kalerkantho

মঙ্গলবার । ৪ মাঘ ১৪২৮। ১৮ জানুয়ারি ২০২২। ১৪ জমাদিউস সানি ১৪৪৩

বড়গোপ টিলায় এক কলস পানির দাম ২০ টাকা

তাহিরপুর (সুনামগঞ্জ) প্রতিনিধি    

৫ ডিসেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



বড়গোপ টিলায় এক কলস পানির দাম ২০ টাকা

তাহিরপুরের বড়গোপ টিলার ঝরনা থেকে পানি সংগ্রহ করছেন স্থানীয় এক যুবক। ছবি : কালের কণ্ঠ

সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার ভারতীয় সীমান্তসংলগ্ন বড়গোপ টিলার ৪৩টি পরিবারে পানির জন্য হাহাকার চলছে। শুষ্ক মৌসুমে ঝরনায় পানি সরবরাহ কমে যাওয়ায় এ সংকট তৈরি হয়েছে। ফলে পানি কিনে খেতে হচ্ছে টিলার দরিদ্র বাসিন্দাদের। এক কলস পানি ২০ টাকা দরে কিনতে হচ্ছে তাদের। আর এক ড্রাম (৩৫ লিটার) পানির জন্য খরচ হচ্ছে ১০০ টাকা। কয়েক যুগ ধরে এ অবস্থা চললেও টিলাবাসীর পানির সমস্যা সমাধানে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেই।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ১৯৪২ সালে বড়গোপ টিলায় ১৩টি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী পরিবার বাস করত। বর্তমানে ৩৩টি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও ১০টি বাঙালি পরিবার বাস করে। ২০০৮ সালে এখানে একটি নলকূপ স্থাপন করলেও প্রথম থেকেই এটি অকেজো। বড়গোপ টিলাসংলগ্ন ভারত সীমান্তের মেঘালয় পাহাড়ের বাসিন্দাদের জন্য ওই রাজ্যের সরকার বৈদ্যুতিক মোটরের সাহায্যে পানির ব্যবস্থা করেছে। কিন্তু মেঘালয় ঘেঁষে বাংলাদেশ সীমান্তে অবস্থিত বড়গোপ টিলার বাসিন্দারা আজও পানির সুবিধা পায়নি।

গত শুক্রবার বড়গোপ টিলায় গিয়ে দেখা যায়, পানির জন্য সেখানে হাহাকার চলছে। টিলাজুড়ে কোথায়ও শাক-সবজির এক টুকরো বাগান নেই। মনিরা আজিম শ্রমিক দিয়ে বসতঘরের বারান্দা ঢালাই করছেন। এ জন্য প্রয়োজনীয় পানি সংগ্রহ করছেন টাকা দিয়ে।

ওই দিন বিকেলে দেখা যায়, সীমান্তসংলগ্ন ঝরনায় স্থানীয় চাঁনপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্রী সানিকা রিচিল গোসলের জন্য মগে করে ঝরনার পানি তুলে বড় পাতিলে ভরছে। গোসল শেষে হাতে এক বালতি ধোয়া কাপড়, মাথায় পানিভর্তি পাতিল নিয়ে ৫০০ ফুট উঁচু টিলায় পাথর ছড়িয়ে থাকা এবড়োখেবড়ো খাড়া পথ হেঁটে উঠছে। একই সময়ে দেখা হয়, বড়গোপ টিলার বাসিন্দা মমতা বেগমের সঙ্গে। তিনি মেয়ে কবিতাকে সঙ্গে নিয়ে খাবার পানির জন্য আধা ঘণ্টা হেঁটে এসেছেন বড়গোপ মাঝের টিলার সমতল ভূমিতে স্থাপিত মসজিদের নলকূপে। মমতা বেগম বলেন, ‘স্বামী দিনমজুরি করেন। পরিবারের সাত সদস্যের জন্য খাবার ও গৃহস্থালির পানি সংগ্রহেই আধাবেলা সময় যায়। পানিভর্তি কলস নিয়ে টিলায় ওঠানামা অনেক কষ্টকর।’

বড়গোপ টিলার বাসিন্দা মহিমা আজিম (৭০) বলেন, ‘১৯৪২ সাল থেকেই এ টিলায় বসবাস শুরু হয়। ২০০৮ সালে রোমান ক্যাথলিক চার্চে একটি নলকূপ স্থাপন করলেও পানি না আসায় প্রথম থেকেই অকেজো হয়ে আছে।’

টিলার বাসিন্দা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক মনিরা আজিম বলেন, ‘একদিকে পানির চাহিদা বাড়ছে, অন্যদিকে পানি আরো দুষ্প্রাপ্য হয়ে উঠছে। এক কলস ২০ টাকা এবং ৩৫ লিটারের এক ড্রাম পানি ১০০ টাকা দিয়ে সংগ্রহ করতে হচ্ছে। পানির সংকটের কারণে টিলায় কেউ শাক-সবজির চাষাবাদ করে না।’

টিলার বাসিন্দা তৃপ্ত বনোয়ারী বলেন, ‘পাহাড়ি ঝরনার পানি এখন আর ভালো নেই। ঝরনার পাশে লোকজন গরু চড়ায়। কেউ কেউ মলমূত্রও ত্যাগ করে। বর্ষায় পানি নিয়ে টিলায় ওঠানামা আরো বেশি কষ্টকর। আবার হেমন্তে ঝরনার পানি অনেক কমে যায়। তবুও লোকজন এই পানি নিয়ে ছেঁকে খাবারের জন্য সংগ্রহ করে।’

স্থানীয় উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির ছাত্র ওয়ালশেং রংদী বলে, ‘টিলার বেশির ভাগ মানুষই দরিদ্র। দুই-তিনটি পরিবার টাকা দিয়ে পানি সংগ্রহ করে। আমরা বাড়তি আয়ের জন্য এই কাজ করি।’

দক্ষিণ বড়দল ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য সম্রাট মিয়া বলেন, ‘বড়গোপ টিলার দুই শতাধিক বাসিন্দা পানির জন্য বছরের পর বছর কষ্ট করছে। যেকোনো উপায়ে তাদের জন্য পানির ব্যবস্থা করা একান্ত দরকার।’

সংশ্লিষ্ট এলাকার সংরক্ষিত নারী ইউপি সদস্য সুষমা জাম্বিল বলেন, ‘৫০০ ফুট উঁচু টিলায় ওঠানামা করে পানি সংগ্রহ করা খুবই কষ্টকর। তাই মানবিক ও স্বাস্থ্যগত দিক বিবেচনায় এখানে মোটরের সাহায্যে পানি সরবরাহ করার দাবি জানাচ্ছি।’

উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী আল আমিন বলেন, ‘জায়গাটি সার্ভে করে বড়গোট টিলার বাসিন্দাদের পানির সংকট নিরসনে দ্রুত প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেব।’

তাহিরপুর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান করুণাসিন্ধু চৌধুরী বলেন, ‘বড়গোপ টিলায় নলকূপ বসালে পানি ওঠে না। বাসিন্দাদের পানির সংকট নিরসনে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের সঙ্গে আলোচনা করব।’



সাতদিনের সেরা