kalerkantho

শনিবার । ১৫ মাঘ ১৪২৮। ২৯ জানুয়ারি ২০২২। ২৫ জমাদিউস সানি ১৪৪৩

দেশে ‘নতুন দরিদ্র’ তিন কোটি ২৪ লাখ মানুষ

নিজস্ব প্রতিবেদক   

৫ নভেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



দেশে ‘নতুন দরিদ্র’ তিন কোটি ২৪ লাখ মানুষ

দেশে গত বছর মার্চে করোনাভাইরাস সংক্রমণ শুরুর পর চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত ১৮ মাসে নতুন করে তিন কোটি ২৪ লাখ মানুষ দরিদ্র হয়েছে। মার্চে এই সংখ্যা ছিল দুই কোটি ৪৫ লাখ। গতকাল বৃহস্পতিবার এক ওয়েবিনারে ‘জীবিকা, খাপ খাইয়ে নেওয়া ও উত্তরণে কভিড-১৯-এর প্রভাব’ শীর্ষক ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (বিআইজিডি) এবং পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) জরিপের চতুর্থ ধাপের এই গবেষণা তথ্য তুলে ধরেন পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান।

গবেষণায় উঠে আসে, চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত নতুন করে দরিদ্রের সংখ্যা বেড়েছে ১৯.৫৪ শতাংশ।

বিজ্ঞাপন

এই হার চলতি বছরের মার্চে ছিল ১৪.৭৫ শতাংশ। অর্থাৎ পাঁচ মাসে দরিদ্রের হার বেড়েছে ৫ শতাংশ। গত বছর জুনে দরিদ্রের এই হার ছিল ২১.২৪ শতাংশ। ওয়েবিনারে আরো অংশ নেন বিআইজিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ইমরান মতিন।

গত আগস্টে শহরের বস্তি ও গ্রামের চার হাজার ৮৭২ পরিবারের মধ্যে জরিপটি চালানো হয়। তাতে দেখা যায়, লকডাউনের পর মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাপনে ফেরার হার বাধাগ্রস্ত হয়েছে। এর আগের জরিপগুলো গত বছরের এপ্রিল, জুন এবং চলতি বছরের মার্চে পরিচালিত হয়েছিল।

চতুর্থ জরিপে দেখা যাচ্ছে, গত মার্চের তুলনায় গত আগস্টে শহরের বস্তিবাসীর আয় কমেছে ১৮ শতাংশ আর গ্রামের মানুষের আয় কমেছে ১৫ শতাংশ। স্বল্পশিক্ষিত ও দরিদ্রদের দুই-তৃতীয়াংশ জানিয়েছে, তারা প্রত্যাশিত কাজ পায়নি। প্রথমবার লকডাউনে ৪৫ শতাংশ পরিবার সামান্য পরিমাণ ত্রাণ সহায়তা পেলেও দ্বিতীয়বার লকডাউনে এই সহায়তা নেমে এসেছে ২৩ শতাংশে।

করোনা মহামারির কারণে অনেকে চাকরি হারিয়েছেন। ফলে ওই ১৮ মাসে আয়ের অনিশ্চয়তা নিয়ে মানুষের জীবনযাপনের ঝুঁকি বেড়েছে। অনেকে পেশা পরিবর্তন করে বিকল্প আয়ের চেষ্টা করেছেন। দক্ষতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়, এমন পেশায়ও যুক্ত হয়েছেন অনেকে।

জরিপে আরো উঠে আসে, ১৭ শতাংশ দক্ষ ইলেকট্রিশিয়ান দিনমজুরের মতো অদক্ষ কর্মীর কাজ করছেন। মহামারিতে বেড়েছে পরিবারগুলোর ঋণের পরিমাণ। মহামারির আগে গত বছর ফেব্রুয়ারি মাসে এই পরিবারগুলোর ঋণের পরিমাণ ছিল বার্ষিক আয়ের ১৩ শতাংশ। চলতি বছর আগস্টে এই হার বেড়ে দাঁড়ায় ২৮ শতাংশে।

করোনা পরিস্থিতি মোকাবেলায় এই মানুষেরা মাছ, মাংস, দুধ, ফল ইত্যাদি পুষ্টিকর খাবার খাওয়া কমিয়েছে। ব্যয় নির্বাহ করতে গিয়ে হিমশিম খাওয়া অনেকে শহর ছেড়ে গ্রামে কিংবা তুলনামূলক কম খরচ হয়—এমন শহরতলিতে চলে গেছে। এদের মধ্যে ১০ শতাংশ বস্তিবাসী এখনো ফিরে আসেনি।

গবেষণা তথ্যে আরো বলা হয়েছে, এসব ‘নতুন দরিদ্র’ পরিবার দীর্ঘমেয়াদি দারিদ্র্যে পড়তে পারে। দারিদ্র্যসীমার ওপরে অবস্থান করা ২৯ শতাংশ পরিবার মহামারি শুরুর পর দরিদ্র হয়ে পড়েছে। সেই থেকে এখনো তারা নিজেদের অবস্থান উন্নত করতে পারেনি। দীর্ঘমেয়াদি দারিদ্র্যের কারণে পরিবারগুলোর স্বাভাবিক জীবিকা ব্যাহত হওয়ায় দারিদ্র্যের দুষ্টচক্রে আটকা পড়তে পারে তারা।

চাকরি হারানো বস্তিবাসী আশপাশের প্রতিবেশীর কাছ থেকে বিভিন্ন সময় ঋণ করেছে। এই ঋণ পরিশোধ করা অনেকটাই অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। গবেষণায় এই চিত্র তুলে ধরার সঙ্গে এ-ও বলা হয়েছে, মুদ্রাস্ফীতি বাড়ার পাশাপাশি খাবারের দাম বাড়ায় ক্ষতির মধ্যে পড়বে এই জনগোষ্ঠী। স্বাস্থ্যঝুঁকি, পর্যাপ্ত পড়ালেখার সুবিধা থেকে বঞ্চিত হওয়া এবং বাল্যবিবাহের মতো সমস্যার মুখে পড়বে তারা।

ড. হোসেন জিল্লুর রহমান তাঁর বক্তব্যে বলেন, ‘আবারও করোনার নতুন ঢেউ আসার আশঙ্কা করা  হচ্ছে। এ অবস্থায় স্বাস্থ্যসেবা, প্রশাসনিক এবং অর্থনৈতিক নীতিমালার সমন্বয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে ক্ষতি কমিয়ে আনা কষ্টকর হবে। এটা মনে রাখা প্রয়োজন, কোনো ধরনের নীতি তৈরি না করে সমাজের সুবিধাবঞ্চিত মানুষদের সঠিকভাবে সাহায্য করা যাবে না। শহরে বড় আকারের সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী, সিএসএমই পুনরুদ্ধারে বাজেটসমৃদ্ধ পরিকল্পনাকে গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, যাতায়াত, দৈনন্দিন ব্যয় বৃদ্ধি ইত্যাদি মাথায় রেখে সামষ্টিক নীতিমালা প্রণয়নে নজর দিতে হবে। ’

ড. ইমরান মতিন বলেন, ‘নতুন দরিদ্ররা যদি কোনো ধরনের চাকরি না পায় তবে সামনের দিনগুলোয় তারা সমস্যায় পড়বে। এই পরিস্থিতিতে নতুন দরিদ্ররাই দীর্ঘমেয়াদি দারিদ্র্যের মধ্যে পড়ার ঝুঁকি সর্বাধিক। ফলে এ পরিস্থিতি থেকে তাদের পুনরুদ্ধারে আমাদের পিছিয়ে পড়লে চলবে না। এখনই সেদিকে নজর দিতে হবে। ’ তবে করোনায় দেশে নতুন করে মানুষ দরিদ্র হয়েছে, এমন তথ্য মানছেন না অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। চলতি বছরের ৯ জুন সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠক শেষে সংবাদ সম্মেলনে তিনি বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের তথ্য নাকচ করে দেন। সরকারি প্রতিষ্ঠানের তথ্যের ওপর নির্ভরতা রাখবেন জানিয়ে তিনি বলেছিলেন, ‘আমাদের নিজস্ব প্রতিষ্ঠান আছে। এই প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে তথ্য না পাওয়া পর্যন্ত অন্য কারো তথ্য আমি গ্রহণ করতে পারি না। ’



সাতদিনের সেরা