kalerkantho

মঙ্গলবার । ৪ মাঘ ১৪২৮। ১৮ জানুয়ারি ২০২২। ১৪ জমাদিউস সানি ১৪৪৩

নীলফামারীতে অভিযানে পাঁচ জঙ্গি আটক

বোমা পিস্তল গুলি উদ্ধার

নীলফামারী প্রতিনিধি ও রংপুর অফিস   

৫ ডিসেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



নীলফামারীতে অভিযানে পাঁচ জঙ্গি আটক

নীলফামারী জেলা সদরের কয়েকটি স্থানে শনিবার রাতভর অভিযান চালিয়ে জঙ্গি সংগঠন জেএমবির পাঁচ সদস্যকে আটক করেছে র‌্যাব। এঁদের বাড়ি জেলার সোনারায় ইউনিয়নের পুঠিহারী মাঝাপাড়া গ্রামে।

পরে সকালে ওই গ্রামের শরীফুল ইসলাম ওরফে শরীফের (৩২) বাড়িতে অভিযান চালিয়ে একটি তাজা বোমা ও বোমা তৈরির সরঞ্জাম, রাসায়নিক দ্রব্য, একটি পিস্তল, একটি ম্যাগাজিন ও পাঁচ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করে র‌্যাব। শনিবার মাঝরাত থেকেই বাড়িটি ঘিরে রাখা হয়েছিল, কিন্তু সকালে অভিযানের সময় শরীফকে পাওয়া যায়নি।

সকাল সাড়ে ১০টার দিকে ফাঁকা একটি স্থানে তাজা বোমাটির বিস্ফোরণ ঘটায় ঢাকা থেকে আসা র‌্যাবের বিশেষজ্ঞদল। ঢাকা থেকে হেলিকপ্টারযোগে র‌্যাবের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও বোমা নিষ্ক্রিয়করণ দলের সদস্যরা গ্রামটিতে এসে পৌঁছালে শরীফের বাড়িতে অভিযান শুরু হয়।

আটক হওয়া ব্যক্তিরা হলেন আহিদুল ইসলাম ওরফে আহিদ ওরফে পলাশ (২৬), ওয়াহেদ আলী ওরফে আব্দুর রহমান (৩০), আব্দুল্লাহ আল মামুন ওরফে ডা. সুজা (২৬), জাহিদুল ইসলাম ওরফে জাহিদ ওরফে জোবায়ের (২৮) ও নুর আমীন ওরফে সবুজ (২৮)। এঁদের মধ্যে জাহিদুল ও ওহিদুল দুই ভাই। র‌্যাব জানিয়েছে, দু-তিন মাস আগে বোমা তৈরি করার সময় বিস্ফোরণে আহিদুলের বাড়িতে আগুন লাগে।

অভিযান শেষে শরীফের বাড়ির পাশে সংবাদ সম্মেলনে র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক খন্দকার আল মঈন সাংবাদিকদের বলেন, আটককৃতরা সবাই জেএমবির সদস্য। আহিদুল বোমা তৈরির প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। শরীফের বাড়িতে বোমা তৈরি হতো। গতকাল মাঝরাত থেকে শরীফের বাড়ি ঘিরে রাখেন র‌্যাব-১৩ নীলফামারী ক্যাম্পের সদস্যরা। আটক ব্যক্তিদের রংপুর র‌্যাব কার্যালয়ে নেওয়া হয়েছে। শরীফকে গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।

খন্দকার আল মঈন জানান, গোপন তথ্যের ভিত্তিতে শুক্রবার দিবাগত রাত থেকে শনিবার ভোর পর্যন্ত অভিযান চালিয়ে পাঁচ জঙ্গিকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তাঁদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পুঠিহারী মাঝাপাড়া গ্রামের শরীফের বাড়িতে অভিযান চলে। গভীর রাত থেকে বাড়িটি ঘিরে রাখা হয়। সকালে ঘটনাস্থলে আসেন র‌্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশন) কর্নেল এ কে এম আজাদ। তাঁর নেতৃত্বে অভিযানে অংশ নেন র‌্যাবের পরিচালক গোয়েন্দা লে. কর্নেল মো. মশিউর, র‌্যাব-১৩ রংপুরের কমান্ডার রেজা আহমেদ ফেরদৌসসহ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সদস্যরা।

আল মঈন বলেন, ‘গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে আহিদুল জেএমবির সামরিক শাখার রংপুর অঞ্চলের দায়িত্বপ্রাপ্ত। সে বোমা বিশেষজ্ঞ হওয়ায় নিয়মিত বোমা তৈরি করত।’

এলাকাবাসী জানায়, সকাল সাড়ে ১০টার দিকে উদ্ধার করা তাজা বোমাটির বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। শরীফের স্ত্রী মিনা বেগম (২৮) ও তাঁর শাশুড়িকে (নাম জানা যায়নি) জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করে র‌্যাব।

বিকেল ৩টার দিকে নীলফামারী সদর থানার ওসি মো. আব্দুর রউপ বলেন, ‘শরীফের বাড়িটি তদন্তের স্বার্থে স্থানীয় আনসার ও চৌকিদারদের পাহারায় রাখা হয়েছে। এখন পর্যন্ত মামলা হয়নি।’

র‌্যাবের প্রেস ব্রিফিং : পরে বিকেল ৩টার দিকে রংপুরে র‌্যাব কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক জানান, আহিদ ওরফে পলাশ জেএমবির রংপুর এবং নীলফামারী অঞ্চলের সামরিক শাখার প্রধান। জঙ্গিরা প্রশিক্ষণ নিয়ে বোমা তৈরি ও অনুশীলন করে  নাশকতামূলক হামলার প্রস্তুতি গ্রহণ করছিলেন। তাঁরা বিভিন্ন ওয়েব পেজ ও ইউটিউব থেকে বোমা তৈরির প্রশিক্ষণ নেন।

আল মঈন জানান, এই জঙ্গিরা জেলখানায় বন্দি থাকা শীর্ষস্থানীয় জঙ্গিদের আদালতে আনা-নেওয়ার পথে হামলা চালিয়ে তাঁদের মুক্ত করা, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী এবং গুরুত্বপূর্ণ জনবহুল স্থাপনায় হামলা চালিয়ে অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরির  লক্ষ্যে বোমা তৈরি করছিলেন।

প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তাঁরা র‌্যাবকে জানিয়েছেন, অনলাইনে রংপুর অঞ্চলের আমিরের নির্দেশে কয়েক দিন ধরে বোমা তৈরি করে শরীফের বাড়িতে রাখা হচ্ছিল। জঙ্গি কার্যক্রমে তাঁরা শ্রমিক, অটোচালক, দর্জিসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার ২০ থেকে ২৫ জনকে অন্তর্ভুক্ত করেন।

২০১৫ সালে জেএমবিতে সম্পৃক্ত হওয়া আহিদুল বর্তমানে একটি খেলনা প্রস্তুতকারক কারখানায় চাকরির আড়ালে জঙ্গি কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছিলেন। আব্দুল্লাহ আল মানুন একজন গ্রাম্য ডাক্তার, ওয়াহেদ আলী একটি কারখানার শ্রমিক, জাহিদুল ইসলাম খেলনা প্রস্তুতকারক কারখানার সুপারভাইজার ও নুর আমীন একজন বেসরকারি চাকরীজীবী।

দুই বছর ধরে শরীফের চলাফেরায় পরিবর্তন : নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এলাকার কয়েক ব্যক্তি জানান, শরীফ আগে উত্তরা ইপিজেডে কাজ করতেন। সেখানে কাজ ছেড়ে রাজমিস্ত্রি, কাঠমিস্ত্রিসহ দিনমজুরির কাজও করছিলেন। বাড়িতে স্ত্রী, তাঁদের চার বছরের মেয়ে সুমাইয়া এবং সাত মাসের ছেলে খালিদকে নিয়ে বসবাস করতেন। আগে স্বাভাবিক জীবন যাপন করলেও দুই বছর ধরে শরীফের চলাফেরায় পরিবর্তন দেখা যায়। ধর্মীয় বিষয়ে এলাকার মানুষের বিশ্বাসের বাইরে বিভিন্ন মতাদর্শ প্রচার করতেন। মসজিদে নামাজ আদায়ের সময়েও এলাকার প্রচলিত রীতিনীতির বাইরে তাঁর মধ্যে ভিন্নতা লক্ষ করা গেছে। এ নিয়ে এলাকার অনেকের সঙ্গে তাঁর তর্ক হতো।

এলাকাবাসী জানায়, শরীফুলের বাবার বাড়ি জেলা সদরের চড়াইখোলা ইউনিয়নের দারোয়ানী পিলার গ্রামে। বাবার নাম জহুরুল ইসলাম। পুঠিহারী মাঝাপাড়া গ্রামে নানা সুলতান আলীর বাড়িতে বড় হন শরীফ। এরপর তাঁর নানা সেখানে স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্য তাঁকে ওই বাড়িটি করে দেন।



সাতদিনের সেরা