kalerkantho

মঙ্গলবার । ১১ মাঘ ১৪২৮। ২৫ জানুয়ারি ২০২২। ২১ জমাদিউস সানি ১৪৪৩

সুন্দরবনে দস্যুতা বৃদ্ধির শঙ্কা

► দুই বছরে নিহত ১২, গ্রেপ্তার দেড় শ
► তিন বছর আগে ২০১৮ সালের ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত ৩২টি জলদস্যু বাহিনীর ৩২৮ সদস্যের আত্মসমর্পণ

এস এম আজাদ, সুন্দরবন থেকে ফিরে   

৯ নভেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



সুন্দরবনে দস্যুতা বৃদ্ধির শঙ্কা

সুন্দরবন এলাকায় গত দুই বছরে র‌্যাবের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে অন্তত ১২ জন জলদস্যু নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে দুটি বাহিনীর প্রধানও আছেন, যাঁরা সরকারের আহ্বানে সাড়া দিয়ে আত্মসমর্পণ করেছিলেন। কিন্তু পরে আবার আগের জীবনে ফিরে গেছেন। এই সময়ে সুন্দরবনে দস্যুতার অভিযোগে প্রায় দেড় শ ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছেন পুলিশ, র‌্যাব ও কোস্ট গার্ডের সদস্যরা।

বিজ্ঞাপন

তিন বছর আগে ২০১৮ সালের ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত ৩২টি জলদস্যু বাহিনীর ৩২৮ সদস্য আত্মসমর্পণ করেন। সরকার তাঁদের পুনর্বাসনের প্রতিশ্রুতি দেয়। তবে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে মামলাসহ আগের মতোই কিছু সংকটে পড়েন বলে দাবি করেন তাঁরা। এঁরা মনে করছেন, পুনর্বাসনপ্রক্রিয়া সহজ না হওয়ায় অনেকে গোপনে আগের জীবনে ফিরে গেছেন।

সুন্দরবনের সাবেক জলদস্যু, সাধারণ জেলে, মৌয়ালি, বাওয়ালিসহ কর্মজীবীরা বলছেন, আত্মসমর্পণ করেননি এমন তিনটি বাহিনীর প্রধানসহ কিছু সদস্য ভারতের সীমান্তবর্তী এলাকায় এখনো সক্রিয়। র‌্যাবের ধারাবাহিক অভিযানে ডাকাতি ও অপহরণ করতে না পেরে কিছু দস্যু এখন চোরা শিকারির কাজ করছেন। সুন্দরবনের সীমান্তে চোরাচালানি দলেও যুক্ত হয়েছেন কিছু সাবেক দস্যু। সাতক্ষীরার শ্যামনগরের গাবুরা ও কালিঞ্চীসহ সুন্দরবনের কিছু মাছ ধরার পয়েন্টে জলদস্যু বাহিনীর নামে মাছ ও জাল লুট করা হচ্ছে। শরণখোলার বনে চোরা শিকারিদের দৌরাত্ম্য বেড়েছে বলেও তাদের দাবি।

কয়েকজন সাবেক দস্যু পরিচয় না প্রকাশের অনুরোধ জানিয়ে বলেন, তাঁরা দস্যুতায় ফিরে যাওয়ার প্রস্তাব পাচ্ছেন। বিপজ্জনক জেনেও কেউ কেউ আগের জীবনে ফিরে গেছেন। তাঁরা এও জানান, এ ব্যাপারে র‌্যাবের কড়া নজরদারি আছে। কেউ হতাশায় পড়ে আগের জীবনে ফিরলে র‌্যাব তা ধরে ফেলে।

সাবেক এই দস্যুদের তথ্য মতে, সাতক্ষীরার শ্যামনগরের গাবুরা ও কালিঞ্চীর নদীতে দস্যুরা মাঝেমধ্যে লুটপাট করছে। গাবুরার জনাব বাহিনীর প্রধান জনাব ও জিয়া বাহিনীর প্রধান জিয়া আত্মসমর্পণ করেননি। তাঁরা ভারত সীমান্তে বসে এসব করছেন। তাঁদের হয়ে কাজ করছেন কিছু নতুন সদস্য। পুরনো কিছু সদস্য জনাব বাহিনীর হয়ে কাজ করছেন বলেও তথ্য পাওয়া গেছে।

রাজু বাহিনীর কিছু সদস্য আত্মসমর্পণ করলেও রাজু করেননি। তিনিও ভারতে অবস্থান করছেন। বাগেরহাটের রামপালের ফজলু বাহিনীর ফজলু কিছু অনুসারীসহ গাঢাকা দিয়েছেন। আত্মসমর্পণের পরও তিনি আবার বনে ফিরে গেছেন বলে স্থানীয়রা দাবি করছেন।

জলদস্যু দলের সাবেক সদস্যরা বলছেন, আত্মসমর্পণের পর ২০১৮ সালের ১ নভেম্বর সুন্দরবনকে জলদস্যুমুক্ত ঘোষণা করা হয়। র‌্যাবের কঠোর অবস্থানের কারণে দস্যুরা স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এলেও কেউ কেউ আবার সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করেছেন। ২০১৯ সালের ২৮ মে সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জের জোংলার খালে র‌্যাবের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে হাসান বাহিনীর প্রধান হাসানসহ চারজন নিহত হন। এ দলটি আত্মসমর্পণ না করে গোপনে সক্রিয় ছিল।

জলদস্যু আল আমিন বাহিনীর সদস্য আমিনুর দ্বিতীয় দফায় আত্মসমর্পণে অংশ নিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার প্রতিশ্রুতি দেন। তবে কিছুদিন পরই গোপনে আলাদা বাহিনী করে জলে-জঙ্গলে নেমে পড়ে। ২০১৯ সালের ১৫ অক্টোবরে খুলনার কয়রা খালে র‌্যাবের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে তিন সহযোগীসহ তিনিও নিহত হন।

গত বছরের ৩১ মার্চ চাঁদপাই রেঞ্জে র‌্যাবের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে তিন সহযোগীসহ নিহত হন ফারুক বাহিনীর প্রধান ফারুক। তিনিও আত্মসমর্পণ করেছিলেন। এরপর পালিয়ে থেকে আগের জীবনে ফিরেছিলেন তিনি।  

বাগেরহাটের রামপালের একাধিক সূত্র জানায়, কৈগড়দাসকাঠির আব্দুল হান্নান আত্মসমর্পণ করেছিলেন। তিনিও কিছুদিন এলাকায় নেই। তিনি নতুন দল করে সুন্দরবনে নামার চেষ্টা করছেন। রামপালের বাইনতলা ইউনিয়ন থেকে একটি দল নিয়মিত সুন্দরবনে চোরা শিকারে যাচ্ছে বলে জানায় এই সূত্র।

এদিকে চলতি বছরের ১৯ এপ্রিল খুলনার রূপসা এলাকা থেকে জলদস্যু ছোট রাজু বাহিনীর প্রধান রাজু মোল্লাকে বন্দুকের বাঁটসহ গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তদন্তকারীদের দাবি, আত্মসমর্পণের পর আবার জলদস্যুতা শুরু করতে দল গোছাচ্ছিলেন রাজু।

বাগেরহাটের রামপালের ঝনঝনিয়ার সাবেক দস্যু শেখ জুয়েল (২৫) বলেন, ‘আত্মসমর্পণ করে এলাকায় ফেরার পর তিনটা মামলায় স্থানীয় চেয়ারম্যান আমার নাম ঢুকিয়ে দিছে। এমন অনেকের সঙ্গে হয়। রবিউল নামের একজন আত্মসমর্পণ করেও উপায় না পেয়ে আবার বনে গেছে। পরে র‌্যাব তারে গ্রেপ্তার করছে। ’

সাতক্ষীরার শ্যামনগরের মুন্সীগঞ্জের খানজাহান আলী (৩৮) ছিলেন জলদস্যু আলআমিন বাহিনীর সদস্য। স্বাভাবিক জীবনে ফেরা এই সাবেক দস্যু বলেন, ‘অনেকে মামলার কারণে বাড়িতে থাকতে পারে না। লোকজন কটুকথা কয়। এলাকার নেতারাও ঝামেলা করে। এসব কারণেই বনে গিয়া থাকতে হইচ্ছে। সেই সমস্যার অজুহাতে কেউ কেউ আবার বনে যাচ্ছে। আমিনুর নামের একজন আত্মসমর্পণ কইরাও গেছে। শেষে র‌্যাবের সঙ্গে গোলাগুলিতে মারা গেছে। ’

সাতক্ষীরার শ্যামনগরের ডুমুরিয়া এলাকার বাসিন্দা আবুজার (৩৫) সুন্দরবনে কাঁকড়া শিকার করে জীবিকা নির্বাহ করেন। শুষ্ক মৌসুমে তিনি নৌকা চালান। আবুজার জানান, চার বছর আগে একবার জলদস্যুদের কবলে পড়েছিলেন তিনি। মালঞ্চ নদী থেকে তুলে নিয়ে পরিবারের কাছে দুই লাখ টাকা মুক্তিপণ চাওয়া হয়। সুদে এক লাখ টাকা ঋণ করে পরিবার তাঁকে ছাড়ায়। দস্যুরা আত্মসমর্পণ করলে নির্বিঘ্নে কাঁকড়া ধরতে পারছেন জানিয়ে আবুজার বলেন, ‘এখনো বনে অনেক রকম সমস্যা আছে। ডাঙায়ও আছে। তাদের (জলদস্যু) কেউ বিশ্বাস করে না। মামলা খাইয়া অনেকে পালাইয়া থাকে। তখনই এলাকার লোকজন বলে বাহিনীর কাছে চইলা গেছে। ’

র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেন, ‘সুন্দরবনে আমাদের নিয়মিত টহল আছে। সাবেক দস্যুদের ওপর কড়া নজরদারি করে তাদের পুনর্বাসন ব্যবস্থা করা হচ্ছে। কেউ বিচ্যুত হলে বা নতুন করে সক্রিয় হতে চাইলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ’ তিনি জানান, দুবলারচর ও মুন্সীগঞ্জ এলাকায় দুটি অস্থায়ী ক্যাম্পের পর দুটি স্থায়ী ক্যাম্পও পাচ্ছে র‌্যাব। এতে নজরদারি সহজ হবে।

পুলিশের খুলনা রেঞ্জের ডিআইজি ড. খন্দকার মহিদ উদ্দিন বলেন, ‘সুন্দরবনকে নিরাপদ রাখতে আমরা নজরদারি অব্যাহত রেখেছি। নিয়মিত অভিযানে গ্রেপ্তার ও মামলা হচ্ছে। ’



সাতদিনের সেরা