kalerkantho

রবিবার । ১৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৮। ২৮ নভেম্বর ২০২১। ২২ রবিউস সানি ১৪৪৩

সমবায় সমিতির টাকায় সভাপতির ৭ প্রতিষ্ঠান

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২৭ অক্টোবর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



সমবায় সমিতির টাকায় সভাপতির ৭ প্রতিষ্ঠান

দরিদ্র মানুষকে আর্থিকভাবে সচ্ছল করে তোলার নামে ‘কর্ণফুলী মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটি’ চালু করেন জসিম উদ্দিন। তিনি কৌশলে আত্মীয়-স্বজনকে এই সমবায় সমিতির গুরুত্বপূর্ণ পদে নির্বাচিত করেন এবং নিজে হন সভাপতি। সমবায় অধিদপ্তরের নিরীক্ষায় কর্ণফুলীর ৫৩৭ সদস্য এবং ৮২ লাখ টাকা লেনদেন দেখানো হয়। তবে আড়ালে প্রায় ২৫ হাজার গ্রাহক তৈরি করেন জসিম। তাদের কাছ থেকে শতকোটি টাকার আমানত গ্রহণ করেন।

তবে এনজিওর মতো আর্থিক লেনদেন করার অনুমোদন ছিল না প্রতিষ্ঠানটির। বিনিয়োগকারীদের টাকা জসিম তাঁর ব্যক্তিগত ব্যাংক হিসাবে সরিয়ে নেন। দরিদ্র মানুষের ওই টাকায় তিনি প্লট, ফ্ল্যাট ও জমি কিনেছেন। ডায়াগনস্টিক সেন্টারসহ গড়ে তুলেছেন সাতটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। কর্ণফুলী সমিতিতে বহু স্তর বিপণন পদ্ধতিতে (এমএলএম) নিম্ন আয়ের মানুষকে বেশি লাভের প্রলোভন দেখানো হতো। ডিপিএস/এফডিআরসহ বিভিন্ন নামে সমিতিতে টাকা রেখে এখন দিশাহারা শত শত বিনিয়োগকারী।

রাজধানীর পল্লবীর ১১/এ ৬ নম্বর সড়কের ৪ নম্বর প্লটে নান্নু সুপারমার্কেটে কর্ণফুলী মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটি লিমিটেডে অভিযান চালিয়ে র‌্যাব কর্মকর্তারা এসব দাবি করেছেন। গত সোমবার প্রতিষ্ঠানটির সামনে বিক্ষোভ করে দুই শতাধিক বিনিয়োগকারী। এরপর সোমবার দুপুর থেকে গতকাল মঙ্গলবার পর্যন্ত র‌্যাব সমিতির প্রকল্প পরিচালক শাকিল আহম্মেদসহ (৩৩) ১০ জনকে গ্রেপ্তার করে। গ্রেপ্তারকৃত অন্যরা হলেন চাঁন মিয়া (৩৮), এ কে আজাদ (৩৫), রেজাউল (২২), তাজুল ইসলাম (৩১), শাহাবুদ্দিন খান (২৮), আব্দুস ছাত্তার (৩৭),  মাসুম বিল্লা (২৯), টিটু মিয়া (২৮) ও আতিকুর রহমান (২৮)। তাঁদের কাছ থেকে ১৭টি মুদারাবা সঞ্চয়ী হিসাব বই, ২৬টি চেকবই, দুটি ডিপোজিট বই, তিনটি সিল, ১২০টি ডিপিএস বই, একটি রেজিস্টার বই, একটি নোটবুক, একটি বেতন শিট, ৩০টি জীবনবৃত্তান্ত, চার লাখ ২২ হাজার ৮০ টাকাসহ নথিপত্র জব্দ করা হয়। প্রতিষ্ঠানটির সভাপতি জসিমসহ সমিতির কার্যকরী কমিটির অন্য সদস্যরা পলাতক রয়েছেন।

গতকাল দুপুরে রাজধানীর কারওয়ান বাজারের মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে র‌্যাব-৪-এর অধিনায়ক (সিও) অতিরিক্ত ডিআইজি মোজাম্মেল হক বলেন, মূল অভিযুক্ত জসিম নিজেই সমিতির সভাপতি, সহসভাপতি তাঁর শ্বশুর মোতালেব সরকার, সাধারণ সম্পাদক তাঁর প্রথম স্ত্রী লাকী আক্তার এবং কোষাধ্যক্ষ তাঁর শ্যালিকা শাহেলা নাজনীন। এমনকি যুগ্ম সম্পাদকও নিকট আত্মীয় লাভলী আক্তার। এটি একরকম পারিবারিক সমিতি। সমবায় সমিতির হিসাবে ৫৩৭ সদস্যের কথা উল্লেখ করা হলেও গ্রাহকদের অভিযোগ ও র‌্যাবের তদন্তে উঠে এসেছে প্রতিষ্ঠানটিতে প্রায় ২৫ হাজার গ্রাহক আছে। যারা শতকোটির বেশি টাকা লেনদেন করেছে।

র‌্যাবের অধিনায়ক আরো বলেন, কেউ যদি একটি ডিপিএস মাসে এক হাজার টাকা করে বছরে ১২ হাজার টাকা জমা দেয় তাহলে পাঁচ বছরে ৬০ হাজার টাকা জমা হবে। মেয়াদ শেষে তাকে ৯০ হাজার টাকা দেওয়া হবে। টার্গেট সংগ্রহকারী ব্যক্তি প্রথম এক বছর প্রতি মাসে ২০০ টাকা এবং পরবর্তী চার বছর প্রতি মাসে ১০০ টাকা করে লভ্যাংশ পাবে। আর কম্পানির কোনো সদস্য যদি নতুন কোনো সদস্যকে এক হাজার টাকার এফডিআর করাতে পারে তাহলে টার্গেট সংগ্রহকারীকে মাসে এক হাজার টাকা এবং এফডিআরকারী সদস্যকে মাসে দুই হাজার টাকা দেওয়ার লোভ দেখানো হতো। প্রকৃতপক্ষে যা দেশে কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠান দিতে পারে না।

র‌্যাব কর্মকর্তা বলেন, গ্রেপ্তারকৃত শাকিল ও চাঁন মিয়া ভুক্তভোগীদের বিভিন্নভাবে প্রলোভন দেখিয়ে স্বল্প সময়ে অধিক মুনাফা প্রদানের নিশ্চয়তা দিয়ে বিনিয়োগ বা ডিপিএস করতে আগ্রহী করতেন। এভাবে প্রলুব্ধ হয়ে বস্তি এলাকার গার্মেন্টকর্মী, রিকশাচালক, ভ্যানচালক, অটোচালক, সবজি ব্যবসায়ী, ফল ব্যবসায়ী, গৃহকর্মী ও নিম্ন আয়ের মানুষেরা বিনিয়োগ করত। প্রত্যেক সদস্য মাসিক ১০০ থেকে এক হাজার টাকা করে কথিত ডিপিএস জমা করত, যা তিন বছরে ৩০ শতাংশ এবং পাঁচ বছরে ৫০ শতাশং মুনাফা দেওয়ার শর্তে গ্রহণ করা হতো। তবে ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, তাদের নিয়মিত লভ্যাংশ দেওয়া হতো না। ডিপিএসের মেয়াদ পূর্ণ হলেও পাওনা টাকা পরিশোধ করা হতো না। অধিক মুনাফার লোভে করোনার সময়েও ভুক্তভোগীরা সঠিক সময়ে ডিপিএসের টাকা জমা দিলেও লভ্যাংশ পায়নি। ভুক্তভোগীরা লাভের টাকা চাইতে গেলে হুমকি-ধমকি দেওয়া হতো। নারী গ্রাহকদের প্রতি অশালীন মন্তব্য, পুরুষ সদস্যদের টর্চার সেলে নিয়ে মারধর করা হতো বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযানে শাকিলের অফিসের টর্চার সেল থেকে মারধরের সরঞ্জামাদি উদ্ধার করা হয়েছে।

সমিতির টাকায় জসিমের বিপুল সম্পদ

র‌্যাব কর্মকর্তারা জানান, মুন্সীগঞ্জের জসিম জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক পাস করেন। একটি বীমা কম্পানিতে কর্মী হিসেবে কাজ করলেও ২০০৩ সালে তিনি অল্প সময়ে বেশি মুনাফা লাভের আশায় কর্ণফুলী মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটি প্রতিষ্ঠা করেন। ২০০৬ সালে সমবায় অধিদপ্তর কর্তৃক কর্ণফুলী মাল্টিপারপাস নিবন্ধন লাভ করে, ২০১৩ সালে সমিতিটি পুনর্নিবন্ধন পায়। জসিম নিজের নামে-বেনামে আরো সাতটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন। জসিম মডার্ন ডায়াগনস্টিক সেন্টার, কর্ণফুলী রিয়েল এস্টেট লিমিটেড, জসিম ইন্টারন্যাশনাল ওভারসিস লিমিটেড, জসিম স্টুডেন্ট কনসালট্যান্সি ফার্ম, জসিম ট্যুরস অ্যান্ড ট্রাভেলস, জসিম ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশন ও জসিম নিট কম্পোজিট লিমিটেড। এসব কম্পানির নামে লেনদেন ও টাকা স্থানান্তর করলেও কর্ণফুলী মাল্টিপারপাস ছাড়া বাকি সাত কম্পানির অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।

র‌্যাব-৪-এর অধিনায়ক মোজাম্মেল হক বলেন, জসিমের আয়ের মূল উৎস কর্ণফুলী মাল্টিপারপাসে ভুক্তভোগীদের ডিপিএস বা এফডিআরের টাকা। অত্যন্ত ধূর্ত প্রকৃতির জসিম সমিতির অফিসে আসতেন না। সমিতির ব্যাংক হিসাবে টাকা জমা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তা উত্তোলন করে অন্যত্র স্থানান্তর করতেন। গ্রাহকের টাকায় তিনি বসুন্ধরায় ফ্ল্যাট, গ্রিন রোডে ফ্ল্যাট, গাজীপুরের মাওনায় দুটি প্লট, তিনটি ফ্ল্যাট, মিরপুরে বাড়ি, কাউনিয়া মৌজা ও গাজীপুরে বেশ কয়েক একর জমি কিনেছেন। নরসিংদীর শাকিল টঙ্গী কলেজ থেকে স্নাতক পাস করে ২০১৫ সালে কর্ণফুলী মাল্টিপারপাসে প্রকল্প পরিচালক হিসেবে যোগ দেন। ডিপিএস/এফডিআর চালু করে তিনি গ্রাহক বাড়াতে থাকেন। জসিম ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে বলে জানান র‌্যাব অধিনায়ক।

অনেক মানুষের মাথায় হাত

গত সোমবার পল্লবীর কার্যালয় ঘেরাও করার পর কর্মকর্তাদের গ্রেপ্তারের খবরে র‌্যাবের কাছে অভিযোগ করছে কর্ণফুলী সমিতির সদস্য ও বিনিয়োগকারীরা। গতকালও র‌্যাবের সংবাদ সম্মেলনে হাজির হয় বেশ কয়েকজন ভুক্তভোগী। তারা জসিমসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিচারের পাশাপাশি নিজেদের টাকা ফেরত চায়।

তরিকুল ইসলাম রুবেল নামের এক ভুক্তভোগী বলেন, ‘আমার স্ত্রী গার্মেন্টে চাকরি করত। সে এদের প্রতিষ্ঠানে দুটি ডিপিএস করে। একটি দুই হাজার ৫০০ টাকা, আরেকটি এক হাজার ২০০ টাকার। প্রথম দুই মাস লভ্যাংশ দেওয়া হয়। এরপর আর টকা দেয়নি। এখন আসল টাকা পাব কি না জানি না।’

মিরপুরের সবজি বিক্রেতা মোহাম্মদ ইব্রাহিম বলেন, ‘এক বছর আগে আমি তিন লাখ টাকা রাখি; কিন্তু প্রতি মাসের লভ্যাংশ তো দূরে থাক, আসল টাকাও ফেরত পাচ্ছি না।’

ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী শুক্কুর আলী বলেন, ‘আমি বেশি লাভের আশায় প্রায় আট লাখ টাকা রেখেছি। আমাকে এক-দুই মাস টাকা দিলেও পরে আর দেওয়া হয়নি। আমার মাধ্যমে আমার শ্যালক-শ্যালিকাও এখানে টাকা রেখেছিল।’



সাতদিনের সেরা