kalerkantho

সোমবার । ১৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৮। ২৯ নভেম্বর ২০২১। ২৩ রবিউস সানি ১৪৪৩

চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানা

বাঘের বড় ধরনের বিস্তার

রাশেদুল তুষার, চট্টগ্রাম   

২৬ অক্টোবর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



বাঘের বড় ধরনের বিস্তার

চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানায় কর্তৃপক্ষের পরম যত্নে বেড়ে উঠছে বাঘের ছানাগুলো। ছবি : কালের কণ্ঠ

বাঘিনী মা ‘পরী’ তিন ছানাকে নিয়ে ব্যস্ত খুনসুটিতে। পাশের খাঁচায় আরেক মা ‘জয়া’ আদর করে উষ্ণতা দিচ্ছে সদ্যোজাত নিজের দুই ছানাকে। পাশাপাশি এমন চার খাঁচায় পাঁচ ছানার সঙ্গে ছয়টি বুড়ো বাঘ। আরেকটি ছানা কিউরেটরের বিশেষ তত্ত্বাবধানে পরম যত্নে বেড়ে উঠছে অফিসকক্ষের পাশে।

২০১৬ সালে সুদূর দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে উড়িয়ে আনা হয়েছিল বাঘ দম্পতি রাজ-পরীকে। খরচ হয়েছিল প্রায় ৩৩ লাখ টাকা। চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানায় আনার পর গেল পাঁচ বছরে প্রজননের মাধ্যমে এখন বাঘের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১২। এত কম সময়ে বাঘের সংখ্যা বাড়ার প্রবণতাকে বিরল মনে করছেন প্রাণী বিশেষজ্ঞরাও। বাঘ বাড়তে থাকায় বাড়ানো হয়েছে খাঁচাও। বর্তমানে চারটি খাঁচায় রয়েছে বাঘগুলো। যে হারে বাঘের সংখ্যা বাড়ছে তাতে আগামী দিনে স্থান সংকুলান নিয়ে বেকায়দায় পড়তে পারে চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ। ১৯৮৯ সালে প্রতিষ্ঠিত এই চিড়িয়াখানায় বর্তমানে ৬৬ প্রজাতির ৬৬০টি পশু-পাখি রয়েছে।

২০১৯ সালের মে মাসে প্রকাশিত বাঘশুমারি অনুযায়ী, সুন্দরবনের বাংলাদেশ অংশে ১১৪টি বাঘের অস্তিত্ব মিলেছে। ইউএসএআইডির বেঙ্গল টাইগার কনজারভেশন অ্যাক্টিভিটি (বাঘ) প্রকল্পের আওতায় ২০১৬ সালের ১ ডিসেম্বর থেকে ২০১৮ সালের ১০ মে পর্যন্ত চার ধাপে পরিচালিত হয়েছিল জরিপটি। ওই জরিপে বাঘের সংখ্যা রেকর্ড করার জন্য ব্যবহার করা হয়েছিল ক্যামেরা ফাঁদ পদ্ধতি।

সুন্দরবনে বাঘের ঘনত্ব বিবেচনায় চট্টগ্রামের ছোট্ট চিড়িয়াখানার চার খাঁচায়ই সংসার পেতেছে ১২টি বাঘ। এর ছয়টি পূর্ণবয়স্ক, বাকি ছয়টি ছানা। এর মধ্যে ব্যতিক্রম ২০১৮ সালের জুলাইয়ে রাজ-পরী দম্পতির ঘরে জন্ম নেওয়া বিরল প্রজাতির ‘শুভ্রা’, যা বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো জন্ম নেওয়া একমাত্র সাদা বাঘ। করোনাকালেই জন্ম নিয়েছে সাতটি বাঘ, এর মধ্যে পাঁচটিই এ বছরে।

এ ব্যাপারে চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানার ভারপ্রাপ্ত কিউরেটর ডা. শাহাদাত হোসেন শুভ বলেন, ‘পর্যাপ্ত খাবার এবং নিরাপদ মাতৃত্ব নিশ্চিত করা গেলে বাঘ প্রজননে উৎসাহিত হয়। আমরা সেটাই নিশ্চিত করার চেষ্টা করেছি। বাঘিনী সাধারণত গর্ভধারণের ১০৫ দিনে বাচ্চা প্রসব করে। আমরা সেই দিন হিসাব করে প্রসবের ১৫-২০ দিন আগে বাঘিনীকে অন্য বাঘ থেকে আলাদা করে ফেলি। তাকে একটি নিরিবিলি পরিবেশ দিই, যাতে গর্ভধারণ ও মাতৃত্ব নিয়ে নিশ্চিত থাকে। এ কারণে গেল চার বছরে চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানায় ১০টি বাঘের জন্ম হয়েছে।’

এভাবে এই চিড়িয়াখানায় সর্বোচ্চ ২০টি বাঘের সংস্থান হতে পারে বলে জানান ভারপ্রাপ্ত কিউরেটর। বর্তমানে একাধিক পূর্ণবয়স্ক বাঘ থাকায় এই লক্ষ্যমাত্রাও আগামী দুই-তিন বছরের মধ্যেই পূরণ  হয়ে যেতে পারে। এরপর বাঘের সংকুলান কিভাবে হবে, তা ভেবে এরই মধ্যে চিন্তায় পড়েছেন চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানার  কর্মকর্তারা।

তবে এর একটি সমাধানও দেওয়ার চেষ্টা করেছেন চিড়িয়াখানার ভারপ্রাপ্ত কিউরেটর ডা. শাহাদাত হোসেন শুভ। তিনি জানান, যদিও খাঁচার বাঘ, তার পরও যে হারে বাঘ বাড়ছে তাতে ভবিষ্যতে এখান থেকে সুন্দরবনে বাঘ ছাড়ার পদক্ষেপ নিতে হতে পারে। এ জন্য জিনগত বৈচিত্র্য বাড়াতে কার্যকর পদ্ধতি হতে পারে পুনঃপ্রবর্তন। দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প নেওয়ার মাধ্যমে সুন্দরবনে অনেক বাঘ ছাড়া সম্ভব। এ জন্য বাংলাদেশের বিভিন্ন চিড়িয়াখানা ও সাফারি পার্ক থেকে ১০টি বাঘ সংগ্রহ করা যেতে পারে। এদের থেকে ক্যাপটিভ ব্রিডিং করিয়ে জন্ম নেওয়া ছানাগুলো ছয় মাস বয়স হলে সুন্দরবনের কাছে বড় পরিসরে লালনপালনের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। ক্যামেরা ট্র্যাকিংয়ের মাধ্যমে সুন্দরবনের যেসব অংশে বাঘ নেই, সেসব অংশ চিহ্নিত করতে হবে, যাতে অন্য বাঘের সঙ্গে সংঘর্ষ না বাধে। পরে এদের ট্রেনিং করিয়ে ছোট স্তন্যপায়ী প্রাণী থেকে হরিণ পর্যন্ত শিকার করার অভ্যাস শেখানো যেতে পারে। এসব ব্যাঘ্রশাবক প্রাপ্তবয়স্ক হলে পরে সুন্দরবনে ছাড়তে হবে।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বিভাগীয় বন সংরক্ষক বিপুল কৃষ্ণ দাস বলেন, ‘জেলা প্রশাসনের আওতায় চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানা। যদি জেলা প্রশাসনের কাছ থেকে কোনো প্রস্তাবনা আসে সে ক্ষেত্রে আমরা বিবেচনা করে দেখব।’

চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানার সদস্যসচিব ও চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের সিনিয়র সহকারী কমিশনার তৌহিদুল ইসলাম বলেন, ‘দেশের অন্য চিড়িয়াখানার সঙ্গে প্রাণী বিনিময়ের কথা ভাবছি। এ ছাড়া চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানাকে সাফারি পার্কের মতো সম্প্রসারণের বিষয়টিও আমাদের মাথায় আছে। চিড়িয়াখানার পেছনের দিকে প্রায় পাঁচ একর জায়গা আছে, সেখানে বিচরণক্ষেত্র করা যায় কি না, সেটাও ভেবে দেখা হচ্ছে।’ অতিরিক্ত বাঘ বনে ছাড়া যায় কি না, সে ব্যাপারে বন বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার জেলা প্রশাসন থেকে প্রস্তাবনা দেওয়ার প্রসঙ্গে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি বলেন, ‘তিনি যদি এমন বলে থাকেন তাহলে সুন্দরবনে বাঘ ছাড়ার ব্যাপারে বন বিভাগকে চিঠি দেওয়ার বিষয়টি ভেবে দেখা হবে।’



সাতদিনের সেরা