়ী একটি করে প্রকল্প নিতে পারেন। এসব প্রকল্পের ব্যয় নির্ধারণ করে দেয় উপজেলার স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)। এবারও চেয়ারম্যানদের পছন্দের প্রকল্প হচ্ছে ‘উপজেলা/ইউনিয়নের বিভিন্ন ওয়ার্ডে অগভীর নলকূপ স্থাপন’। এ প্রকল্পে চেয়ারম্যানরা কখনো নিজে, কখনো বা তাঁর পছন্দের ইউপি সদস্যকে প্রকল্প সভাপতি বানাতে পারেন। সদ্যঃসমাপ্ত অর্থবছরে এই খাতে কমলগঞ্জ উপজেলায় মোট ৯ লাখ পাঁচ হাজার টাকা ব্যয়ে পাঁচটি প্রকল্প বাস্তবায়ন দেখানো হয়েছে (একেক প্রকল্পে দুই লাখ টাকা করে পাঁচ প্রকল্পে মোট বরাদ্দ ১০ লাখ টাকা হলেও ১৯ হাজার টাকা করে ভ্যাট-ট্যাক্স বাদ দিয়ে এই খরচ হয়েছে)। বলা হয়েছে, একেকটি প্রকল্পে ছয়টি করে মোট ৩০টি নলকূপ বসানো হয়েছে।

গত ১৮ আগস্ট আলীনগর ইউনিয়নের বারামপুর জামে মসজিদে বসানো নলকূপটি অকেজো পড়ে থাকতে দেখা গেল। মসজিদ কমিটির সেক্রেটারি ছোরাব মিয়া জানান, মাস তিনেক আগে চেয়ারম্যান ফজলুল হক বাদশা নলকূপটি বসিয়ে গেছেন, কিন্তু পানিতে অতিরিক্ত আয়রন থাকায় ব্যবহার করা যায় না। তাই নলকূপের মাথা খুলে রেখে দিয়েছেন তিনি। ‘পাইপ কত ফুট’—জানতে চাইলে তিনি বলেন, ১২০ ফুট।

একই ইউনিয়নের শ্রীনাথপুর গ্রামের সালমা বেগমের স্বামী জানান, তাঁর নলকূপেরও পাইপ দেওয়া হয়েছে ১১৫ ফুট। কলতলা পাকা করা হয়নি। আলীনগর চা-বাগানের মিন্টু নায়েক বললেন, তাঁর নলকূপের পাইপ ৬৫ ফুট নিচে দেওয়ার পর পানি না ওঠায় এক হাত দূরে সরিয়ে মিস্ত্রির খরচ নিজে দিয়ে নলকূপটি স্থাপন করেছেন। কলতলা পাকা করে দেওয়া হয়নি। এই ইউনিয়নের ছয়টি নলকূপের কোনোটিতেই সাইনবোর্ড দেখা যায়নি।

চেয়ারম্যান ফজলুল হক বাদশার কাছে জানতে চাইলে কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, সাধারণ নলকূপ ১২০-১৫০ ফুটের বেশি যায় না। যেগুলো বসানো হয়েছে, তা ১৫০ ফুটের মধ্যেই। ডিপ টিউবওয়েল ৩০০ ফুটের বেশি লাগে।

দরপত্র শিডিউলে ৩০৫ ফুট ধরা হয়েছে কেন—জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, ‘সেটা আমি জানি না। ’

আলীনগর প্রকল্পের সভাপতি চেয়ারম্যান ফজলুল হক বাদশা ছাড়াও অন্য চারটি প্রকল্পের সভাপতিরা হলেন উপজেলা নারী ভাইস চেয়ারম্যান বিলকিস বেগম, উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান রামভজন কৈরী, মাধবুপর ইউপি চেয়ারম্যান পুষ্প কুমার কানু ও ৫ নম্বর কমলগঞ্জ ইউপির সদস্য আব্দুল মতিন।

এই পাঁচজনের পাঁচটি প্রকল্পের ৩০টি নলকূপের প্রতিটির ব্যয় দেখানো হয়েছে ৩০ হাজার ১৬৭ টাকা করে। প্রতিটি নলকূপের দরপত্রে হাতলসহ মাথা ৩০২৯ টাকা, আজিজ কম্পানির ডি পাইপ ৩০৫ ফুট ১০ হাজার ৩৭০ টাকা, ১০ ফুট জিআইপাইপ এক হাজার ৮৩০ টাকা, তলা পাকাকরণ পাঁচ হাজার ৮০৪ টাকা, ফিল্টার এক হাজার ৮৯ টাকা, সাইনবোর্ড পাঁচ হাজার টাকা, ক্যাপ সলিউশনসহ আনুষঙ্গিক আরো ব্যয় ধরা আছে।

কিন্তু ভানুগাছ বাজারের হার্ডওয়্যারের দোকান তৌশি এন্টারপ্রাইজের মালিক মোস্তফা কামাল ও শাহ মোস্তফা এন্টারপ্রাইজের মালিক আব্দুল মুক্তাদির জানান, তাঁরা নলকূপের হাতলসহস মাথা দুই হাজার ৫০০ টাকা, পাইপের ফুট ২২ টাকা (আরএফএল ডি), ফিল্টার ৬৫০ টাকা, জিআইপাইপ তিন ফুট ৩৫০ টাকা ও একটা সলিউশসন ১৫০ টাকায় বিক্রি করেন। আজিজ ডি পাইপ কমলগঞ্জে পাওয়া যায় না।

নছরতপুরের টিউবওয়েল মিস্ত্রি রইছ মিয়া ও খোকন মিয়া, আদমপুরের সিদ্দেক মিয়া জানান, নলকূপ বসাতে তাঁরা পাইপের প্রতি ফুট ২০-২১ টাকা করে নেন। তবে পাহাড়ি এলাকায় হলে ৪০ টাকা ফুট নেওয়া হয়। আর কোনো টাকা লাগে না।

উপজেলা জনস্বাস্থ্য বিভাগের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে কালের কণ্ঠকে বলেন, কমলগঞ্জে অগভীর নলকূপের জন্য পানির স্তর ১৫০ ফুট থেকে ২০০ ফুট। আবার পাহাড়-টিলা ও চা-বাগান এলাকায় ৯০ ফুটেই ভালো পানি ওঠে।

উপজেলা নারী ভাইস চেয়ারম্যান বিলকিস বেগমের প্রকল্প এলাকা ঘুরেও নানা অনিয়মের চিত্র দেখা যায়। সদর ইউনিয়নের বাল্লারপার গ্রামের হামজা বখতের বাড়িতে বসানো নলকূপের পাইপ দেওয়া হয়েছে ১২০ ফুট। ৫০টি ইট ধরিয়ে দিয়ে উপকারভোগীকে নিজ খরচে কলতলা পাকা করে নিতে বলেছেন ভাইস চেয়ারম্যান বিলকিছ। তাঁর সাইনবোর্ডও লাগানো হয়নি।

এসব বিষয়ে প্রশ্ন করলে প্রকল্প সভাপতি বিলকিস বেগম জবাব এড়িয়ে শুধু বলেন, যেখানে যা প্রয়োজন, তা দেওয়া হয়েছে।

মাধবপুর ইউনিয়নে চেয়ারম্যান পুষ্প কুমার কানুর প্রকল্পের উপকারভোগীর তালিকায় পাত্রখোলা চা-বাগানের পবির ভুমিজের নাম থাকলেও তাঁর বাড়িতে কোনো নলকূপের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।

কমলগঞ্জ সদর ইউনিয়নের প্রকল্প সভাপতি আব্দুল মতিন, উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান রামভজন কৈরীসহ সবাই এভাবে প্রতিটি নলকূপের বরাদ্দ থেকে ১৬-১৭ হাজার টাকা পকেটে পুরেছেন। গড় হিসাবে দেখা যায়, ৩০টি নলকূপে বরাদ্দের চেয়ে অন্তত ৩৬০০ ফুট পাইপ কম বসানো হয়েছে, যার বাজারমূল্য প্রায় ৯০ হাজার টাকা। আবার ৩০টি নলকূপের একটিতেও সাইনবোর্ড না লাগিয়ে দেড় লাখ টাকার পুরোটাই মেরে দেওয়া হয়েছে। তলা পাকাকরণ বাবদ বরাদ্দ প্রায় পৌনে দুই লাখ টাকার বেশির ভাগটাই লোপাট করা হয়েছে।

উপজেলা প্রকৌশল অধিদপ্তরের সহকারী প্রকৌশলী সাইফুল ইসলাম (তত্কালীন সাইটের দায়িত্বপ্রাপ্ত) বলেন, ‘আমি দুই মাস আগে বদলি হয়ে চলে এসেছি। এসব বিষয়ে কিছু বলতে পারব না। ’

জানতে চাইলে কমলগঞ্জ উপজেলা প্রকৌশলী জাহিদুল ইসলাম বলেন, ‘প্রকল্পগুলো চেয়ারম্যানদের। তাঁরাই কাজ বাস্তবায়ন করেছেন। সহকারী প্রকৌশলীরা তদারকিতে ছিলেন। তাঁরা অনিয়ম পাননি। ’ নলকূপ বসাতে এত বেশি টাকা বরাদ্দ কেন—প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, ‘পরিমাণ অনুয়ায়ীই ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে। ’

কমলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আশেকুল হক বলেন, ‘নলকূপ স্থাপনে অনিয়মের বিষয় আমার জানে নেই। সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে কথা বলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব। ’



সাতদিনের সেরা