kalerkantho

সোমবার । ৩ মাঘ ১৪২৮। ১৭ জানুয়ারি ২০২২। ১৩ জমাদিউস সানি ১৪৪৩

জন্মশতবর্ষের শ্রদ্ধাঞ্জলি

কামরুল হাসান : যুদ্ধ ও শান্তি

মইনুদ্দীন খালেদ

২ ডিসেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



কামরুল হাসান : যুদ্ধ ও শান্তি

কামরুল হাসান। ছবি : নাসির আলী মামুন/ফটোজিয়াম

কামরুল হাসান কালদগ্ধ শিল্পী। সমাজ ও রাজনীতি সচেতন এমন শিল্পী পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। দুঃসহ কাল ও দুঃসাধ্য মানব-অস্তিত্ব বিশ্লেষণ করার জন্য পূর্ব ও পশ্চিমের বহু ভাষার সংমিশ্রণ ঘটেছে তাঁর সৃজনে। তাঁর আরাধ্য ছিল শাশ্বত বাংলা; বাঙালিয়ানার দর্শনস্নিগ্ধ অহিংস মানবসমাজ। তিনি সান্ত্বনা পেতে বারবার ফিরে গেছেন নিসর্গের কাছে, মানবসম্পর্কের বলয়ে। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত স্বদেশ যেন তাঁর জীবনে স্বপ্নভূমিই রয়ে গেছে। সোনার বাংলার মুখ তিনি উদযাপন করেছেন স্বল্প কাল-পরিধিতে। অন্যদিকে পারিবারিক বন্ধনে যে কল্যাণী মায়াময়তা আছে, তা-ও দীর্ঘস্থায়ী হয়নি শিল্পী কামরুলের জীবনে। তবু তিনি তরি বেয়েছেন প্রত্যাশিত আশার বন্দরে পৌঁছানোর জন্য। তাঁর চিত্ররাশির দিকে তাকালে আমরা দেখি কালের লেলিহান রূপ, সতত সুন্দর বাংলার প্রকৃতি ও প্রকৃতিশীল মানুষ ও প্রাণিকুলের সচ্ছল বিচরণ, নারীর বিচিত্র অভিব্যক্তি—ইতি-নেতির ঘূর্ণাবর্তে একটি শিল্পীপ্রাণ কত যে মুদ্রায় ঝলকায় তার প্রমাণ কামরুলের সৃষ্টি।

এক আগ্নেয় প্রহরে তাঁর জন্ম। বাংলার ইতিহাস তখন রক্তাপ্লুত। স্বাদেশিক চেতনা তখন শপথ নিয়েছে সশস্ত্র সংগ্রামে। বিপ্লবীদের সন্ত্রাসী বলে হত্যা করছে ঔপনিবেশিক ইংরেজ শাসক। অন্যদিকে হিন্দু-মুসলমানের সম্প্রীতিকে নষ্ট করার জন্য উসকে দেওয়া হচ্ছে কূটচাল। এই দুই প্রধান সম্প্রদায়ের মধ্যে বিরোধের মাত্রা বেড়ে গেলে বাধল দাঙ্গা। এলো মহাযুদ্ধ। রুশ বিপ্লবের পর সাম্যবাদী রাজনীতি প্রতিষ্ঠায় বঞ্চিত ও শোষিত মানুষের মুক্তি আসবে বলে যারা একান্তভাবে আস্থাশীল ছিল এবং শপথ নিয়ে অপরাজনীতির বিরুদ্ধে লড়াই করছিল, তাদেরও হত্যা করল শাসক। তাই সংঘবদ্ধতার ডাক এলো। মুক্তির স্পৃহায় বলীয়ান হলো উপমহাদেশের জনতা। আন্দোলনের কেন্দ্র কলকাতা শহর। এই শহরেই কামরুল পাঠ করেছেন রাজনীতি, দেখেছেন দাঙ্গা, দেখেছেন বোমাবিধ্বস্ত জনপদ, দুর্ভিক্ষ। বিপন্ন মানবতার কান্না আর সব প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে মানুষের সংঘবদ্ধতার শক্তি তরুণ কামরুলকে দিল সৃজনের সারাৎসার। তত দিনে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে শিল্পী-সাহিত্যিকরা সংঘবদ্ধ হয়েছেন, জন্ম নিয়েছে গণনাট্য আন্দোলন। সাম্যবাদী আদর্শে দৃঢ়প্রত্যয়ী হয়েও থামানো গেল না হিন্দু-মুসলমানের বিভেদ। পরিণামে দ্বিখণ্ডিত হলো বাংলা, মানবতার চেয়ে বড় হয়ে উঠল ধর্ম। পরাজিত হলো বাঙালিয়ানার সংগ্রাম। তরুণ কামরুল উদ্দীপ্ত হয়েছিলেন ‘ফ্যাসিবিরোধী লেখক শিল্পী সংঘ’ ও গণনাট্য আন্দোলনের মন্ত্রে। তবে তাঁর দীক্ষা লাভ হয়েছিল কৈশোর-উত্তীর্ণ উদিত যৌবনে গুরুসদয় দত্তের ব্রতচারী আন্দোলনে শপথ নিয়ে। বাঙালির অহিংস-অসাম্প্রদায়িক সমাজ-ভাবনার প্রণোদনা পেয়েছিলেন তিনি ব্রতচারী জীবনাদর্শ থেকে। তিরিশের দশকের শেষে এবং চল্লিশের দশকের শুরুতে তাঁর আত্মজাগরণ। এ সময় তিনি ব্রতচারী ও আর্ট স্কুলে অধ্যয়নরত। এ সময় তিনি আঁকছেন দুর্ভিক্ষের ছবি ও মৌলবাদী নেতাদের ভণ্ড চেহারা। দুষ্টকালকে সমালোচনা করার সূচনা তাঁর এই দেশভাগপূর্বকালে। ভীমরুল ছদ্মনামে তিনি ক্যারিকেচারের ভাষায় পত্র-পত্রিকায় প্রতিনিয়ত কার্টুন এঁকেছেন। কিন্তু তিনি আশাবাদী। রায়বেঁশে নৃত্যের মুদ্রায় প্রকাশ পেল তাঁর লড়াকু মন এবং গাইলেন ব্রতচারী মন্ত্র :

‘আয়রে হিন্দু মুসলমান ভাই গলায় জড়াজড়ি,

এক দেশেতে জন্ম আয় এই দেশের কাজে মরি।’

কিন্তু এক দেশ দুই দেশ হয়ে গেল। সেই ঐক্যের আহ্বান ব্যর্থ করে দিল দ্বিজাতিতত্ত্ব। নতুন রাষ্ট্রে নতুন লড়াই শুরু হলো কামরুলের। পাকিস্তানের সামরিক শাসকের রক্তচক্ষু তোয়াক্কা না করে শাণিত করলেন তুলি এবং আঁকলেন আবারও শাসকের কুটিল রূপ। কিন্তু পূর্ব বাংলার সরস প্রকৃতির সজীব প্রকাশ আহ্লাদিত করে শিল্পীর সৃজনকাতর মন। কামরুল আঁকেন আবহমান বাংলার রূপ। নারী ও প্রকৃতি পরস্পরিত করে অনাবিল আনন্দ প্রকাশ করেন শিল্পী। লোককলার সঙ্গে পিকাসোর কিউবিজমের সমন্বয় ঘটান। তাঁর ‘তিনকন্যা’ একটি রূপক ছবি। তিন নারী তিন রঙা শাড়ি পরা। নীল, হলুদ ও লালের অমিশ্র প্রয়োগে তিনি চিত্রিত করেছেন বধূ, মাতা ও কন্যা। তিন নারীকে ঘিরে আছে পল্লবিত সবুজ প্রকৃতি। কিন্তু নারীত্রয়ের মুখ নিরীক্ষণ করলে বোঝা যায় না কে মাতা, কে বধূ কে-ই বা কন্যা। এ বিষয়টি ঘুরেফিরে জীবনে বেশ কয়েকবার এঁকেছেন কামরুল হাসান। নারীদের মুখে আছে কিউবিক পরিচর্যা। সবুজের সঙ্গে তিন মৌলিক রং প্রকৃতিস্বরূপা নারীর বিবিধ প্রকাশ। নারী প্রকৃতি, প্রকৃতিই নারী এবং মাতৃকাশক্তির আধার। কৈশোর উত্তীর্ণ প্রথম যৌবনে কামরুল শরীরচর্চা করেছেন। সুস্থ দেহে সুস্থ মনের সাধনা যেন রয়ে গেছে তাঁর রক্তবীজে। প্রামাণিক সুঠাম দেহ গড়ে তোলার জন্য তিনি লাভ করেছিলেন মিস্টার বেঙ্গল উপাধি। অঙ্গ-প্রতঙ্গ সঞ্চালনে ক্রিয়াশীল মানুষি দেহ আঁকায় তাঁর আকর্ষণ ছিল প্রবল। তাই জেলেদের মৎস্য শিকার, মাল্লাদের গুন টানা ইত্যাদি বিষয় আঁকার সময় পেশির প্রকাশকে দীপ্র করে রেখেছেন কামরুল। তবে দেহভঙ্গিমার বিচিত্র প্রকাশের নজির তাঁর নারীচিত্র। কামজ বাসনায় অধীর নারী, স্তনদায়িনী মা, প্রসাধনরত নারী, কলসি কাঁখে নারী—এমন সদর্থক প্রকাশেই সীমায়িত নয় শিল্পীর নারীচিত্র। নারীকে তিনি প্রেতায়িত পরিমণ্ডলে কুটিল রূপেও এঁকেছেন বহুবার। নারীদের স্নেহশীলা, প্রেমিকা, বধূ, কল্যাণকামী, গর্ভধারিণী, সর্বংসহা মানবী রূপেই নয় শুধু, তাদের ডাকিনী অভিব্যক্তিতেও অজস্র ছবি এঁকেছেন কামরুল। তাঁর জীবন-অভিজ্ঞতা তাঁকে এই দ্বান্দ্বিক শিক্ষা দিয়েছে। এমনকি দুষ্ট কালপ্রহরের কুটিল কুশীলব হিসেবে নারীর অভিব্যক্তিতেই নির্ভর করেছেন শিল্পী। মানব বা মানবীর স্বভাব প্রকৃতি একরৈখিক বিশ্বাসের মতো নয়। জটিলতাই অস্তিত্বের স্বরূপতা প্রকাশ করে। কামরুলের দ্বান্দ্বিক ভাষ্যে মানুষি দেহে আমরা খুঁজে পাই বহু উৎসর ভাষা। লোককলার শৈলী, ভারতীয় ধ্রুপদি মূর্তিকলা, বাস্তববাদী রীতি, কালীঘাটের পটের রেখা ও ফর্ম এবং পিকাসোর কিউবিজম। মানুষের অস্তিত্বের বিচিত্র প্রকাশের মুদ্রা নিরূপণের জন্য কামরুলকে একই ছবিতে সংহত করতে হয়েছে এত বিচিত্র শৈল্পিক পরিচর্যা। কামরুল একই সঙ্গে চিরকালের ও সমকালের ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগত। বঙ্গজ সংস্কৃতির শিকড় তাঁর মর্মমূলে প্রোথিত। তাই তাঁর ছবিতে আছে ফসলের রং, ফুলের প্রফুল্লতা, পাখিদের আনাগোনা, সর্বোপরি উৎসবমুখর বাংলার রূপ।

কিন্তু তাঁর কাঙ্ক্ষিত সোনার বাংলা স্বরূপিণী স্বদেশকে তিনি প্রতিষ্ঠিত করার জন্য অব্যাহত রাখেন সংগ্রাম। ’৬৯-এ রচনা করেন ‘অক্ষর বৃক্ষ’। বাংলা একাডেমির বটবৃক্ষের শাখায় তিনি ঝুলিয়ে দেন বাংলা অক্ষর আর বক্তব্য দিয়ে বলেন প্রতিটি অক্ষর বাঙালির প্রাণ। আঁকেন গণ-অভ্যুত্থানে আগুয়ান মিছিলের ছবি। ’৭১-এ আঁকেন দানবীয় রূপে রক্তশোষক ইয়াহিয়া খানকে। এই দানবরূপী জেনারেলের অনেকগুলো মুখ এঁকে তিনি শহীদ মিনারে প্রদর্শনী করেন। এই মুখই মুক্তিযুদ্ধে লক্ষ কপি ছাপা হয়। রাক্ষুসে মুখের নিচে লেখা হয়, ‘এই জানোয়ারদের হত্যা করতে হবে’। ইংরেজিতে লেখা হয় ‘কিল দিজ ডেমন্স’ এবং তা ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বময়। ’৭১-এর গণহত্যার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ এবং মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে নানা দেশ ও ব্যক্তির সমর্থন সৃষ্টিতে কামরুল হাসানের সেই পোস্টার ছিল সবচেয়ে সরব মুখপত্র এবং সহস্র মেশিনগানতুল্য সমরাস্ত্র।

যুদ্ধপর্বে কামরুল আবার আঁকেন সেই তিনকন্যা। একই সঙ্গে তিনকন্যার দুটি সংস্করণ। একটিতে সেই তিন নারী বিচলিত, অপরটির তিন নারীকে আর নারীরূপে চেনা যায় না। কারণ, তাদের ধর্ষণ করে মেরে ফেলা হয়েছে। এখন তাদের কঙ্কালরূপ ফুটে উঠেছে চিত্রতলে। দুটি ঘটনার বিবরণে বিষয় ব্যাখ্যা করাকে বলে ডিপটিস। কামরুল শাশ্বতী বাংলা ও যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলার সন্দর্ভ রচনা করেছেন তিনকন্যার ডিপটিসে। আর নারী গেরিলা যোদ্ধাও ’৭১-এ চিত্রার্পিত করেছেন তিনি। খুব সম্ভব কামরুল হাসানই একমাত্র শিল্পী যিনি ’৭১-এ মুক্তিযুদ্ধের সময় সশস্ত্র নারী গেরিলা যোদ্ধাকে এঁকেছেন। কেননা এই শিল্পী গভীরভাবে বুঝেছেন যুদ্ধংদেহি সংহারী মাতৃপ্রতিমাতেই প্রকাশিত বাঙালির—বাংলার অপরাজিত অস্তিত্ব।

 



সাতদিনের সেরা