kalerkantho

বুধবার । ১৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৮। ১ ডিসেম্বর ২০২১। ২৫ রবিউস সানি ১৪৪৩

অর্থনীতি বহুমুখীকরণের তাগিদ

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২৬ নভেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



অর্থনীতি বহুমুখীকরণের তাগিদ

স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণে উচ্ছ্বাসের পাশাপাশি নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে যাচ্ছে বাংলাদেশ। সামনে যেমন নতুন সুযোগ তৈরি হবে, চ্যালেঞ্জও অনেক। কিছু সুবিধা বাতিলের পাশাপাশি বাংলাদেশের পণ্যের ওপর বসবে শুল্ক। রপ্তানিমুখী পণ্য বিশ্ববাজারে প্রবেশে শর্তের জালে পড়বে। এ জন্য অর্থনীতির বহুমুখীকরণ, উৎপাদনশীলতা বাড়ানো, মেধাস্বত্ব আইনের প্রয়োগ, সামাজিক মানোন্নয়নে জোর দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন অর্থনীতিবিদসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তাঁরা বলেছেন, এলডিসি উত্তরণ ‘মসৃণ’ করতে কর আদায় বাড়ানো, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, স্বাস্থ্য সুরক্ষাসহ পরিবেশবান্ধব জ্বালানি নিশ্চিত করার মতো চ্যালেঞ্জে পড়তে হবে।

বুধবার রাতে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৭৬তম বৈঠকের ৪০তম প্লেনারি সভায় এলডিসি থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের সুপারিশ জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে (ইউএনজিএ) অনুমোদিত হয়েছে। বাংলাদেশ গত ২৬ ফেব্রুয়ারি জাতিসংঘের ‘কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসির (সিডিপি)’ ত্রিবার্ষিক পর্যালোচনাসভায় দ্বিতীয়বারের মতো স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের মানদণ্ড পূরণের মাধ্যমে উত্তরণের সুপারিশ লাভ করেছিল। সিডিপি একই সঙ্গে বাংলাদেশকে ২০২১ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরের প্রস্তুতিকালীন সময় দেওয়ার সুপারিশ করেছে। এর পর বাংলাদেশের উত্তরণ ২০২৬ সালের ২৩ নভেম্বর কার্যকর হওয়ার কথা।

অসুবিধা : ২০২৬ সালের পর বাংলাদেশ যখন এলডিসি থাকবে না, বিশ্ববাজারে তখন পণ্য রপ্তানি শুল্ক ও কোটামুক্ত থাকবে না। এ সময় প্রস্তুতি না থাকলে ১২ শতাংশ শুল্ক দিয়ে বাংলাদেশকে বিশ্ববাজারে ঢুকতে হবে। চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় কিভাবে সহায়তা পাওয়া যায়, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডাব্লিউটিও) আসন্ন ১২তম মন্ত্রিপর্যায়ের সম্মেলনে (এমসি-১২) বিষয়টি তুলে ধরার পরামর্শ দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। শুল্কমুক্ত বাণিজ্য সুবিধা প্রত্যাহার হলে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় ৮ থেকে ১০ শতাংশ কমে যাবে। এতে বছরে প্রায় ২৫০ কোটি ডলারের (২১ হাজার কোটি টাকা) রপ্তানি আয় কমবে। এ ছাড়া উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হলে সরাসরি বাণিজ্যিক কর সুবিধা হারাতে হবে। বিভিন্ন ঋণের সুদের হারও কিছুটা বেড়ে যাবে।

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানিত ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক এই দুটি জায়গায় গ্র্যাজুয়েশনের পর বাংলাদেশের অভিঘাত সৃষ্টি হবে। বিভিন্ন অগ্রাধিকার সুবিধায় বাংলাদেশ ৭০ শতাংশ পণ্য রপ্তানি করে। উত্তরণের পর প্রস্তুতি না থাকলে ৯০ শতাংশ রপ্তানি আয়ে ক্ষতির প্রভাব পড়বে। ওই সময় ১২ শতাংশ শুল্ক দিয়ে বাংলাদেশকে ঢুকতে হবে বৈশ্বিক বাজারে।’ এদিকে এলডিসি থেকে উত্তরণ হলে ওষুধশিল্পের মেধাস্বত্ব বিধি-বিধান আরো কড়াকড়ি হবে।

বিকন ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৫ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ এবাদুল করিম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘উন্নয়নশীল দেশে চূড়ান্তভাবে উন্নীত হলে আমাদের ওষুধশিল্পে বড় ধাক্কা লাগবে। আমরা ওষুধের ফর্মুলেশনে অনেক এগিয়েছি। কিন্তু আরঅ্যান্ডডিতে পেছনে আছি।’ আগামীর চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় উন্নত প্রযুক্তিতে প্লান্ট সম্প্রসারণ, মানবসম্পদ উন্নয়ন ও গবেষণায় জোর দেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।

সুবিধা : বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশের কাতারে উন্নীত হলে ক্ষতির চেয়ে লাভ বেশি হবে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। তাঁরা বলছেন, সবচেয়ে বড় লাভ বিশ্বে বাংলাদেশের ইমেজ বাড়বে। বর্তমানে ৪৭টি দেশে ভিসামুক্ত প্রবেশাধিকার পায় বাংলাদেশ। তখন এক শর বেশি দেশে এই সুযোগ পাওয়া যাবে। বেসরকারি খাতেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। বাংলাদেশের ইন্টারন্যাশনাল ক্রেডিট রেটিং অনেক বাড়বে। বর্তমানে অনেক বেশি সুদ দিয়ে বাণিজ্যিক ঋণ নিতে হয়, রেটিং বাড়লে সুদের হার কমে আসবে। বাংলাদেশে ব্যাপকভাবে বিনিয়োগের সুযোগও বাড়বে। আর বাড়বে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশিদের চাকরির সুযোগ।

অর্থনীবিদরা যা বলেন : সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এলডিসিতে উত্তরণের পর রপ্তানি বাণিজ্যে বিশেষ সুবিধা হারাবে বাংলাদেশ। বিশেষ করে ইউরোপীয় ইউনিয়নের জিএসপি সুবিধা থাকবে না। এতে রপ্তানিতে বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে। স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে বৈদেশিক ঋণ প্রাপ্তিতে যেসব বাড়তি সুযোগ রয়েছে সেগুলোও হারাতে হবে। ফলে, বৈদেশিক অনুদান, কম সুদের ঋণ কমে আসবে।’

সুবিধার বিষয়ে তিনি বলেন, এলডিসি থেকে উত্তরণের ফলে বিশ্বের বুকে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি অনেক বেশি উজ্জ্বল হবে। এতে বৈদেশিক ঋণ পাওয়া সুবিধাজনক হবে।

উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা ধরে রাখতে চ্যালেঞ্জ উতরে সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর তাগিদ দিয়েছেন জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসির (সিডিপি) সদস্য ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। গতকাল কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, ‘আমরা ২০২৬ সালে এলডিসি থেকে উত্তরণের একটি চূড়ান্ত সময়সীমা পেলাম। এর মধ্যে কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসির (সিডিপি) পক্ষ থেকে একটি মূল্যায়ন হবে আমরা আমাদের লক্ষ্যে সুস্থিরভাবে আছি কি না। এত দিন পর্যন্ত আমরা যেসব আলোচনা করছিলাম সেগুলোকে এখন বাস্তবায়ন করা দরকার।’

তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে এলডিসিতে উত্তরণ নিয়ে যত উচ্ছ্বাস আছে সেই পরিমাণে কার্যকর উদ্যম নেই। সরকারের পক্ষ থেকে যেসব উন্নয়নের সাফল্যের বিবরণ দেওয়া হয়, সেটার সঙ্গে আমরা যেসব সুযোগ-সুবিধা অব্যাহত রাখতে চাই তার মধ্যে এক ধরনের বৈপরীত্য আছে। যদি এতই সাফল্য থাকে, তাহলে আমরা ১২ বছরের শুল্কমুক্ত সুবিধা কেন চাইছি? এটা আমাদের উন্নয়ন সহযোগীদের কাছে মিশ্র বার্তা দিচ্ছে। আমাদের বক্তব্যগুলোকে এখন স্টিমলাইন করা দরকার। গত বাজেটে অভ্যন্তরীণ বাজারমুখী ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের উন্নয়নে কিছু পদক্ষেপের কথা বলা হয়েছিল, সেটা ইতিবাচক। কিন্তু এটাকে এখনো এলডিসি উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত করা হয়নি।’

অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেছেন, উত্তরণ-পরবর্তী সময়ে স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে পাওয়া সুযোগ-সুবিধাগুলো অব্যাহত রাখাসহ মসৃণ ও টেকসই উত্তরণ নিশ্চিত করতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নেতৃত্বে বেসরকারি খাত ও উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে নিয়ে সরকার প্রয়োজনীয় নীতিকৌশল ও পদক্ষেপ প্রণয়ন করছে।



সাতদিনের সেরা