kalerkantho

সোমবার । ৩ মাঘ ১৪২৮। ১৭ জানুয়ারি ২০২২। ১৩ জমাদিউস সানি ১৪৪৩

চাহিদা ৬ লাখ, দিতে পারে ৪ লাখ

ওমর ফারুক   

৪ ডিসেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



চাহিদা ৬ লাখ, দিতে পারে ৪ লাখ

প্রতি মাসে দেশে পাসপোর্টের চাহিদা প্রায় ছয় লাখ। কিন্তু পাসপোর্ট অধিদপ্তর চার লাখ পাসপোর্ট দিতে পারছে। ঘাটতি থেকে যাচ্ছে দুই লাখের। আর এতে গ্রাহকদের অপেক্ষায় থেকে ভোগান্তি বাড়ছে।

গত বছর ই-পাসপোর্ট চালু হওয়ার পর ১৬ লাখ মানুষকে তা দিতে পেরেছে দেশের পাসপোর্ট অফিসগুলো। আর ১৯৭৩ সালে দেশে পাসপোর্ট চালু হওয়ার পর এ বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিন কোটি ১২ লাখ ৬০ হাজার ২১২টি মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট (এমআরপি) দেওয়া হয়েছে গ্রাহকদের।

তবে বিপুলসংখ্যক প্রবাসী শ্রমিক থাকেন যেসব দেশে, সেসব স্থানে ই-পাসপোর্ট পাওয়া নিয়ে ভোগান্তিতে রয়েছেন তাঁরা। উন্নত তিনটি দেশে বাংলাদেশের সাতটি মিশনে ই-পাসপোর্টের সরঞ্জাম বসানো হলেও সৌদি আরব, কুয়েত, আরব আমিরাত, বাহরাইনের মতো দেশে এখন পর্যন্ত শ্রমিকরা এর সুবিধা পাচ্ছেন না। ই-পাসপোর্টের মেশিনপত্র থাকা সত্ত্বেও এখন পর্যন্ত বসানো সম্ভব হয়নি ওই দেশগুলোতে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তর সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে। 

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দেশের ৮৭টি পাসপোর্ট অফিসে প্রতিদিন ৩০ হাজারের মতো আবেদন জমা পড়ে। অফিসগুলোতে দায়িত্বরত এক হাজার ১৮৪ জন কর্মী রবিবার থেকে বৃহস্পতিবার পাঁচ দিনে ২০ হাজার পাসপোর্টের প্রক্রিয়া করতে পারেন। প্রক্রিয়ার বাইরে থেকে যায় ১০ হাজার আবেদন। এগুলো জমতে জমতে পাহাড়সমান স্তূপ হয়েছে। এর মধ্যে থাকে শত শত তদবির। তদবিরের পাসপোর্টগুলোকে আগেভাগে করে দেওয়ার কারণে গ্রাহকদের অপেক্ষার পালা বাড়ে।

জানতে চাইলে ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আইয়ূব চৌধুরী গত মঙ্গলবার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের যে লোকবল রয়েছে তাতে রাত-দিন কাজ করেও পাসপোর্টের চাহিদা মেটাতে পারছি না। বর্তমানে যে জনবল রয়েছে তার তিন গুণ প্রয়োজন। মন্ত্রণালয়ে লোকবল চাওয়া হয়েছে, আশা করছি পাওয়া যাবে।’

আগারগাঁওয়ে ভিড় : রাজধানীর আগারগাঁওয়ের পাসপোর্ট অফিসে প্রতিদিন সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত মানুষ গিজগিজ করতে দেখা যায়। এক কর্মকর্তা জানান, আগারগাঁওয়ে যে জনবল রয়েছে তাতে প্রতি কার্যদিবসে ৮০০ পাসপোর্ট করে দেওয়া সম্ভব। কিন্তু গ্রাহকদের চাপের কারণে চোখের ও আঙুলের ছাপ নেওয়ার জন্য প্রতিদিন আড়াই হাজার জনকে তারিখ দেওয়া হয়। একই সঙ্গে অতিরিক্ত কাজ করে আড়াই হাজার পাসপোর্ট ডেলিভারি দেওয়া হয়। এ কারণে পাঁচ হাজার লোক পাসপোর্ট অফিসে আসেন। তাঁদের সঙ্গে আত্মীয়-স্বজনও আসেন, অনেকে তথ্য জানতে চাওয়াসহ নানা কাজে আসেন। এতে অন্তত ১০-১২ হাজার লোক প্রতিদিন আগারগাঁওয়ের পাসপোর্ট অফিসে ভিড় করেন। ফলে মানুষের লাইন গিয়ে রাস্তায়ও পৌঁছায়।

এর থেকে উত্তরণের উপায় কী—এই প্রশ্নে ওই কর্মকর্তা বলেন, একটাই উপায় লোকবল বাড়িয়ে, নতুন আরো অফিস করে বর্তমানে যেসব অফিসে চাপ রয়েছে তার চাপ কমাতে হবে। তা না হলে পাসপোর্টের কর্মকর্তারা যেমন  নির্ভুল সেবা দিতে পারবেন না, তেমনি গ্রাহকরা স্বল্প সময়ে স্বাচ্ছন্দ্য সেবা নিতে পারবেন না।

বিদেশে মিশনে বসেনি ই-পাসপোর্ট সরঞ্জাম : সৌদি আরব, আরব আমিরাত, কুয়েত, বাহরাইন, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, ওমানসহ কয়েকটি দেশে ৬০ লাখের বেশি শ্রমিক কাজ করছেন। তাঁদের কাছ থেকে সরকার কোটি কোটি টাকা রেমিট্যান্স পাচ্ছে। কিন্তু তাঁরা শিকার হচ্ছেন অবহেলার। যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি, গ্রিসে সাতটি মিশনে ই-পাসপোর্টের সরঞ্জাম বসানো হলেও শ্রমিক থাকা দেশগুলোতে এখনো দেওয়া হয়নি ই-পাসপোর্টের সেবা।

জানা গেছে, শ্রমিক থাকা দেশগুলোকে ই-পাসপোর্টের সরঞ্জাম বসানোর জন্য পাসপোর্ট অধিদপ্তর কয়েক মাস আগেই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠায়, কিন্তু কয়েক মাস চলে গেলেও ফলাফল শূন্য। ৮০টি মিশনে ই-পাসপোর্টের সরঞ্জাম দেওয়ার কথা রয়েছে। গত সেপ্টেম্বরের মধ্যে মাত্র সাতটি মিশনে দেওয়া হয়েছে।

বর্তমানে মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট (এমআরপি) নেই বললেই চলে। সবাইকে দেওয়া হচ্ছে অত্যাধুনিক ই-পাসপোর্ট। ২০২০ সালের ২২ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উদ্বোধনের পর প্রায় ১৬ লাখ ই-পাসপোর্ট দিতে সক্ষম হয়েছে পাসপোর্ট অধিদপ্তর। কভিডের কারণে কয়েক মাস এ কার্যক্রম বন্ধ ছিল।

অধিদপ্তর সূত্র জানায়, গত ২৫ নভেম্বর পর্যন্ত ১৫ লাখ ৬১ হাজার ব্যক্তিকে ই-পাসপোর্ট বিতরণ করা হয়েছে। প্রিন্ট করা হয়েছে ১৬ লাখ ৯০ হাজার। অন্য এক কর্মকর্তা জানান, ই-পাসপোর্টের পাশাপাশি  এমআরপিও দেওয়া হয়েছে ফাঁকে ফাঁকে। তিনি জানান, একজন অপারেটরের দিনে ৫০ থেকে ৬০টি পাসপোর্টের কাজ করতে পারেন। চাপের কারণে অফিস টাইম শেষ হয়ে গেলেও অতিরিক্ত সময় কাজ করে শতাধিক পাসপোর্ট রেডি করতে হচ্ছে। এত চাপের ফলে কোনো কোনো পাসপোর্টে ভুলও হচ্ছে। 

যত রাজস্ব পাচ্ছে সরকার : অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা জানান, ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশি পাসপোর্ট চালুর পর ২০১৮ সাল পর্যন্ত সরকার রাজস্ব পেয়েছে ২৬ হাজার ৬৫৩ কোটি আট লাখ ২৬ হাজার ৫০০ টাকা। এই সময়ের মধ্যে অধিদপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বোনাস, পাসপোর্ট, ভিসা স্টিকার, সার্ক ভিসা এক্সাম্পশন স্টিকার, আনুষঙ্গিক যন্ত্রপাতি প্রযুক্তি আমদানি, সংরক্ষণ, মেরামত বাবদ খরচ হয়েছে এক হাজার ৫৮৩ কোটি ৬২ লাখ ৯০ হাজার ১০০ টাকা। গত ৪৮ বছরে পাসপোর্ট ও ভিসা ইস্যুর বিষয়ে কাজ বেড়েছে ৩৯৪ গুণ। অফিসের সংখ্যা বেড়েছে ১৪ গুণ। জনবল বেড়েছে সাত গুণ। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে সরকার রাজস্ব পেয়েছে এক হাজার ৬৯৫ কোটি দুই লাখ ৭৮ হাজার টাকা।

ওই কর্মকর্তা বলেন, ই-পাসপোর্ট চালু হওয়ার পর পাসপোর্টের চাহিদা ও ফি বেড়েছে। ফলে আগামী দিনগুলোতে বছরে তিন হাজার কোটি টাকার বেশি রাজস্ব পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। পাসপোর্ট অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা জানান, সরকারের রাজস্বের বড় একটি খাত পাসপোর্ট। প্রতিদিন গড়ে সারা দেশ থেকে ৩০ হাজার আবেদনকারী আবেদন করেন। তাঁদের কাছ থেকে গড়ে পাঁচ হাজার টাকা করে ফি পাওয়া গেলে প্রতি মাসে ২২ কর্মদিবসে ৩০০ কোটি টাকার বেশি পাওয়া যায়। 

পাসপোর্ট করার চাপ মোকাবেলার থানায় থানায় পাসপোর্ট অফিস প্রয়োজন বলে মনে করেন পাসপোর্ট অফিসের এক কর্মকর্তা। তিনি বলেন, পাসপোর্টের জন্য যে পরিমাণ চাপ তাতে দেশের প্রতিটি থানায় একটি করে অফিস করা গেলে দ্রুত সেবা দেওয়ার সুযোগ রয়েছে।



সাতদিনের সেরা