kalerkantho

বুধবার । ১৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৮। ১ ডিসেম্বর ২০২১। ২৫ রবিউস সানি ১৪৪৩

এ সপ্তাহের সাক্ষাৎকার

এলডিসি থেকে বেরোলে বাংলাদেশ ব্র্যান্ডিং হবে

ড. মোস্তাফিজুর রহমান, বিশেষ ফেলো, সিপিডি

২৬ নভেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



এলডিসি থেকে বেরোলে বাংলাদেশ ব্র্যান্ডিং হবে

বাংলাদেশকে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) কাতার থেকে উত্তরণের সুপারিশ করেছে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ। এ প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের সুবিধা, চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের উপায় নিয়ে কালের কণ্ঠের সঙ্গে কথা বলেছেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশেষ ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সজীব হোম রায়

 

কালের কণ্ঠ : এলডিসির কাতার থেকে উত্তরণে বাংলাদেশ কতটা লাভবান হবে?

মোস্তাফিজুর রহমান : এলডিসি থেকে কোন দেশ বের হবে সেটা সুপারিশ করে জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি (সিডিপি)। মাথাপিছু আয়, মানবসম্পদ, জলবায়ু ও অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা—এই তিন সূচক হলো উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হওয়ার প্রধান মাপকাঠি। এর মধ্যে যেকোনো দুটি সূচকে যোগ্যতা অর্জন করতে হয় কিংবা মাথাপিছু আয় নির্দিষ্ট সীমার দ্বিগুণ করতে হয়। বাংলাদেশ তিনটি সূচকেই ভালো করেছে। বাংলাদেশ যে সক্ষমতা অর্জন করেছে, এর প্রতিফলন হলো এলডিসি উত্তরণে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অনুমোদন।

এলডিসি থেকে উত্তরণে বাংলাদেশ বেশ কিছু বিষয়ে সুবিধা পাবে। বিশেষ করে সারা বিশ্বে বাংলাদেশের ব্র্যান্ডিং হবে। বিশ্বের প্রতিটি দেশ এখন বাংলাদেশকে আরো সমীহ করবে। বিশ্বদরবারে দর-কষাকষিতে বাংলাদেশের অবস্থান আরো শক্ত হবে।

 

কালের কণ্ঠ : বিদেশি বিনিয়োগে বাংলাদেশ এখনো অনেক পিছিয়ে। এ ক্ষেত্রে কতটা সম্ভবনা তৈরি হবে?

মোস্তাফিজুর রহমান : উন্নয়নশীল দেশের অর্থনৈতিক ভিত্তি শক্তিশালী হয়। তাই আগে যেসব দেশ বাংলাদেশে বিনিয়োগ করতে চিন্তা করত, এখন সেই দেশগুলো বিনিয়োগে আস্থা পাবে। ফলে বিদেশি বিনিয়োগের অপার সম্ভাবনার জায়গা তৈরি হবে। এতে শক্তিশালী হবে রিজার্ভ। বিদেশি বিনিয়োগ এলে নতুন শিল্প-কারখানা স্থাপিত হতে পারে। আর তা হলে অনেক কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হবে।

 

কালের কণ্ঠ : উন্নয়ন সহযোগী দেশগুলোর কাছ থেকে আমরা কতটা সাড়া পাব?

মোস্তাফিজুর রহমান : বাংলাদেশ যেহেতু তিনটি সূচকে ভালো করেছে, এখন অন্য দেশ থেকে ঋণ পাওয়া খুব সহজ হবে। বিশ্বের অন্য দেশগুলোও জানবে, বাংলাদেশের সব সূচক ভালো। তাদের ওপর আস্থা রাখা যায়। এ ছাড়া বিনিয়োগের ক্ষেত্রে প্রাইভেট সেক্টর আগের চেয়ে ভালো করবে। প্রাইভেট সেক্টর বাইরে গেলে এখন ক্রেডিট রেটিং ভালো পাবে। ফলে তাদের জন্য সুবিধা হবে।

 

কালের কণ্ঠ : এলডিসি থেকে উত্তরণে যেমন সুবিধা রয়েছে, চ্যালেঞ্জও আছে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে কী কী চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে?

মোস্তাফিজুর রহমান : বাংলাদেশ এখন উগান্ডা, কিরিবাতি, হাইতি, টুভালু, জিবুতি, গিনি, নেপাল, মিয়ানমারের মতো দেশের কাতারে রয়েছে। এলডিসি থেকে উত্তরণ হলে চীন, ভারত, মালয়েশিয়া, ভিয়েতনামের মতো দেশের কাতারে যাবে বাংলাদেশ। পার্থক্যটা স্পষ্ট। তাই আগে আমরা যেসব সুবিধা পেতাম, ২০২৬ সালের পর তা আর পাব না।

 

কালের কণ্ঠ : রপ্তানিসহ অন্যান্য খাত কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হবে?

মোস্তাফিজুর রহমান : স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে বাংলাদেশ বিভিন্ন পণ্য রপ্তানিতে শুল্ক সুবিধা ভোগ করে আসছে, কিন্তু উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হলে বাংলাদেশ এ অগ্রাধিকার সুবিধা থেকে বঞ্চিত হবে। বিশেষ করে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) শুল্ক ও কোটামুক্ত যে সুবিধা আছে, সেটা আর পাওয়া যাবে না। তবে ইইউ বাজারে বাংলাদেশ ২০২৬ সালের পর আরো তিন বছর অর্থাৎ ২০২৯ সাল পর্যন্ত শুল্ক ও কোটামুক্ত সুবিধা ভোগ করতে পারবে। এ ছাড়া প্রস্তুতিকালে বাংলাদেশ এলডিসি হিসেবে যেসব সুযোগ-সুবিধা পেয়ে আসছিল, সেগুলো অব্যাহত থাকবে।

বাংলাদেশের ওষুধ প্রস্তুতকারক কম্পানিগুলোকে এখন আবিষ্কারক প্রতিষ্ঠানকে মেধাস্বত্বের জন্য অর্থ দিতে হয় না। এই সুবিধা কাজে লাগিয়ে দেশের ওষুধশিল্প শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েছে। তবে এলডিসি থেকে বের হলে এই সুবিধা আর থাকবে না।

বাংলাদেশ শিল্প ও কৃষি খাতের বিভিন্ন পণ্য বা সেবার ওপর ভর্তুকি দিতে পারে। এ ছাড়া রপ্তানি আয় ও প্রবাসী আয়ে নগদ সহায়তা দেয়। এসব সুবিধা থেকে বঞ্চিত হতে পারি আমরা।

 

কালের কণ্ঠ : স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে বাংলাদেশ এত দিন সহজ শর্তে ঋণ পেয়ে আসছে। এ ক্ষেত্রে কী প্রভাব পড়বে?

মোস্তাফিজুর রহমান : সুদৃঢ় অর্থনৈতিক ভিত্তির কারণে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর কাছ থেকে সহজ শর্তে ও স্বল্প সুদে ঋণ পাওয়া কঠিন হবে। এখন তাদের সঙ্গে আলোচনা করে ঋণ পেতে হবে। আঞ্চলিক বাজারেও ব্যাপক প্রতিযোগিতার মধ্যে পড়বে বাংলাদেশ। এ জন্য আমাদের প্রস্তুত হতে হবে।

 

কালের কণ্ঠ : এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় এখন করণীয় কী?

মোস্তাফিজুর রহমান : বিনিয়োগ, বাণিজ্য, যোগাযোগ, অবকাঠামো, শিক্ষা, ই-কমার্সের মতো বিষয়গুলোতে আমাদের আরো ভালো করতে হবে। আরো দক্ষতা অর্জনের পাশাপাশি বাড়াতে হবে উৎপাদনশীলতা। হাতে এখনো পাঁচ বছর সময় আছে। সেটাকে কাজে লাগাতে হবে পরিপূর্ণভাবে। চীন, ভারত, মালয়েশিয়া, ভিয়েতনামের মতো দেশগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করার জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত হতে হবে। চাহিদা তৈরি করতে হবে আঞ্চলিক বাজারে। রপ্তানি পণ্য বহুমুখীকরণ করতে হবে। প্রধানমন্ত্রী এরই মধ্যে মুখ্য সচিবের নেতৃত্বে ২২ সদস্যের উচ্চ পর্যায়ের কমিটি গঠন করেছেন। এসব চ্যালেঞ্জকে অগ্রাধিকার দিয়ে কমিটিকে কাজ করতে হবে। এগুলো না করতে পারলে আমরা পিছিয়ে পড়ব।

 



সাতদিনের সেরা