kalerkantho

শুক্রবার । ৭ মাঘ ১৪২৮। ২১ জানুয়ারি ২০২২। ১৭ জমাদিউস সানি ১৪৪৩

দস্যুজাল ছিঁড়ে মামলার জালে

এস এম আজাদ, রামপাল (বাগেরহাট) থেকে   

২ নভেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



দস্যুজাল ছিঁড়ে মামলার জালে

আসাদুজ্জামান খান কামাল

নদীর নাম ঘষিয়াখালী। বাগেরহাট জেলা শহর থেকে মোংলা বন্দরকে সংযুক্ত করেছে এই ছোট্ট নদী। স্থানীয় লোকজন এই নদীকে মোংলা চ্যানেল বলেও ডাকে। রামপাল উপজেলা সদরের পাশে এই নৌপথে ছোট-বড় পণ্যবোঝাই নৌযানের চলাচল।

বিজ্ঞাপন

এরই মধ্যে গতকাল সোমবার দেখা গেছে এক ভিন্ন চিত্র। তৈরি করা অস্থায়ী ঘাটে বাঁধা সারিবদ্ধ ইঞ্জিনচালিত নৌকার সামনে দাঁড়িয়ে আটজন। দুপুরের তপ্ত রোদেও তাঁদের চোখে-মুখে নেই কষ্টের ছায়া। উল্টো হাসির ঝিলিকের আভাস দিচ্ছে শান্তির রেখা।

তাঁদের একজন আলম হোসেন সানা (৪২)। কেমন আছেন প্রশ্ন করতেই হাসিমুখে উত্তর, ‘অনেক ভালো, যেটা কোনো দিন চিন্তাও করি নাই। এখন কাঁকড়া বিক্রি করে খাই। স্যারদের বলছিলাম, একটা নৌকা হইলে যখন কাঁকড়ার মৌসুম থাকে না, তখন কিছু করে খাইতে পারব। আজকে নৌকা দিছে। ওইটা নিতে আসছি। এখন আরো ভালোভাবে সংসারটা চালাইতে পারব। ’

সানা জানালেন, সাতক্ষীরার শ্যামনগরের দক্ষিণখালী এলাকায় তাঁর বাড়ি। সুন্দরবনের একসময়ের কুখ্যাত জলদস্যু বাহিনী তৈয়বুরের দলের সদস্য ছিলেন তিনি। তিন বছর আগে র‌্যাবের কাছে আত্মসমর্পণ করে স্বাভাবিক জীবনযাপনের সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন। তিন মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন। একমাত্র ছেলে স্কুলে পড়ে, চতুর্থ শ্রেণিতে।

এখন কোনো সমস্যা আছে কি না জানতে চাইলে সানা বলেন, ‘আমাগো মামলায় খাইছে। এলাকার লোকজন শত্রুতা কইরা মামলা দেয়। ওই মামলায় পালাইয়া থাকতে গিয়া জলদস্যু দলে যোগ দিলাম। ওই পথ ছাইড়া ভালো হইলেও মামলা আমারে ছাড়ে নাই। এখনো চারটা মামলায় হাজিরা দিতে হয়। এক দিন আগে বাগেরহাট আসতে হয়। প্রতিদিন এক হাজার টাকা লাগে। এই টাকা কই পাই বলেন?’

গতকাল সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত ঘোষণার তিন বছর উপলক্ষে রামপালে নদীর তীরে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসা ব্যক্তিদের পুনর্বাসন সহায়তার বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।

সেখানেই কথা হয় সানার মতো আরো কয়েকজন ব্যক্তির সঙ্গে। তাঁরা কেউ পেয়েছেন ঘর। কেউ পেয়েছেন মুদি দোকান। কেউ পেয়েছেন মাছ ধরার নৌকা। কারো হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে বাছুরসহ গাভি। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এসব সহায়তা তুলে দেন।

অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি শামসুল হক টুকু, সদস্য পীর ফজলুর রহমান, খুলনার সিটি মেয়র তালুকদার আব্দুল খালেক, খুলনা-২ আসনের সংসদ সদস্য শেখ সালাউদ্দিন জুয়েল, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মোস্তফা কামাল উদ্দীন, পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ড. বেনজীর আহমেদ, রাবের মহাপরিচালক (ডিজি) চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন, খুলনার বিভাগীয় কমিশনার ইসমাইল হোসেন, খুলনা রেঞ্জের ডিআইজি ড. খন্দকার মহিদ উদ্দিন, ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টারের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জিয়াউল আহসান উপস্থিত ছিলেন।

আত্মসমর্পণের তিন বছর পর খোঁজখবর নিয়ে এই পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করায় সন্তুষ্টি প্রকাশ করেন সাবেক জলদস্যুরা। তবে সবার কথাতেই ছিল মামলা নিয়ে উৎকণ্ঠা। আত্মসমর্পণের সময় হত্যা ও ধর্ষণ বাদে অন্য মামলাগুলো প্রত্যাহার করে নেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হলেও তিন বছরে তা বাস্তবায়ন হয়নি। আবার জলদস্যুতা ছেড়ে নতুন করে জীবন চালাতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন তাঁরা। কয়েকজন বলেছেন, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও এলাকাবাসীর কাছ থেকে তারা এখনো সহযোগিতা পাচ্ছেন না। আয়-উপার্জন নিয়ে আছে সংকট। অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা আশ্বস্ত করে বলছেন, আত্মসমর্পণকারীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাগুলো প্রত্যাহার করে নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। যাঁরা ভালো পথে থাকবেন নজরদারির মাধ্যমে ভবিষ্যতে তাঁদের পুনর্বাসনে আরো সহায়তা দেওয়া হবে।

গতকাল পর্যন্ত ১০২ জনকে ঘর, ৯০ জনকে মুদি দোকান, ১২ জনকে মাছ ধরার সাধারণ নৌকা এবং আটজনকে ইঞ্জিনচালিত নৌকা দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ২২৮টি গবাদি পশু দেওয়া হয়েছে।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেন, ‘ডাকাতদের কারণে একসময় সুন্দরবনের কয়েক লাখ মানুষের জনজীবন বিপন্ন হয়ে পড়েছিল। ডাকাতদেরও কিছু মহল থেকে বাধ্য করা হয় এ কাজ করতে। আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে এর একটি সুন্দর সমাধান হয়েছে। এর স্থায়ী সমাধানের জন্য আমরা র‌্যাবের একটি স্থায়ী ক্যাম্প করার চেষ্টা করছি। কোস্ট গার্ডকেও শক্তিশালী করা হচ্ছে। কোথাও কোনোভাবে ডাকাতি-দস্যুতা করতে দেওয়া হবে না। ’

মন্ত্রী স্বাভাবিক জীবনে ফেরা ব্যক্তিদের উদ্দেশে বলেন, ‘আমাদের ওয়াদা অনুযায়ী আপনাদের সব মামলা প্রত্যাহার করা হবে। এ বিষয়ে আমরা কাজ করছি। ধর্ষণ-হত্যা এই দুই ধরনের মামলা ছাড়া কোনো মামলা আশা করি থাকবে না। আমরা জেনেছি, আপনারা যে অনুদান পান সেটি আপনাদের মামলায় উকিলদের  ফি দিতেই শেষ হয়ে যায়। সতর্ক করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আপনাদের মধ্যে কেউ কেউ নাকি অন্যদিকে যাওয়ার চিন্তা-ভাবনা করছেন? এটা করবেন না। এমন চিন্তা করলে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মুখোমুখি হতে হবে। এখন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সদস্যরা অনেক দক্ষ, যুগোপযোগী। ’

আইজিপি ড. বেনজীর আহমেদ বলেন, ‘আত্মসমর্পণকারী জলদস্যুদের মধ্যে যাঁরা খুন ও ধর্ষণ মামলার আসামি, তাঁদের ব্যাপারে আমাদের কিছু করার নেই। বাকিদের মামলা নিষ্পত্তিতে আমরা আইনানুগ সহায়তা করব। যাঁরা খারাপ পথ থেকে ফিরে এসেছেন, আমরা আপনাদের পাশে আছি। এলাকাবাসীর প্রতি অনুরোধ, তাঁদের স্বাভাবিক জীবনযাপনে সহায়তা করুন। ’ আইজিপি বলেন, সুন্দরবনের নিরাপত্তায় দুটি ক্যাম্প রয়েছে। আরো ক্যাম্প দরকার।

অন্য বক্তারা জানান, ২০১৮ সালের ১ নভেম্বর পর্যন্ত আত্মসমর্পণ করা ৩২টি জলদস্যু বাহিনীর ৩২৮ জন ব্যক্তির ওপর নজরদারি করা হয়েছে। তাঁদের জীবনের বিভিন্ন সংকটের ব্যাপারে কথা বলে তাঁদের চাহিদা অনুযায়ী পুনর্বাসনসহ তার ব্যবস্থা করা হয়েছে।

২৮ বছরের খানজাহান আলীর বাড়ি শমনগরের মুন্সীগঞ্জ এলাকায়। তিনি যুক্ত ছিলেন জলদস্যু আলামিন বাহিনীর সঙ্গে। তিন মেয়ে ও স্ত্রীকে নিয়ে এখন শ্রমজীবীর কাজ করে সংসার চালান তিনি। খানজাহান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আত্মসমর্পণের পর অনেক কষ্টে পড়ে গেছি। প্রথমে কেউ কোনো ধরনের সহযোগিতা করেনি। মামলা তো চলছেই। সমস্যায় পড়ে কেউ কেউ আবার বনে জলদস্যু দলে গেছে বলেও শুনেছি। তবে অনেক কষ্ট করে টিকে আছি। স্যাররা এখন একটা নৌকা দিয়েছে, সেটা দিয়ে কোনো মতে সংসার চালানোর চেষ্টা করব। ’

শেখ জুয়েল (২৫) বলেন, ‘আমি আগে মাছ ধরতাম। জলদস্যু বাহিনীদের টাকা দিতে না পারায় ওরা নিয়ে যায়। এক পর্যায়ে ওদের ওখানেই থেকে যাই। সাত্তার বাহিনীতে যোগ দিই। সেই জীবন থেকে বের হয়ে খুব ভালো আছি সেটা বলব না, তবে ভালো আছি আগের চেয়ে। ভালো হয়ে আসার পরও তিনটি মামলায় নাম ঢুকিয়ে দিয়েছে। এসব মামলা নিয়া খুব সমস্যায় আছি। ’

গরুসহ বাছুর পেয়েছেন জলদস্যু মঞ্জু বাহিনীর সাবেক সদস্য হানিফ শেখ (২৭)। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আত্মসমর্পণ করার পরও রামপাল থানার ইউনিয়নের নিজের বাড়িতে ফিরতে পারিনি আমরা পাঁচজন। ছয় মাস পর প্রশাসন এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সহায়তায় এলাকায় গেছি। তবে মামলা এখনো চলতেছে। ’

অনুষ্ঠানে মাস্টার বাহিনীর সাবেক সেকেন্ড ইন কমান্ড সোহাগ পাটোয়ারী বলেন, ‘আমরা এখন ভালো আছি। কাজ করে ব্যবসা করে জীবনযাপনের চেষ্টা করছি। তবে মামলাগুলো নিষ্পত্তি না হওয়ায় অনেক সমস্যায় আছি। ’

র‌্যাবের ডিজি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘মামলা প্রত্যাহারসহ আপনাদের সব ধরনের সহযোগিতা অব্যাহত রাখতে আমরা কাজ করছি। কেউ যদি ভালোর পথ ছেড়ে অন্য পথে যান, তবে সাহায্যের সেই হাত সংকুচিত করে কঠোর ব্যবস্থার হাত প্রসারিত করা হবে। ’

 

 



সাতদিনের সেরা