kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৩ মাঘ ১৪২৮। ২৭ জানুয়ারি ২০২২। ২৩ জমাদিউস সানি ১৪৪৩

টঙ্গীর মাজার বস্তিতে পুড়ল হাজার ঘর

‘জানডা লইয়া বাইর হইছি’

► বস্তিবাসী যখন ঘুমিয়ে ছিল, তখন আগুন ছড়িয়ে পড়ে
► সব হারিয়ে বস্তির শত শত বাসিন্দা আশ্রয় নিয়েছে খোলা আকাশের নিচে

নিজস্ব প্রতিবেদক, গাজীপুর   

২৮ নভেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



‘জানডা লইয়া বাইর হইছি’

আগুনে পুড়ে যাওয়া গাজীপুরের টঙ্গীর হাজীর মাজার বস্তি। গতকাল তোলা। ছবি : কালের কণ্ঠ

‘ভোর রাইতে আগুন লাগছে, খালি জানডা লইয়া বাইর হইছি। ঘাট-বিছানা, হাঁড়ি-পাতিল সব পুইড়া ছাই। আর কেমনে কী করমু, সবই তো শ্যাষ...। ’ নিজের ভিটায় পোড়া ছাইয়ের স্তূপের মধ্যে মাটির ব্যাংকে জমানো টাকা খুঁজতে খুঁজতে এভাবেই প্রলাপ বকছিলেন বৃদ্ধা ছুরিয়া বেগম।

বিজ্ঞাপন

এমন ভোরের জন্য তিনি একেবারেই প্রস্তুত ছিলেন না। ছুরিয়ার মতো আরো অনেকেরই চোখের কোণে জল, বুকে সব হারানোর বেদনা।

গাজীপুরের টঙ্গীর হাজীর মাজার বস্তিতে গতকাল শনিবার ভোরে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে পুড়েছে সহস্রাধিক ঘর। এ ঘটনায় হতাহতের কোনো খবর পাওয়া যায়নি। তবে সব হারিয়ে বস্তির শত শত বাসিন্দা আশ্রয় নিয়েছে খোলা আকাশের নিচে। ফায়ার সার্ভিসের ৯টি ইউনিট আনুমানিক চার ঘণ্টার চেষ্টায় সকাল ৮টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। তবে দুপুর পর্যন্ত বস্তির বিভিন্ন স্থান থেকে ধোঁয়া বের হতে দেখা যায়।

গাজীপুর ফায়ার সার্ভিসের সহকারী উপপরিচালক মো. আবদুল হামিদ মিয়া জানান, গতকাল ভোর ৪টার দিকে বস্তিতে আগুন লাগে। ওই সময় বস্তিবাসী ঘুমিয়ে ছিল। আগুনের তাপে ঘর থেকে এক কাপড়ে বের হয়ে সবাই নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ছুটতে থাকে। প্রথমে টঙ্গী ফায়ার সার্ভিস ঘটনাস্থলে যায়। পরে ঢাকা থেকে ফায়ার সার্ভিসের আরো সাতটিসহ মোট ৯টি ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নেভানোর কাজ শুরু করে। সকাল ৮টার দিকে আগুন নেভানো সম্ভব হয়। আগুন কিভাবে লেগেছে, সে বিষয়ে এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।  

এদিকে আগুন লাগার খবর পেয়ে ভোরেই ঘটনাস্থলে যান স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর মো. গিয়াস উদ্দিন সরকার। তিনি ক্ষতিগ্রস্তদের সাত দিন তিন বেলা খাবারের দায়িত্ব নেন। তিনি জানান, স্বাধীনতার পর সরকারি পুকুরের ওপর মাজার বস্তিটি গড়ে উঠেছে। বাঁশ, কাঠ ও টিন দিয়ে বস্তিটির ঘরগুলো তৈরি। বাসিন্দাদের সবাই নিম্ন আয়ের মানুষ। বস্তি হলেও সবার ঘরেই টিভি, ফ্রিজ, খাট, শোকেস ছিল। কমপক্ষে এক হাজার ঘর পুড়ে মাটির সঙ্গে মিশে গেছে। উপজেলা প্রশাসন ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা তৈরি করছে।

সকালে ভারপ্রাপ্ত মেয়র আসাদুর রহমান কিরণ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। তিনি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে পুনর্বাসনের আশ্বাস দেন।  

ছুরিয়া বেগমদের কান্না : কাঁদতে কাঁদতে দুই চোখের জল শুকিয়েছে বৃদ্ধা ছুরিয়ার। জানালেন, ৪০ বছর ধরে এই বস্তিতে তাঁর বাস। একটি দোকান ও চারটি ঘর ছিল। দুটিতে দুই ছেলে থাকতেন। অন্য দুটি ভাড়া দেওয়া। বড় ছেলে আবু সাঈদ বস্তির পাশে মুদি দোকান করতেন। দোকানের আট লাখ টাকার মালসহ সব পুড়ে গেছে। ঘরে ছিল টিভি, ফ্রিজ, খাট, আলমারিসহ অনেক জিনিস। এক সপ্তাহ আগে সাঈদ এক লাখ ৬৫ হাজার টাকা দিয়ে দুটি খাট বানিয়ে এনেছিলেন। নতুন ঘর বানানোর জন্য ঘরে লাখখানেক টাকাও ছিল। কিছুই নিয়ে বের হতে পারেননি তিনি।

রাস্তায় বসে পুড়ে যাওয়া ঘরের দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে কাঁদতেও ভুলে গেছেন মুক্তি বেগম। পাশেই বসে ছিলেন স্বামী রিপন। চোখে-মুখে রাজ্যের হতাশা। আগুনের বর্ণনা দিতে গিয়ে মুক্তি বলেন, ‘তিন মেয়ে নিয়ে আমরা ঘুমিয়ে ছিলাম। চিল্লাচিল্লিতে ঘুম ভেঙে গেলে উঠে দেখি, আগুন ঘরের কাছে চলে এসেছে। তিন মেয়েকে নিয়ে ঘর থেকে বের হয়ে কোনো রকমে সড়কে উঠে আশ্রয় নিই। ’

মুক্তি আরো বলেন, ‘ঘরে টিভি-ফ্রিজ-খাট, হাঁড়িপাতিলসহ অনেক কিছু ছিল। বড় মেয়ে এবার এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছে। একটি ট্রাংকে মেয়ের বিয়ের জন্য সারা জীবনের সঞ্চয়ের ৬৫ হাজার টাকা ছিল। কিছুই নিয়ে আসতে পারিনি। ’

রিপন মিয়া বলেন, ‘আগুন লাগার পর বিদ্যুৎ চলে যায়। অন্ধকারে অনেকের ঘরে লুটপাট হয়। যারা আগে আগুন দেখে রাস্তা বা নিরাপদ জায়গায় জিনিসপত্র রেখে আবার ঘরে গিয়েছিল, এসে দেখে তাদের মালপত্র নেই। ’

৯ বছর আগে শেরপুরের নালিতাবাড়ী থেকে স্বামীর সঙ্গে টঙ্গীর মাজার বস্তিতে এসে ঘর বাঁধেন শিল্পী বেগম। ঘর আলো করে কোলজুড়ে আসে দুই মেয়ে। অভাবের সংসারে আর্থিক সংকট থাকলেও ভালোবাসার কমতি ছিল না। নানা স্বপ্ন দিয়ে তৈরি করা সাজানো সংসার এক নিমেষেই চোখের সামনে আগুনে পুড়তে দেখে হতভম্ব হয়ে পড়েন শিল্পী।

গতকাল দুপুরে দুই মেয়েকে নিয়ে পুড়ে যাওয়া ঘরের মালপত্র সরাতে গিয়ে দেখেন, ছোট মেয়ে পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রী রূপার বইপত্রও বেশির ভাগ পুড়ে গেছে। পোড়া বই দেখে রূপা কেঁদে কেঁদে বলছিল, ‘আমার বই-খাতা পুইড়া গেছে। আমি পড়মু ক্যামনে। ’

বস্তির উত্তর প্রান্তে খোলা আকাশের নিচে নাতি কোলে সন্তানদের নিয়ে আহাজারি করছিলেন আকলিমা বেগম। জানালেন, স্বামী মমিন মিয়া ভ্যানচালক। ২০ বছর আগে দুটি ঘর তুলে বস্তিতে বসবাস শুরু করেন। আগুনের তাপ ও কান্নাকাটিতে ঘুম ভেঙে গেলে দেখেন, বস্তিতে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে। বড় ছেলে আকাশের দুই পা অচল। কোনো রকমে তাকে কোলে নিয়ে রাস্তায় উঠে জীবন বাঁচিয়েছেন। প্রতিদিন ছেলেকে ফিজিওথেরাপি দিতে হয়। ৫২০ টাকা লাগে। ছেলের চিকিৎসার জন্য শুক্রবার সন্ধ্যায় ২০ হাজার টাকা ধার করে এনেছিলেন। ওই টাকাও পুড়ে ছাই। আকলিমা বলেন, ‘সকালে নেতারা দুই প্যাকেট খিচুড়ি দিয়া গেছিল। ভাগজোগ কইরা খাইছি। দুপুর-রাইতে ছেলেমেয়ের পাতে কী দিমু জানি না। ক্যামনে ঘর তুলুম, ছেলের চিকিৎসাই বা ক্যামনে হইব। আল্লাহ ক্যান এমনডা করল!’

 

 



সাতদিনের সেরা