kalerkantho

সোমবার । ১৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৮। ২৯ নভেম্বর ২০২১। ২৩ রবিউস সানি ১৪৪৩

বাবাকে ছাড়া শিশু আদিত্য

সামসুল হাসান মীরন, নোয়াখালী   

২৬ অক্টোবর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



বাবাকে ছাড়া শিশু আদিত্য

যতন সাহা

প্রতিবছর দুর্গাপূজায় প্রিয় পূজামণ্ডপ বিজয়াতে ছুটে আসেন যতন সাহা (৪২)। এবারও এলেন। তবে এবার পূজা শেষে ফেরা হলো না পরিবারের কাছে ও কর্মস্থলে। সাম্প্রদায়িক অশুভ শক্তির হামলায় নিভে গেল তাঁর জীবনপ্রদীপ। স্বামীর মৃত্যুর ৯ দিন পরও স্বাভাবিক হতে পারেননি যতনের স্ত্রী লাকি রানী সাহা। যতন-লাকির চার বছরের একমাত্র সন্তান আদিত্য সাহাও এখনো কেঁদে চলেছে বাবার জন্য। নোয়াখালীর চৌমুহনী কলেজ রোডে যতনের ছোট বোনের বাড়িতে চলছে শোক। সেখানে ধর্ম-বর্ণ- নির্বিশেষে কেউ আসছেন সহানুভূতি জানাতে, কেউ আসছেন সাহায্যের হাত বাড়িয়ে।

গত ১৫ অক্টোবর (শুক্রবার) দশমীর দেবী বিসর্জন শেষে চৌমুহনী পৌর এলাকার কলেজ রোডে বিজয়া পূজামণ্ডপে বক্তারা বসে আলাপ করছিলেন। এ সময়ই কিছু দুষ্কৃতকারী আচমকা তাঁদের ওপর হামলা করে, ভাঙচুর চালায়। অন্যরা পালাতে পারলেও যতন পারেননি। দুর্বৃত্তদের হামলায় মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন যতন। তিনি কুমিল্লার তিতাস উপজেলার গোবিন্দপুর গ্রামের মৃত মনোরঞ্জন সাহার ছেলে। বিয়ের পর স্ত্রী-সন্তানকে নিয়ে দুর্গাপূজায় এবারই প্রথম এসেছিলেন তিনি।

চৌমুহনী কলেজ রোডে যতন সাহার বোনের বাসায় যতনের বেয়াই শান্তনু সাহার সঙ্গে কথা হয়। তিনি জানান, দীর্ঘ ২৫ বছর ধরে তাঁরা এই বিজয়াতে দুর্গাপূজা করে আসছেন। এটি বৃহত্তর নোয়াখালীর অন্যতম পূজামণ্ডপ। যতনের অকাল, নির্মম মৃত্যু কেউ মেনে নিতে পারছে না। প্রতিদিন বাবার সঙ্গে ভাত খেত যতনের চার বছরের শিশুসন্তান আদিত্য। ১৫ অক্টোবর রাত থেকে বাবাকে না দেখে কান্নাকাটি করছে সে। শুধু ‘বাবা’ ‘বাবা’ বলে কান্নাকাটি করছে। কিছুতেই থামছে না। কোনো অবস্থাতেই বোঝানো যাচ্ছে না যে বাবা আর ফিরবে না। বাবাকে ছাড়া তাকে খাওয়ানো অসম্ভব হয়ে পড়েছে। শান্তনু আরো জানান,  যতন সাহা জাইকার একটি প্রকল্পে চট্টগ্রামে কাজ করতেন। মা-বাবাহারা যতন চার ভাই দুই বোনের মধ্যে ছিলেন পঞ্চম। ছোট বোন মুক্তা রানী সাহার বাসায় থেকে মণ্ডপে সবার সঙ্গে পূজার আনন্দ ভাগ করে নিতেন।

মুক্তা রানী কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘অত্যন্ত সাদাসিধে ও হাসিখুশির একজন মানুষ ছিলেন যতন। তিনি বিজয়া সর্বজনীন দুর্গামন্দিরের একজন সদস্য ছিলেন। প্রতিবছর দুর্গোৎসবে তিনি মুক্তা রানীর বাড়ি চৌমুহনীর নরোত্তমপুরে চলে আসতেন। বিয়ের পর স্ত্রী ও ছেলেকে নিয়ে দুর্গাপূজায় এবারই প্রথম এসেছিলেন।’ ‘কিন্তু পূজায় আনন্দ ভাগাভাগি করতে এসে আমাদের সবাইকে ফাঁকি দিয়ে যে এভাবে অকালে চলে যাবেন, ভাবতেও পারিনি। আমার ভাই আর কোনো দিন দুর্গাপূজায় আমার বাড়িতে আসবেন না, মনকে এ কথা বোঝাতে পারছি না,’ বলেন মুক্তা রানী।

লাকি রানী কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘আমাদের সংসার পরিচালনার একমাত্র উপর্জনকারী ছিলেন আমার স্বামী যতন। তাঁকে সন্ত্রাসীরা বিনা কারণে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করেছে। তাঁর তো কোনো দোষ ছিল না।’ স্বামীর হত্যাকারীদের আইনের আওতায় এনে সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানান লাকি।

তবে লাকির পরিবারের পাশে দাঁড়াতে ছুটে এসেছেন অনেকেই। যতন সাহার মৃতদেহ সৎকারের জন্য নোয়াখালী জেলা প্রশাসন ২৫ হাজার টাকা দিয়েছে। আরো অর্থ সাহায্য দেওয়ার অঙ্গীকার করেছে। বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশন পাঁচ লাখ টাকা, নোয়াখালী-৪ (সদর, সুবর্ণচর) আসনের সংসদ সদস্য একরামুল করিম চৌধুরী দুই লাখ, স্থানীয় সংসদ সদস্য মামুনুর রশিদ কিরণ ৫০ হাজার টাকা দিয়েছেন। আরো অনেকে সাহায্যের হাত বাড়ানোর কথা বলেছেন।

 



সাতদিনের সেরা