kalerkantho

মঙ্গলবার । ১১ মাঘ ১৪২৮। ২৫ জানুয়ারি ২০২২। ২১ জমাদিউস সানি ১৪৪৩

পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যু বাড়ছেই

সজীব আহমেদ   

৭ নভেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যু বাড়ছেই

বাংলাদেশে পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যুর হার ভয়াবহ। গত ২১ মাসে দেশে এক হাজার ৯০১ জন পানিতে ডুবে মারা গেছে, যাদের ৮৩ শতাংশই শিশু। গ্লোবাল হেলথ অ্যাডভোকেসি ইনকিউবেটরের (জিএইচএআই) সহযোগিতায় গণমাধ্যম উন্নয়ন ও যোগাযোগ বিষয়ক প্রতিষ্ঠান ‘সমষ্টি’ এই চিত্র তুলে ধরেছে। প্রতিষ্ঠানটি ২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে এ বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করেছে।

বিজ্ঞাপন

এদিকে পানিতে ডুবে মৃত্যু নিয়ে জাতীয়ভাবে সর্বশেষ জরিপটি হয়েছে ২০১৬ সালে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও ইউনিসেফের সহযোগিতায় সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন অ্যান্ড রিসার্চ বাংলাদেশের (সিআইপিআরবি) ওই জরিপের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিবছর সব বয়সী প্রায় ১৯ হাজার মানুষ পানিতে ডুবে মারা যায়। এর মধ্যে ১৪ হাজার ৫০০ জনই ১৮ বছরের কম বয়সী শিশু। অন্যভাবে বলা যায়, বাংলাদেশে গড়ে প্রতিদিন অনূর্ধ্ব ১৮ বছরের প্রায় ৪০ শিশু পানিতে ডুবে মারা যায়। পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে এই সংখ্যা প্রতিদিন প্রায় ৩০।

গত শনিবার নওগাঁ জেলার আরজিনওগাঁ মহল্লায় পুকুরে ডুবে ভাই-বোনসহ একই পরিবারের চার শিশুর মৃত্যু হয়।

পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যু রোধে সরকারি পর্যায়ে বা জাতীয়ভাবে দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ ছিল না। তবে সরকার এখন বিষয়টির ওপর গুরুত্ব দিতে শুরু করেছে। শিশুদের পানিতে ডুবে মৃত্যু রোধে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় ৩০৯ কোটি ৮৯ লাখ টাকার একটি প্রকল্প প্রস্তাব পরিকল্পনা কমিশনে জমা দিয়েছে। তিন বছর মেয়াদি এ প্রকল্পের অধীনে ১৬ জেলার ৪৫টি উপজেলায় পাঁচ বছরের কম বয়সী প্রায় দুই লাখ শিশুকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হবে। ছয় থেকে ১০ বছরের শিশুদের বিশেষ পদ্ধতিতে শেখানো হবে সাঁতার। কর্মজীবী নারীদের শিশুসন্তানের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ ও যত্নসহকারে লালন-পালনের জন্য আট হাজার ডে কেয়ার সেন্টার স্থাপন করা হবে।

সিআইপিআরবির জরিপে দেখা গেছে, দেশে পানিতে ডুবে সবচেয়ে বেশি মারা যায় দুই থেকে ৯ বছরের শিশু। বেশির ভাগ মৃত্যু হয় সকাল ৯টা থেকে দুপুর ২টার মধ্যে। এ সময়ে শিশুদের দেখভালের ব্যবস্থা রাখা হলে মৃত্যু রোধ করা সম্ভব। আবার পাঁচ বছরের বেশি বয়সী শিশুদের সাঁতারের প্রশিক্ষণ দিলে তাদেরও মৃত্যু রোধ হয়।

সিআইপিআরবির উপনির্বাহী পরিচালক ড. আমিনুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আগে দেশে পানিতে ডুবে কী পরিমাণ শিশুর মৃত্যু হতো সেটির কোনো তথ্য ছিল না। পানিতে ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধ করারও কোনো তথ্য ছিল না। তাই সরকারেও এ বিষয়ে কোনো উদ্যোগ ছিল না। এখন সরকার জানে, বছরে কতসংখ্যক শিশুর পানিতে ডুবে মৃত্যু হচ্ছে এবং এটি কিভাবে প্রতিরোধ করা সম্ভব সে বিষয়েও সরকারের ধারণা রয়েছে। তাই সরকার এই মৃত্যু রোধে বিভিন্ন প্রকল্প হাতে নিয়েছে। ’

তিনি বলেন, ‘যেসব জেলায় এই প্রকল্প বাস্তবায়ন হবে সেসব এলাকায় পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যু ৮০ শতাংশই কমে যাবে। যেসব বেসরকারি প্রতিষ্ঠান পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যু প্রতিরোধে কাজ করছে, সরকার তাদের নিয়ে সম্মিলিতভাবে কাজ করলে সারা দেশেই অতি দ্রুত পানিতে ডুবে মৃত্যুর হার কমিয়ে আনা সম্ভব হবে। ’

মহিলা ও শিশু বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ফজিলাতুন নেসা ইন্দিরা বলেন, ‘সরকার পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যুর বিষয়টি বড় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করে অধিকতর গুরুত্ব আরোপ করেছে। পাইলট ভিত্তিতে কয়েকটি জেলায় কিছু কাজ হয়েছে এবং হচ্ছে। শিশু সুরক্ষার জন্য দেশব্যাপী এসব কার্যক্রম সম্প্রসারণের লক্ষ্যে ডিপিপি (ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট প্রপোজাল) প্রণয়ন করা হয়েছে। আশা করা হচ্ছে, ডিপিপি খুব দ্রুত একনেকে অনুমোদন হবে। ’

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ‘বাংলাদেশ স্যাম্পল ভাইটাল স্ট্যাটিস্টিকস ২০২০’-এ দেশে বিভিন্ন রোগে মৃত্যুর চিত্র তুলে ধরা হয়। তাতে দেখা যায়, পাঁচ বছরের কম বয়সী ৪৪ শতাংশ শিশুর মৃত্যুর কারণ নিউমোনিয়া। এর পরই পানিতে ডুবে মৃত্যুর স্থান। এটি প্রায় ৯ শতাংশ। এরপর আছে শ্বাসতন্ত্রের জটিলতা, অপুষ্টি, নানা ধরনের জ্বর, জন্ডিস ও জটিল ডায়রিয়া। তবে বিবিএসের ভাইটাল স্ট্যাটিস্টিকসে পানিতে ডুবে ঠিক কত শিশু মারা যায়, তার সংখ্যা বলা হয়নি।

মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় এর আগে পানিতে ডুবে শিশুর মৃত্যু কমাতে দুটি প্রকল্প হাতে নেয়। জুন মাসে শেষ হওয়া একটি প্রকল্পের অধীনে দুই লাখ ৯৮ হাজার শিশুকে সাঁতার শেখানো হয়েছে। আরেকটি কর্মসূচিতে দুই লাখ শিশুকে সাঁতার শেখানো হবে। দুই প্রকল্পের জন্য বাজেট পাঁচ কোটি করে ১০ কোটি টাকা।

এ ছাড়া ২০১২ সাল থেকে ব্লুমবার্গ ফিলানথ্রপিসের আর্থিক সহায়তায় সিআইপিআরবি কাজ করছে। তাদের প্রকল্পের অধীনে সাত উপজেলার ৫১টি ইউনিয়নে ৫৫ হাজার ৭৯০টি শিশুবেষ্টনী (প্লে-পেন) এবং তিন হাজার ২০৫টি ডে কেয়ার সেন্টার (আঁচল) স্থাপন করা হয়েছে। সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত একজন আঁচল মা (প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নারী) এবং আঁচল সহকারী শিশুদের দেখভাল করেন।

সূত্র জানায়, কর্মজীবী নারীদের শিশুসন্তানদের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং যত্নসহকারে লালন-পালনের জন্য আট হাজার ডে কেয়ার সেন্টার স্থাপনের লক্ষ্যে প্রাথমিকভাবে দেশের ৪৫টি উপজেলায় চাইল্ড কেয়ার ইনস্টিটিউট করা হবে। বরিশাল বিভাগের বরগুনা, ভোলা ও পটুয়াখালী জেলায় ইনস্টিটিউট হবে ১০টি। চট্টগ্রাম বিভাগের ব্রাহ্মণবাড়িয়া, চাঁদপুর ও লক্ষ্মীপুরে হবে ৯টি। ঢাকা বিভাগের নরসিংদীর মনোহরদীতে হবে একটি। খুলনা বিভাগের বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা জেলায় হবে পাঁচটি। ময়মনসিংহ বিভাগের ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা ও শেরপুর জেলায় হবে ৯টি। রাজশাহী বিভাগের সিরাজগঞ্জ জেলায় হবে তিনটি। রংপুর বিভাগের নীলফামারীতে হবে তিনটি। এ ছাড়া সিলেট বিভাগের হবিগঞ্জ ও সুনামগঞ্জ জেলায় হবে সাতটি ইনস্টিটিউট।

সমষ্টির গবেষণায় গত ২১ মাসে এক হাজার ২১৮টি ঘটনার কথা প্রকাশিত হয়েছে। এসব ঘটনায় সারা দেশে এক হাজার ৫৭০ শিশুসহ মোট এক হাজার ৯০১ জন ব্যক্তি পানিতে ডুবে মারা যায়। পানিতে ডুবে সবচেয়ে বেশি মৃত্যুর ঘটনা ঘটে চট্টগ্রাম বিভাগে, ৪০৯ জন। এ ছাড়া ঢাকা বিভাগে ৪০৮ জন, রাজশাহীতে ২৩৮, রংপুরে ২৩৩, ময়মনসিংহে ২১১, বরিশালে ১৬১ ও খুলনা বিভাগে ১৩৭ জন মারা যায়। এ সময়ে সবচেয়ে কম মৃত্যু ছিল সিলেট বিভাগে, ১০৪ জন। জেলাগুলোর মধ্যে গত ২১ মাসে সবচেয়ে বেশি মানুষ পানিতে ডুবে মারা যায় নেত্রকোনা জেলায়, ৮৬ জন। পরবর্তী স্থানগুলোর মধ্যে রয়েছে নোয়াখালীতে ৭২ জন, কুড়িগ্রামে ৬৮, ঢাকায় ৫৪, দিনাজপুরে ৪৬ এবং গাজীপুর জেলায় ৪১ জন।

পানিতে ডুবে মৃতদের ৮৩ শতাংশই শিশু। চার বছর বা কম বয়সী ৭২০ জন, পাঁচ থেকে ৯ বছর বয়সী ৫৮৮ জন, ৯ থেকে ১৪ বছরের ২০২ জন এবং ১৫ থেকে ১৮ বছরের ৬০ জন। ৩৩১ জনের বয়স ১৮ বছরের বেশি।

সম্প্রতি ‘বাংলাদেশ অ্যাজ আ গ্লোবাল লিডার ইন ড্রাউনিং প্রিভেনশন’ শীর্ষক ওয়েবিনারে পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান বলেন, ‘সরকার এরই মধ্যে পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যুর বিষয়টি একটি বড় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এ বিষয়ে অধিকতর গুরুত্বারোপও করা হচ্ছে। শিশু সুরক্ষার জন্য দেশব্যাপী এসব কার্যক্রম সম্প্রসারণের জন্য মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় এরই মধ্যে একটি ডিপিপি (ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট প্রপোজাল) প্রণয়ন করেছে। ডিপিপিটি যাতে একনেকে দ্রুত অনুমোদিত হয়, আমার পক্ষ থেকে সে প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে। ’



সাতদিনের সেরা