kalerkantho

সোমবার । ৩ মাঘ ১৪২৮। ১৭ জানুয়ারি ২০২২। ১৩ জমাদিউস সানি ১৪৪৩

গ্রাহককে অস্ত্র দেখিয়ে ভয় দেখাতেন পাভেল

এস এম আজাদ   

২ ডিসেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



গ্রাহককে অস্ত্র দেখিয়ে ভয় দেখাতেন পাভেল

দুই বছর আগে কয়েকজন অংশীদারকে নিয়ে রাজধানীর উত্তরায় ‘ফাল্গুনীশপ ডটকম’ নামে ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান খোলেন পাভেল হোসেন (৩০)। কিছুদিন না যেতেই প্রতারণার অভিযোগ ওঠে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে। এই পরিস্থিতিতে ওই প্রতিষ্ঠান থেকে অংশীদাররা সরে যান। তবে তাঁদের নাম ব্যবহার করে পাভেল চালিয়ে যান লেনদেন ও প্রতারণা।

গত মে মাসে প্রতারণার অভিযোগে অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) দুই সহযোগীসহ পাভেলকে গ্রেপ্তার করে। কয়েক শ গ্রাহকের সঙ্গে প্রতারণা করে কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার তথ্যও পান তদন্তকারীরা। ওই সময় মাত্র ২১ দিন পরই জামিনে ছাড়া পেয়ে যান তিনি। ঠিকানা পাল্টে রাজধানীর বনশ্রী এলাকায় গিয়ে ‘অরিমপো ডটকম’ ও ‘টেক ফ্যামিলি ডটকম’ নামে প্রতিষ্ঠান খুলে একই কারবার শুরু করেন। ই-কমার্সের নামে প্রতারণার ব্যবসা চালাতে পাভেল আরো ২৫টি নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠান চালু করেন। পাওনাদার ও অংশীদারদের নামে চেক দিয়ে এবং বিভিন্নভাবে প্রতারণা শুরু করেন। পণ্য বা টাকা ফেরত চাইলে পাওনাদারকে অস্ত্র দেখিয়ে ভয় দেখাতেন পাভেল ও তাঁর সহযোগীরা। যাঁরা চাপ দিতেন তাঁদের টর্চার সেলে নিয়ে নির্যাতনও করা হতো।

গত ২৪ নভেম্বর র‌্যাবের হাতে তিন সহযোগীসহ পাভেল দ্বিতীয় দফায় গ্রেপ্তার হলে এসব তথ্য বেরিয়ে আসে। তাঁদের কাছ থেকে এবার একটি বিদেশি পিস্তল, চার বোতল মদ, ২৪ ক্যান বিয়ারসহ অনলাইনে বিক্রির বিজ্ঞাপন দেওয়া বিভিন্ন পণ্য জব্দ করা হয়। গত শনিবার প্রতারণা ও অস্ত্র আইনে খিলগাঁও থানার দুটি মামলায় পাভেলের চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন ঢাকার মহানগর হাকিম আদালত। খিলগাঁও থানা পুলিশ তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করে। ভুক্তভোগী গ্রাহক, সিআইডি ও র‌্যাবের তদন্তকারীরা বলছেন, চতুর পাভেল

প্রতারণা করে টাকা হাতিয়ে নিতে ভিন্ন নামে প্রতিষ্ঠান চালু করেছিলেন। শত শত গ্রাহক টাকা হারিয়ে উল্টো হয়রানির শিকার হয়েছেন।

পাভেলের বিরুদ্ধে উত্তরা পশ্চিম থানায় করা মামলার তদন্ত করছেন সিআইডির পরিদর্শক রেজাউল করিম। তিনি বলেন, ‘আমরা গত মে মাসে দুই সহযোগীসহ পাভেলকে গ্রেপ্তার করি। এরপর তাকে রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। চতুর পাভেল প্রতারণার কথা অস্বীকার করলেও আমরা তার ইনভয়েস ও ই-মেইল থেকে ১৩০ গ্রাহককে পণ্য না দিয়ে দীর্ঘদিন ঘোরানোর তথ্য পাই। তাঁদের কয়েকজন আমাদের কাছে জবানবন্দি দিয়েছেন।’ তিনি আরো বলেন, ‘কয়েক দিন পরই পাভেল জামিন পেয়ে লাপাত্তা হয়ে যায়। এবার অস্ত্রসহ ধরা পড়েছে সে।’ রেজাউল করিম আরো বলেন, ‘আমাদের তদন্ত শেষ পর্যায়ে। প্রতারণার অভিযোগ প্রমাণিত হলেই মানি লন্ডারিং তদন্ত হবে।’

ভুক্তভোগী গ্রাহক শহিদুল ইসলাম মিন্টু বলেন, ‘আমি গত মার্চ মাসে মোটরসাইকেলের জন্য এক লাখ ৬৮ হাজার টাকা দিই। পরে আর পাচ্ছিলাম না। এরই মধ্যে সিআইডি পাভেলকে গ্রেপ্তার করে। পরে সিআইডির কাছে গিয়ে অভিযোগ করি। এখন আবার র‌্যাব ধরেছে তাকে। সেখানে আমরা গেছি। কিন্তু এখনো টাকা পাচ্ছি না।’

তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, কিছু গ্রাহক ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরে ফাল্গুনীশপ ও পাভেলের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন। এরপর অধিদপ্তর একাধিকবার নোটিশ দেয় প্রতিষ্ঠানটিকে। উত্তরার আউটলেট বন্ধ করে দেয় অধিদপ্তর। জামিনে ছাড়া পাওয়ার পর জুলাইয়ে পাভেল বনশ্রী এলাকায় ‘অরিমপো ডটকম’ ও ‘টেক ফ্যামিলি ডটকম’ নামে নতুন অফিস চালু করেন। এর আড়ালেই ফাল্গুনীশপ ডটকমের কার্যক্রম পরিচালনা করেন। পাভেল নতুন দুটি প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) এবং তাঁর স্ত্রী রিতা আক্তারকে করেন চেয়ারম্যান।

র‌্যাব-৪-এর অধিনায়ক মোজাম্মেল হক বলেন, ২০১৯ সালের শুরুতে পাভেল, দিদারুল আলম, কানিজ ফাতেমা ও রহমতুল্লাহ শওকত মিলে ফাল্গুনীশপ ডটকম চালু করেন। শুরুতে তাঁরা উত্তরা এলাকায় ভাড়া বাসায় আউটলেট খুলে ব্যাবসায়িক কার্যক্রম শুরু করেন। ব্যবসার শুরুতেই পাভেলের অন্য অংশীদাররা গ্রাহক ঠকানোর বিষয়টি বুঝতে পারেন এবং তাঁরা তাঁর বিরুদ্ধে থানায় জিডি করেন। পরে অংশীদাররা যৌথ ব্যবসা থেকে সরে আসেন। এরপর পাভেল তাঁদের নামে জাল সিল ও সই ব্যবহার করে গ্রাহকদের প্রতারিত করতেন। মোজাম্মেল হক আরো বলেন, প্রতারণা করতে ফাল্গুনীশপ ডটকম নামে কোনো ব্যাংক হিসাব খোলেননি পাভেল। তাঁর নিজের নামে চারটি ব্যাংক হিসাবে ২০১৯ সাল থেকে চার কোটি টাকার লেনদেন হয়েছে। এখন আছে মাত্র ১৫ লাখ টাকা। ফাল্গুনীশপসহ ২৮টি নামসর্বস্ব কম্পনির মালিক পাভেল, বাকিগুলোর অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। ক্রেতাদের টাকায় জমি ও প্লট কিনেছেন পাভেল ও তাঁর স্ত্রী রিতা আক্তার। রিতাকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।

জানা যায়, ২০০৯ সালে এইচএসসিতে অধ্যয়নরত অবস্থায় পাভেল অস্ত্রসহ র‌্যাবের হাতে ধরা পড়েন। তাঁর বিরুদ্ধে তেজগাঁও থানায় অস্ত্র মামলা রয়েছে। ২০১৪ সালে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং গ্র্যাজুয়েশন করার পর রাজবাড়ীতে ৪০ হাজার টাকা বেতনে চাকরি শুরু করেন। পরবর্তী সময়ে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের একজন ঠিকাদার হিসেবে কাজ করার সময় তাঁর পরিচিত একজন

তাঁকে অনলাইন ব্যবসা করার পরিকল্পনা দেন।



সাতদিনের সেরা