kalerkantho

মঙ্গলবার । ১১ মাঘ ১৪২৮। ২৫ জানুয়ারি ২০২২। ২১ জমাদিউস সানি ১৪৪৩

চিকিৎসায় সাফল্য

জীবনে ফেরার সংগ্রাম

শিশুর প্রথম অস্থিমজ্জা স্থাপন

ওমর ফারুক   

৩ ডিসেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



জীবনে ফেরার সংগ্রাম

হাসপাতালে আরফিন উদ্দিন মোস্তফা। ছবি : সংগৃহীত

সাড়ে ছয় বছরের ফুটফুটে শিশু আরফিন উদ্দিন মোস্তফা। জন্মের ছয় মাস পর একদিন শিশুটির শরীর সাদা হয়ে নিস্তেজ হয়ে পড়লে মা-বাবা গভীর উদ্বেগ-উত্কণ্ঠার পড়েন। দ্রুত নিয়ে যান চিকিৎসকের কাছে। দেখেশুনে ডাক্তার জানান, শিশুটি থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত।

বিজ্ঞাপন

সেই থেকে শুরু মাসে মাসে রক্ত দিয়ে শিশুটিকে বাঁচিয়ে রাখার কঠিন সংগ্রাম। গত সাড়ে ছয় বছরে অন্তত ৮০ বার শিশু আরফিনকে রক্ত দিতে হয়েছে। কিন্তু চিকিৎসক জানিয়েছিলেন, এভাবে রক্ত দিয়ে আরফিনকে ২৫ থেকে ৩০ বছরের বেশি বাঁচিয়ে রাখা যাবে না। চোখের সামনে আদরের সন্তান ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে—এ কষ্টে মা-বাবার দুঃস্বপ্নের শেষ ছিল না। নিরুপায় মা-বাবা এর পরও প্রতি মাসে রক্ত দিয়ে আরফিনকে বাঁচিয়ে রাখার সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছিলেন। তাঁদের এই দুঃস্বপ্নের পাশে সুসংবাদ নিয়ে আসে ঢাকা সিএমএইচের বোন ম্যারো ট্রান্সপ্লান্ট সেন্টার।     

গত মঙ্গলবার ঢাকা সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালের (সিএমএইচ) পেডিয়াট্রিক হেমাটো অনকোলজিস্ট ডা. কর্নেল শরমিন আরা ফেরদৌসির নেতৃত্বে ডা. লেফটেন্যান্ট কর্নেল মীর হাসান মো. মোসলেম ও ডা. লেফটেন্যান্ট কর্নেল কামরুন্নাহার দেশে এই প্রথম শিশু আরফিনের শরীরে অস্থিমজ্জা প্রতিস্থাপন করেন। চিকিৎসকদল প্রথমে আরফিনের বড় ভাই আরিয়ান উদ্দিন ওমরের শরীর থেকে অস্থিমজ্জা সংগ্রহ করে। পরে তা আরফিনের শরীরে প্রতিস্থাপন করা হয়। সফলভাবে কাজটি করতে পারায় ভীষণ উত্ফুল্ল চিকিৎসকদল। আনন্দিত সিএমএইচের কমান্ড্যান্ট ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জামিল আহমদও।

আরফিন উদ্দিন মোস্তফার বাবা মো. জসিম মিয়া সেনাবাহিনীতে করপোরাল পদে কর্মরত। ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গার বাকাইল গ্রামে তাঁদের বাড়ি। আবেগাপ্লুত জসিম মিয়া কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘জন্মের ছয় মাস পর আরফিনের থ্যালাসেমিয়া ধরা পড়ে। ওই সময় তার প্রচণ্ড জ্বর হয়। পরে শরীর সাদা হয়ে নিস্তেজ হয়ে যায়। ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেলে রোগের কথা জানা যায়। সেই থেকে শুরু ওকে বাঁচিয়ে রাখায় আমাদের সংগ্রাম। প্রতি মাসে রক্ত দিতে হয়। না দিলে নিস্তেজ হয়ে যায়। এর মধ্যেই বিএমটিতে আমার ছেলের অস্থিমজ্জা প্রতিস্থাপন হলো। সুস্থ হওয়ার পর আর রক্ত দিতে হবে না। এ আনন্দ আমি ভাষায় প্রকাশ করতে পারব না। আমার কাছে সব কিছু স্বপ্নের মতো লাগছে। ’

গতকাল বৃহস্পতিবার সিএমএইচে গেলে জামিল আহমদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সিএমএইচ ঢাকার একটি ঐতিহ্য আছে। আমরা সব প্রথমের সঙ্গে সংযুক্ত হতে চাই। আমাদের স্বপ্ন আকাশছোঁয়া। থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত শিশুকে ট্রান্সপ্লান্টেনশানের আওতায় নিয়ে আসা একটা স্বপ্নের সূচনা। এখন আক্রান্ত শিশুদের মা-বাবা স্বপ্ন দেখতে পারেন, তাঁদের সন্তান এই চিকিৎসা নিয়ে স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে পারবে। ’

সিএমএইচে বসে আরো কথা হয় ডা. শরমিন আরা ফেরদৌসি, ডা. মীর হাসান ও মো. মোসলেমের সঙ্গে। একটি সফল অস্থিমজ্জা প্রতিস্থাপন করতে পেরে তাঁরা ভীষণ খুশি।

ডা. শরমিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘শিশুটিকে এখন একটি বিশেষ কক্ষে রাখা হয়েছে। আমরা অপেক্ষা করছি তার দ্রুত সুস্থতার জন্য। ’ তিনি বলেন, ‘এত দিন আমাদের এখানে অটোলোগাস ট্রান্সপ্লান্টেশন করা হচ্ছিল। এই পদ্ধতিতে একজন অসুস্থ রোগীর শরীর থেকে বোন ম্যারো (অস্থিমজ্জা) সংগ্রহ করে একটি ব্যাংকে প্রিজার্ভ করা হতো। পরে সেটিই তার শরীরে প্রতিস্থাপন করা হতো। বাচ্চাদের অটোলোগাস ট্রান্সপ্লান্টেশন দেশে প্রথম আমাদের সেন্টারেই করা হয়। আর অন্যের অস্থিমজ্জা নিয়ে রোগীর শরীরে প্রতিস্থাপন করাটাকে বলে অ্যালোজেনিক ট্রান্সপ্লান্টেশন। এত দিন এটা বড়দের হয়েছে। এই প্রথম শিশুর অ্যালোজেনিক ট্রান্সপ্লান্টেশন করা হলো। ’

ডা. শরমিন বলেন, একজন থ্যালাসেমিয়া রোগীকে রক্ত দিয়ে ২৫ থেকে ৩০ বছর বাঁচানো যায়। এতে চিকিৎসা ব্যয় হয় ৩৫ থেকে ৪০ লাখ টাকা। আর আট থেকে দশ লাখ টাকা দিয়ে অস্থিমজ্জা প্রতিস্থাপন করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যেতে পারে রোগী।

ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গার বাকাইল গ্রামের আরফিন উদ্দিন মোস্তফার বাবা সেনা বাহিনীতে করপোরাল পদে কর্মরত মো. জসিম মিয়া কালের কণ্ঠকে জানান,  আরফিনের জন্মের ছয় মাস পর থ্যালসামিয়া ধরা পড়ে। তার প্রচণ্ড জ্বর হয়। পরে প্রতি মাসে তাকে রক্ত দিতে হতো। রক্ত না দিলে নিস্তেজ হয়ে যেত। ’

সিএমএইচের প্রধান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জামিল আহমদ কালের কণ্ঠকে আরো বলেন, ‘আমাদের চমৎকার একটি বিএমটি সেন্টার আছে। বাচ্চাটার প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দিতে পারব, এ বিশ্বাস থেকেই কাজটি আমরা করি। আমরা সফল হলে যে পরিবার বচ্চাদের নিয়ে ভোগান্তির মধ্যে আছে, তারা প্রবল কষ্ট থেকে রক্ষা পাবে। ’

চিকিৎসকরা জানান, বর্তমানে দেশে থ্যালাসেমিয়া রোগীর সংখ্যা প্রায় এক লাখ। প্রতিবছর নতুন যোগ হচ্ছে আড়াই হাজার থেকে তিন হাজার। বাংলাদেশে প্রায় ৭ শতাংশ মানুষ এই রোগের বাহক।

 



সাতদিনের সেরা