kalerkantho

বুধবার । ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৮। ৮ ডিসেম্বর ২০২১। ৩ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৩

চার কোটি টাকা জলে!

মৌলভীবাজার বাস টার্মিনাল প্রায় এক যুগ ধরে পরিত্যক্ত

মৌলভীবাজার সংবাদদাতা   

২৮ অক্টোবর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



চার কোটি টাকা জলে!

টার্মিনালের পরিত্যক্ত ভবন। ছবি : কালের কণ্ঠ

মৌলভীবাজার জেলা শহরের যানজট নিরসনে প্রায় এক যুগ আগে শহরের বাইরে চার কোটি টাকা খরচ করে বাস টার্মিনাল নির্মাণ করা হয়। উদ্বোধনের এক বছর পর পরিবহন মালিকদের বুঝিয়ে-শুনিয়ে চালুও করা হয়। কিন্তু তাঁদের অনীহার কারণে প্রায় এক যুগ ধরে টার্মিনালটি পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে।

শহর থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার দূরে ঢাকা-সিলেট আঞ্চলিক মহাসড়কের পাশে পৌরসভার উত্তর-পশ্চিম প্রান্তে যুগিডর এলাকায় এই টার্মিনাল। প্রায় তিন একর জায়গা নিয়ে নগর পরিচালনা ও উন্নীতকরণ অবকাঠামো প্রকল্প এবং পৌরসভার যৌথ অর্থায়নে এই বাস টার্মিনাল তৈরি করা হয়।

এতে জমি কেনা, ভবন নির্মাণ ও অন্যান্য খাতে খরচ হয় তিন কোটি ৯৮ লাখ ৭৫ হাজার ৫১৯ টাকা। কাজ শেষ হওয়ার পর ২০০৯ সালের আগস্ট মাসে মৌলভীবাজার পৌরসভার মেয়র ফয়জুল করিম ময়ূন বাস টার্মিনালের উদ্বোধন করেন। কিন্তু তখন পরিবহন মালিকদের অনীহাসহ নানা কারণে টার্মিনালটি চালু করা যায়নি।

পরে জেলা প্রশাসন পরিবহন মালিকদের সঙ্গে বৈঠক করে ২০১০ সালের ১ নভেম্বর থেকে টার্মিনালটি চালুর উদ্যোগ নেয়। চালুর পর ঢাকা-মৌলভীবাজার, সিলেট-হবিগঞ্জ, কুমিল্লাসহ আন্ত জেলার বিভিন্ন বাস এখান থেকে চলাচল করত। বিভিন্ন গ্রামীণ সড়কে চলাচলকারী কিছু অটোরিকশাও টার্মিনাল থেকে আসা-যাওয়া করে। কিন্তু কিছুদিন যাওয়ার পরই বিভিন্ন পরিবহন প্রতিষ্ঠানের বাস আবার শহরের ভেতর থেকে চলাচল শুরু করে।

সম্প্রতি টার্মিনালে গিয়ে দেখা গেছে, একটি যানবাহনও নেই। মানুষের আনাগোনাও কম। টার্মিনাল ভবনটি অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে আছে। ভবনের মেঝেতে গোবর ও আবর্জনা ছড়ানো। টাইলস ভেঙে গেছে। দেয়ালের বিভিন্ন অংশে ফাটল। কক্ষগুলোর কাচের দরজা খোলা। ভেতরটা ময়লা-আবর্জনায় একাকার। বিভিন্ন পরিবহন সংস্থার নামে বরাদ্দ করা কাউন্টারে ধুলা জমেছে। টার্মিনালের পূর্ব দিকে আবর্জনার স্তূপ। আশপাশে চরছিল গরু, মহিষ ও ছাগল। ভবনের বাইরে ও ভেতরে রড, সিমেন্ট ও বালু রাখা।

টার্মিনালের প্রবেশমুখে মিজানুর রহমান ও পশ্চিম পাশে জুনেল আহমদের চায়ের দোকান। দুজই জানান, শুধু হবিগঞ্জ-সিলেট রুটের বাস রাস্তার পাশে থেমে যাত্রী ওঠানামা করায়। বাসগুলো টার্মিনালের ভেতর ঢোকে না। অন্য কোনো বাস থামে না। রাতে হানিফ, শ্যামলী, তাজ পরিবহন ও কুমিল্লার দু-চারটি বাস এখানে রাখা হয়। ভোরে চলে যায়। একজন নৈশ প্রহরী আছেন। আগে রাতে টার্মিনালে বাতি জ্বালানো হতো; কিন্তু এখন আর হয় না।

বাস টার্মিনালের ভেতরে থাকা মসজিদের ইমাম মাওলানা আব্দুল হান্নান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি বাস টার্মিনাল উদ্বোধনের পর থেকে মসজিদে আছি। কয়েক বছর ধরেই বিদ্যুৎ নেই, পানি নেই। মুসল্লিদের অজুর পানির খুব সংকট। বালতিতে করে আনতে হয়।’

টার্মিনালের বর্তমান ইজারাদার মোমিত মিয়া। তিনি একজন ঠিকাদার। ইজারার ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, সিলেট-হবিগঞ্জ পথে ৬৫টি বাস চলে। বাসগুলো টার্মিনালের সামনে যাত্রী ওঠানামা করায়। সে জন্য তিনি টাকা পান। তবে পৌরসভার কাছ থেকে টার্মিনালটি কত টাকায় ইজারা নিয়েছেন তিনি, সেটা বলতে চাননি। পৌরসভার কাছ থেকেও এই ব্যাপারে কিছু জানা যায়নি।

মৌলভীবাজার মিনিবাস শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক মো. শামীম আহমদ বলেন, টার্মিনালটি চালুর ব্যাপারে সাবেক মেয়র উদ্যোগ নেওয়ায় সবার আগ্রহ ছিল। কিন্তু বাসসংশ্লিষ্ট কয়েকজন নেতার আগ্রহ না থাকায় দীর্ঘদিন পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। কাউন্টারভিত্তিক পরিবহন মালিকদের অনীহা আছে। তিনি আরো বলেন, ‘শুনছি কিছু লোক চায় টার্মিনালটির মধ্যে গরুর বাজার চালু করতে।’

শহরের মোস্তফাপুর এলাকায় রয়েছে ঢাকা বাস টার্মিনাল। অন্যদিকে কুসুমবাগ এলাকায় বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় চলাচল করা বাস-মিনিবাসের এক ধরনের স্ট্যান্ড গড়ে উঠেছে।

মৌলভীবাজার শহরের বাসিন্দা খুরশেদ আলম কালের কণ্ঠকে বলেন, শহরের বাইরের টার্মিনাল চালু হলে শহরে যানজট থাকত না। এটা চালু না করায় শহরের কুসুমবাগ পয়েন্টে এখন যানজট বেশি।

মৌলভীবাজার জেলা প্রশাসক মীর নাহিদ আহসান বলেন, ‘টার্মিনালটি অকার্যকর হয়ে আছে। কিছু লোকজন আগ্রহ দেখাচ্ছে না বলে টার্মিনালটির এই অবস্থা।’

জানতে চাইলে নতুন করে টার্মিনাল নির্মাণের পরিকল্পনার কথা জানালেন মৌলভীবাজার পৌরসভার বর্তমান মেয়র ফজলুর রহমান। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জের মিরপুর হয়ে শেরপুর দিয়ে সিলেটে চলে গেছে। তাই বাস টার্মিনালটির কার্যক্রম চালু করা যাচ্ছে না। এখন নতুন করে শ্রীমঙ্গল আঞ্চলিক মহাসড়কে বাস টার্মিনাল নির্মাণ করতে হবে।’

 



সাতদিনের সেরা