kalerkantho

মঙ্গলবার । ৪ মাঘ ১৪২৮। ১৮ জানুয়ারি ২০২২। ১৪ জমাদিউস সানি ১৪৪৩

উৎপাদন খাতে ব্যয় বাড়ছে

সজীব আহমেদ   

৫ ডিসেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



উৎপাদন খাতে ব্যয় বাড়ছে

ডিজেল-কেরোসিনের দাম বাড়ানোর কারণে বিদ্যুৎ, তৈরি পোশাক, স্টিল, কৃষি, সিরামিকসহ বিভিন্ন খাতে উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে। ফলে এসব পণ্যের দামও বাড়তে পারে।

বাংলাদেশের উৎপাদনমুখী শিল্প-কারখানা বিদ্যুৎ ও জ্বালানি তেলের ওপর অনেকটা নির্ভরশীল। গ্যাসের স্বল্পতা বিদ্যুৎ ও ডিজেলের ওপর নির্ভরশীলতা অনেকাংশেই বাড়িয়ে দিয়েছে। তাই ডিজেল-কেরোসিনের মূল্যবৃদ্ধি ভোক্তাদের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলবে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে পরিবহন, বিদ্যুৎ উৎপাদন, কৃষি ও শিল্প খাতে ডিজেলই প্রধান জ্বালানি। ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধির ঘোষণায় বড় এই চারটি খাত এরই মধ্যে অস্থিতিশীল হয়ে উঠেছে। সারা দেশেই এর কমবেশি প্রভাব দেখা যাচ্ছে।

বিদ্যুৎ খাত : বিদ্যুৎ উৎপাদনে ডিজেল ব্যবহৃত হয়। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ বাড়বে। এ কারণে বিদ্যুতের দামও বাড়বে বলে আশঙ্কা রয়েছে। তবে বিদ্যুতের দাম বাড়লে দেশের কৃষি, শিল্প ও বাণিজ্যিক খাতে প্রভাব পড়বে।

বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে কালের কণ্ঠকে বলেন, ডিজেলের দাম ২৩ শতাংশ বেড়ে যাওয়ায় এক বছরে বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রায় ৭০০ কোটি টাকা বেশি লাগবে। বিশ্ববাজারে ডিজেলের দাম কমছে, এখন দাম কমানো হলে এই খরচ করতে হবে না। এতে বিদ্যুতের দামও বাড়াতে হবে না।

তবে পিডিবির চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. বেলায়েত হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘শীতকালে বিদ্যুতের চাহিদা কম থাকায় ডিজেলচালিত বিদ্যুেকন্দ্রগুলো বন্ধ থাকে। তাই ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব বিদ্যুৎ উৎপাদনে এখন পড়বে না। কিন্তু মার্চ মাসে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়বে, তখন সব ডিজেলচালিত বিদ্যুেকন্দ্র চালু রাখতে হবে।

বেলায়েত হোসেন বলেন, ‘দেশে বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ১৪ হাজার মেগাওয়াট। ডিজেলচালিত বিদ্যুেকন্দ্র থেকে আসে এক হাজার ২০০ মেগাওয়াট। ডিজেলচালিত বিদ্যুেকন্দ্রগুলো পিক আওয়ারে দিনে ছয় ঘণ্টা চালানো হয়। সে হিসাবে বলা যায়, ডিজেলের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ ৫ শতাংশ বাড়বে।’

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ম তামিম কালের কণ্ঠকে বলেন, ডিজেলের দাম বাড়ানোর এক সপ্তাহ পর থেকেই বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমতে শুরু করে। দাম বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গেই বাজারে যে প্রভাব পড়েছে, এখন দাম কমানো হলেও সেটির সুফল সাধারণ মানুষ পাবে না।

শিল্প খাত : ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধিতে শিল্প খাতের উৎপাদন ব্যয়ও বেড়ে গেছে। শিল্প খাতে ডিজেলের প্রধান ব্যবহার মূলত বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী জেনারেটরের জ্বালানি হিসেবে। করোনার আগেও শিল্প খাতে জ্বালানি তেলের বার্ষিক ব্যবহার ছিল চার লাখ ২১ হাজার টন। এর মধ্যে ডিজেল ছিল তিন লাখ ৪১ হাজার টন। অর্থাৎ শিল্প খাতে মোট ব্যবহৃত জ্বালানি তেলের ৮০.৯৮ শতাংশই ডিজেল।

সিরামিক খাত : বাংলাদেশ সিরামিক ম্যানুফ্যাকরাচার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিসিএমইএ) গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ডিজেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন ভাড়া ১৫ শতাংশ এবং ট্রাক ও লরি ভাড়া ২৬ শতাংশ বেড়ে গেছে। কাঁচামাল, সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহন ভাড়া, কনটেইনার ভাড়াও বেড়েছে। সব মিলিয়ে বর্তমান পরিস্থিতিতে সিরামিক পণ্য উৎপাদন খরচ ১৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে গেছে। আগে ১০০ টাকায় যেটি উৎপাদন করা যেত, সেটি এখন উৎপাদন করতে খরচ হবে ১১৫ টাকা।’

স্টিল খাত : গ্যাসসংকটের কারণে দীর্ঘদিন ধরে জ্বালানি তেল দিয়ে স্টিল কারখানাগুলো উৎপাদন চালিয়ে আসছে। জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় তাদের উৎপাদন খরচ আরো বেড়ে গেছে।

বাংলাদেশের স্টিল ম্যানুফ্যাকচারিং অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও আনোয়ার গ্রুপের চেয়ারম্যান মনোয়ার হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় প্রতি টন রড উৎপাদনে ১০ হাজার টাকার বেশি খরচ বেড়েছে।

তৈরি পোশাক খাত : বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমতে শুরু করায় দেশের বাজারেও দাম কমানোর দাবি জানিয়েছে দেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান খাত তৈরি পোশাক শিল্পের মালিকদের শীর্ষ সংগঠন বিজিএমইএ।

সম্প্রতি বিজিএমইএর সভাপতি ফারুক হাসান বলেন, ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ১৫ টাকা বাড়ানোর ফলে তৈরি পোশাক খাতের উৎপাদন খরচ ৫ শতাংশ বেড়ে গেছে। এখন যেহেতু আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বেশ খানিকটা কমেছে, সরকারেরও উচিত দেশের বাজারে দাম কমানো।

কৃষি খাত : তেলের মূল্যবৃদ্ধি দেশের কৃষি খাতে সরাসরি প্রভাব ফেলবে। কারণ এ খাতের একটি বড় অংশ ডিজেলচালিত সেচব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল। সার, বীজসহ অন্যান্য কৃষিপণ্য বেশির ভাগই ডিজেলচালিত যানবাহনের মাধ্যমে পরিবহন করা হয়। কৃষক ও কৃষি উদ্যোক্তারা আরো চাপের মধ্যে থাকবেন। এরই মধ্যে স্থানীয় পরিবহনের খরচও ১০ থেকে ১৫ শতাংশ বেড়ে গেছে।

অর্থনীতিবিদ এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেল ও গ্যাসের দাম বেড়ে যাওয়ায় অনেক দেশেই উৎপাদন খরচ বাড়ছে। এতে আমাদের প্রতিযোগিতায় খুব বেশি প্রভাবিত হওয়ার কথা নয়। আমি মনে করি, আমাদের ব্যবসায়ীরা শুধু দাবি জানালেই হবে না, তাঁদের উৎপাদনশীলতা বাড়িয়ে ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে হবে, যাতে বিশেষ করে রপ্তানি খাতে কোনো অভিঘাত না আসে।’



সাতদিনের সেরা