kalerkantho

মঙ্গলবার । ১৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৮। ৩০ নভেম্বর ২০২১। ২৪ রবিউস সানি ১৪৪৩

সারা দেশে গণ-অনশন বিক্ষোভ

বিচার বিভাগীয় তদন্তসহ আট দফা দাবি

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২৪ অক্টোবর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



বিচার বিভাগীয় তদন্তসহ আট দফা দাবি

সাম্প্রদায়িক সহিংসতার প্রতিবাদে এবং দায়ীদের শাস্তির দাবিতে হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ সারা দেশে গণ-অনশন, গণ-অবস্থান ও বিক্ষোভ মিছিল বের করে। গতকাল রাজধানীর শাহবাগে। ছবি : কালের কণ্ঠ

বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের আহ্বানে পালিত গণ-অনশন, অবস্থান ও বিক্ষোভ কর্মসূচিতে কুমিল্লাসহ কয়েকটি স্থানে সংঘটিত সাম্প্রদায়িক সহিংসতার বিচার বিভাগীয় তদন্ত ও  বিশেষ ক্ষমতা আইনে হামলাকারীদের বিচারসহ আট দফা দাবি জানানো হয়েছে।

পাশাপাশি যেসব জনপ্রতিনিধি সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসীদের মোকাবেলায় এগিয়ে আসেননি, তাঁদের চিহ্নিত করে শাস্তিমূলক ও সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। যারা উসকানি দিচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে।

আট দফা দাবি দ্রুত বাস্তবায়ন না হলে আগামী ফেব্রুয়ারিতে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে ‘চল চল ঢাকায় চল’ স্লোগানে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় অভিমুখে পদযাত্রা কর্মসূচি পালন করা হবে। আগামী ৪ নভেম্বর হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের শ্যামাপূজায় দীপাবলি উৎসব বর্জন করে সন্ধ্যা ৬টা থেকে ৬টা ১৫ মিনিট পর্যন্ত কালো কাপড়ে মুখ ঢেকে নিজ নিজ মন্দিরে নীরবতা পালন ও মন্দির-মণ্ডপ ফটকে কালো কাপড়ে সাম্প্রদায়িক সহিংসতাবিরোধী স্লোগানসংবলিত ব্যানার টানানোর প্রতিবাদী কর্মসূচি পালনের সঙ্গে সংহতি জানানো হয় সমাবেশগুলোতে। 

গতকাল শনিবার দেশের বিভিন্ন স্থানে এ গণ-অনশন ও অবস্থান কর্মসূচি পালিত হয়। এতে অন্যান্য সংগঠনের নেতারাও যোগ দিয়ে সংহতি জানান। চট্টগ্রামে কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে এই পরিষদের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট রানা দাশগুপ্ত বলেন, দুর্গাপূজার মধ্যে দেশজুড়ে পূজামণ্ডপ ও হিন্দুদের বাড়িঘরে হামলার ঘটনায় সুপ্রিম কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারকের নেতৃত্বে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করে হামলাকারীদের বিচার করতে হবে।

রাজধানীর শাহবাগে জাতীয় জাদুঘরের সামনে সকাল ৬টা থেকে শুরু হয়ে দুপুর ১২টা পর্যন্ত এই অবস্থান ও অনশন কর্মসূচি চলে। পরে অনশনকারীদের পানি পান করিয়ে অনশন ভাঙান মানবাধিকারকর্মী খুশী কবির। এরপর শাহবাগ মোড় অবরোধ করে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে তারা। বিক্ষোভ মিছিল জাতীয় প্রেস ক্লাবে গিয়ে শেষ হয়।  

কর্মসূচিতে আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘ (ইসকন), বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ, বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু মহাসংঘ, বাংলাদেশ সনাতন কল্যাণ জোট, বাংলাদেশ বুদ্ধিস্ট ফেডারেশন, অ্যাসোসিয়েশন ফর ল্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (এএলআরডি), বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু সমাজ সংস্কার সমিতি, জন্মাষ্টমী উদযাপন পরিষদ, বাংলাদেশ বৌদ্ধ সমিতি, বাংলাদেশ মাইনরিটি সংগ্রাম পরিষদ, বাংলাদেশ হিন্দু লীগ, মাইনরিটি রাইটস ফোরাম, বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু ফোরাম ও হিন্দু ছাত্র ফোরাম, বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু সমাজ সংরক্ষণ সমিতি, ইন্টারন্যাশনাল শ্রীশ্রী হরি গুরুচাঁদ মতুয়া মিশন, বাংলাদেশ হরিজন ঐক্য পরিষদ, জাতীয় আদিবাসী পরিষদের ভক্ত সমর্থকরা অংশ নেয়।

কর্মসূচি থেকে আট দফা দাবি জানায় বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ। দাবিগুলো হলো ‘সাম্প্রদায়িক সহিংসতার তদন্তে সুপ্রিম কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির নেতৃত্বে বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন গঠন করা; হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত মন্দির, বাড়িঘর সংস্কার, গৃহহীনদের পুনর্বাসন, ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের ক্ষতিপূরণ প্রদান, আহতদের চিকিৎসা ও নিহতদের প্রতিটি পরিবারকে কমপক্ষে ২০ লাখ টাকা প্রদান করা; নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের অবিলম্বে গ্রেপ্তার করে বিশেষ ক্ষমতা আইনে শাস্তি নিশ্চিত করা; প্রধানমন্ত্রীর সুস্পষ্ট নির্দেশনা সত্ত্বেও প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা কর্তৃপক্ষের মধ্যে যাঁরা দায়িত্ব পালনে গাফিলতি করেছেন তাঁদের চিহ্নিত করে দ্রুত শাস্তিমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করা; সামাজিক মাধ্যম ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদিতে সাম্প্রদায়িক উসকানিদাতাদের চিহ্নিত করে বিশেষ ক্ষমতা আইনে শাস্তি দেওয়া;

সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসীদের মোকাবেলায় যেসব জনপ্রতিনিধিরা এগিয়ে আসেননি তাঁদের চিহ্নিত করে শাস্তিমূলক রাজনৈতিক পদক্ষেপ নেওয়া; ২০০১-২০০৬ সাল পর্যন্ত সংঘটিত সাম্প্রদায়িক ঘটনাবলি তদন্তে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের নির্দেশনায় গঠিত সাহাবুদ্দিন কমিশনের সুপারিশসংবলিত রিপোর্ট অবিলম্বে জনসমক্ষে প্রকাশ ও সুপারিশ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া; ১৯৭২ সালের সংবিধান পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে প্রতিশ্রুত সংখ্যালঘু সুরক্ষা আইন প্রণয়ন, জাতীয় সংখ্যালঘু কমিশন গঠন, বৈষম্য বিলোপ আইন প্রণয়ন এবং অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণ আইনের দ্রুত বাস্তবায়ন করা।

শাহবাগের এ অনশন ও অবস্থান কর্মসূচিতে সংহতি জানিয়ে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের সভাপতি হাসানুল হক ইনু বলেন, ‘এই হামলা শুধু হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা নয়, গোটা বাঙালি জাতির ওপর হামলা। প্রশাসনের গাফিলতির কারণেই এই হামলা হয়েছে।’

গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ও অন্যতম ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, ‘হামলার পর আমি রংপুরসহ বিভিন্ন ঘটনাস্থলে গিয়েছি। ক্ষতিগ্রস্তদের সঙ্গে কথা বলেছি। তাঁরা আতঙ্কের মধ্যে আছেন। তাঁরা বলছেন, আমাদের মা প্রধানমন্ত্রী কবে আসবেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তাঁরা আপনার দিকে তাকিয়ে আছেন। আপনি তাঁদের কাছে গিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে সংহতি জানান। এ ছাড়া ভবিষ্যতে এ ধরনের হামলার বিরুদ্ধে প্রত্যেক মসজিদের ইমামকে জনমত গড়ে তুলতে হবে। বলতে হবে এগুলো অনৈসলামিক কাজ।’

গণফোরাম নেতা সুব্রত চৌধুরী বলেন, ‘বর্তমান সরকার মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বলে ব্যবসা করে। সাংবিধানিকভাবে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম রাখা হয়েছে। আবার রাষ্ট্রকে বলা হয় ধর্মনিরপেক্ষ। এটি চরম ভাঁওতাবাজি।’

বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি মিলন কান্তি দত্ত বলেন, ‘বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে অসাম্প্রদায়িক চেতনা নিয়ে। আজকে দেশ কী অসাম্প্রদায়িক? অসাম্প্রদায়িক চেতনা যদি থাকত তাহলে একাত্তরের ১৯ ভাগ হিন্দু জনসংখ্যা ২০১৩ সালে সাড়ে আট ভাগে নেমে আসত না। আমরা বারবার আঘাতপ্রাপ্ত হচ্ছি, আন্দোলন করছি, কিন্তু বিচার পাচ্ছি না। সাম্প্রদায়িক হামলার কোনো ঘটনারই সুষ্ঠ বিচার হয়নি। তাই প্রতিনিয়ত এর পুনরাবৃত্তি ঘটছে।’

বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সভাপতি অধ্যাপক নিমচন্দ্র ভৌমিক বলেন, ‘আমরা এই সাম্প্রদায়িক হামলার দৃষ্টান্তমূলক বিচার চাই। আগে যে হামলাগুলো হয়েছিল, সেগুলোরও বিচার করতে হবে।’

কর্মসূচিতে মানবাধিকারকর্মী সুলতানা কামাল, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের সাধারণ সম্পাদক শিরিন আক্তার এমপি, বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু মহাজোটের মহাসচিব পলাশ কান্তি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক নিজামুল হক ভূঁইয়া, ঢাবি অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক রঞ্জন কর্মকার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক রোবায়েত ফেরদৌস, মহিলা ঐক্য পরিষদের সভাপতি সুপ্রিয়া ভট্টাচার্য, শিক্ষক ঐক্য পরিষদের আহ্বায়ক অরুণ কুমার সংহতি জানিয়ে বক্তব্য দেন।

চট্টগ্রাম নগরীর আন্দরকিল্লা মোড়ে অধ্যাপক রণজিৎ কুমার দের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত  সমাবেশে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন ওয়ার্ড কাউন্সিলর জহরলাল হাজারী, জাসদ নেতা ইন্দু নন্দন দে, অ্যাডভোকেট চন্দন তালুকদার, ইসকনের চট্টগ্রাম বিভাগীয় সম্পাদক চিন্ময় কৃষ্ণ দাশ ব্রহ্মচারী, বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের চট্টগ্রাম জেলার সভাপতি শ্যামল পালিতসহ বিভিন্ন মঠ, মন্দির পরিচালনা পরিষদের নেতারা। সংহতি প্রকাশ করে বক্তব্য দেন চট্টগ্রাম আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক এ এইচ এম জিয়া উদ্দিন। দুপুর ১২টায় সমাবেশ শেষে একটি বিক্ষোভ মিছিল নগরের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে।

ঢাকা ও চট্টগ্রাম ছাড়াও রাজশাহী, দিনাজপুর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, সিরাজগঞ্জ, নওগাঁ, টাঙ্গাইলের মির্জাপুর, মানিকগঞ্জ, বাগেরহাট, ঝালকাঠি, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, গোপালগঞ্জ, সাতক্ষীরা, পঞ্চগড়, সৈয়দপুর, চাঁদপুর, গাইবান্ধাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে গণ-অনশন-গণ-অবস্থান ও বিক্ষোভ মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। এ ছাড়া অন্যান্য সংগঠন ও প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগেও গতকাল সাম্প্রদায়িক সহিংসতার প্রতিবাদে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করা হয়।

সুজনের উদ্যোগে মানববন্ধন : এ ছাড়া গতকাল নাগরিক সংগঠন সুজনের উদ্যোগে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে মানববন্ধন হয়। এতে দ্য হাঙ্গার প্রজেক্ট, ইয়ুথ এন্ডিং হাঙ্গার, জাতীয় কন্যাশিশু অ্যাডভোকেসি ফোরাম, বিকশিত নারী নেটওয়ার্কসহ অন্যান্য সমমনা সংগঠন গণসাক্ষরতা অভিযান, মানবাধিকার উন্নয়ন কেন্দ্র এবং রিসার্চ অ্যান্ড এমপাওয়ারমেন্ট অর্গানাইজেশন যোগ দেয়। মানববন্ধনে সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘আমাদের ঘরে আগুন লেগেছে, আমরা কেউই নিরাপদ নই। এটা আমাদের জন্য জেগে ওঠার ঘণ্টাধ্বনি। দীর্ঘদিন ধরে বিচারহীনতার ও দোষারোপের সংস্কৃতির কারণে অপরাধীরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে।

 

(প্রতিবেদনটিতে স্থানীয় নিজস্ব প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিরা তথ্য দিয়েছেন)



সাতদিনের সেরা