kalerkantho

মঙ্গলবার । ১১ মাঘ ১৪২৮। ২৫ জানুয়ারি ২০২২। ২১ জমাদিউস সানি ১৪৪৩

স্বেচ্ছায় রক্তদান ও মরণোত্তর চক্ষুদান দিবস আজ

মানবতার মানব

জহিরুল ইসলাম   

২ নভেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



মানবতার মানব

আসিফ আহমেদ। তিনি নিজেকে সঁপে দিয়েছেন মানবসেবায়

আসিফ আহমেদ জন্মগতভাবে শারীরিক প্রতিবন্ধী। পুরো শরীরেই প্রতিবন্ধকতার ছাপ। দুই হাতের আঙুলগুলো অনেকখানি বাঁকা, যা দিয়ে ঠিকমতো লিখতে পারেন না তিনি। কষ্ট করে হাঁটেন।

বিজ্ঞাপন

তবে প্রতিবন্ধকতা আসিফের জীবনে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। মনের জোরে তিনি নিজেকে সঁপে দিয়েছেন মানবসেবার মহৎ কাজে। জড়িত রয়েছেন রক্তদাতা গ্রুপ ও মরণোত্তর চক্ষুদান কার্যক্রমে। এ ছাড়া কাজ করছেন বেশ কয়েকটি সামাজিক সংগঠনের সঙ্গে। ময়মনসিংহের একটি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে অধ্যয়নরত তিনি।

ময়মনসিংহ সদরের চরকালিবাড়ীতে জন্ম নেওয়া আসিফ দুই ভাই ও এক বোনের মধ্যে মেজো। বাবা মো. নুরুল ইসলাম দরিদ্র কৃষক, মা আকলিমা বেগম গৃহিণী। আসিফের প্রথম রক্ত দেওয়া ২০১৯ সালে। এরও দুই বছর আগে থেকে রক্ত সংগ্রহে অনলাইনে সক্রিয় হন তিনি। প্রথমবার রক্ত দেওয়া ছিল তাঁর জন্য চ্যালেঞ্জের।

আসিফ বলেন, ‘ময়মনসিংহের এক মেডিক্যালে হঠাৎ জরুরি রক্তের প্রয়োজন পড়ে। রক্তের গ্রুপ বি-পজিটিভ। রোগী চার মাস বয়সী এক শিশু। কথাটা শুনেই রক্ত দিতে আগ্রহ জানাই। কিন্তু চিকিৎসক কিছুতেই নিতে রাজি হচ্ছিলেন না। কারণ আমি শারীরিক প্রতিবন্ধী। চিকিৎসকের বাধার পরও রক্ত দিতে গোঁ ধরে বসলাম। শেষ পর্যন্ত রক্তও নেন। সেদিন আমার জীবনের সেরা দিন মনে হয়েছে। ’

মানবসেবায় এমন নিবেদিত হওয়ার পেছনের উৎসাহ কী? এ প্রশ্নের জবাবে আসিফ বলেন, ‘ছেলেবেলা থেকেই মায়ের কাছে শুনে আসছি আমার খালা রক্তের অভাবে মারা গেছেন। তখন থেকেই কেউ যাতে রক্তের জন্য মারা না যায় সে রকম কিছু করার ইচ্ছা ছিল। পরে ২০১৭ সালে কয়েকটি ফেসবুক গ্রুপে যুক্ত হয়ে কাজ শুরু করি। এরপর রক্তদাতা খুঁজে দেওয়া, মরণোত্তর চক্ষুদানে মানুষকে উৎসাহিত করার পাশাপাশি যেখানেই সুযোগ হয়েছে এগিয়ে গেছি। ’

কাজের অভিজ্ঞতার বিষয়ে বলতে গিয়ে এই উদ্যমী তরুণ বলেন, ‘রক্তদান ও মরণোত্তর চক্ষুদানে আমরা মানুষকে আগ্রহী করে তুলতে কাজ করছি। নিজেও মরণোত্তর চক্ষুদান করতে চুক্তিপত্রে সই করেছি। আমি চাই সব প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত মানবতার সেবায় কাজ করে যেতে। ’

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেকে অহেতুক সময় নষ্ট করলেও আসিফ এ ক্ষেত্রে আলাদা, সকাল কিংবা রাত একটু পর পর নোটিফেকশন চেক করাই যেন তাঁর প্রধান কাজ। ‘রক্তদানের অপেক্ষায় বাংলাদেশ’ নামে একটি ফেসবুক গ্রুপের মাধ্যমে রক্তদানে ইচ্ছুক ব্যক্তিকে রোগী খুঁজে দেওয়া এবং রক্তের প্রয়োজনে রোগীকে রক্তদাতার সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দেওয়ায় নিজেকে নিয়োজিত রাখেন সর্বদা।

আসিফের ফেসবুক ওয়াল ঘুরে দেখা যায়, রক্তদাতা প্রস্তুত, জরুরি রক্তের দরকার, মরণোত্তর চক্ষুদানের আহ্বানসহ বিভিন্ন ধরনের পোস্ট। এ ছাড়া করোনা সচেতনতায় স্বাস্থ্যবিধি মানা, ডেঙ্গুর প্রকোপ যাতে না বাড়ে সে জন্য বাড়ির আঙিনা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার বিষয়ের পোস্টও ঠাঁই পেয়েছে তাঁর টাইমলাইনে।

জানা যায়, প্রতিদিন শতাধিক রোগীর রক্তের ব্যবস্থায় অবদান রাখছেন আসিফ। এর মধ্যে তাঁর ব্যক্তিগত মোবাইল ফোনে আসা কলের মাধ্যমে ১৫ থেকে ২০ জন রোগীর রক্তের ব্যবস্থা। ‘রক্তদানের অপেক্ষায় বাংলাদেশ’ গ্রুপের কল সেন্টারের মাধ্যমে ৯ থেকে ১০ জন, ‘দেশের জন্য আমি প্রস্তুত’ এই নামে আরেকটি দলের মাধ্যমে প্রতিদিন ৪০ থেকে ৫০ জন রোগীর রক্তের ব্যবস্থা করার সঙ্গে জড়িত আসিফ।

রাজধানীর ধানমণ্ডি এলাকায় থাকেন তন্নী নামের এক থ্যালাসেমিয়া রোগী। তন্নীর জন্য প্রতি মাসেই রক্তের ব্যবস্থা করে দেন আসিফ আহমেদ। তন্নী বলেন, “প্রতি মাসেই আমার রক্ত লাগছে। শুরুর দিকে রক্ত নিয়ে খুব চিন্তিত ছিলাম। রক্ত ঠিকমতো পাওয়া যাচ্ছিল না। পরে অনলাইনে আসিফ ভাইয়ের ‘রক্তদাতা রোগী খুঁজছে’ এমন একটি পোস্ট দেখে যোগাযোগ করি। এর পর থেকেই আসিফ ভাই ‘রক্তদানের অপেক্ষায় বাংলাদেশ’ গ্রুপের মাধ্যমে নিয়মিত রক্ত ব্যবস্থা করে দিচ্ছেন। ”

 

 



সাতদিনের সেরা