kalerkantho

বুধবার । ১৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৮। ১ ডিসেম্বর ২০২১। ২৫ রবিউস সানি ১৪৪৩

শামসুর রাহমান : জন্মদিনে শ্রদ্ধাঞ্জলি

মানুষ ও শিল্পীসত্তার সমবায়

খালেদ হোসাইন

২৩ অক্টোবর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



মানুষ ও শিল্পীসত্তার সমবায়

শামসুর রাহমান। ২০০৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় জাতীয় কবিতা উৎসবে। ছবি : শেখ হাসান

আমাদের মনে, মর্মে, মৃত্তিকায়, মানুষে, মনুষ্যত্বে মিশে থাকা একটি সত্তার নাম শামসুর রাহমান। বাংলা সাহিত্যের প্রতিনিধিত্বশীল কবিদের একজন, পঞ্চাশের দশকের প্রধান কবি। আজ তাঁর ৯৩তম জন্মদিন। জন্মদিনে প্রাণের গভীর থেকে শ্রদ্ধা নিবেদন করি।

শামসুর রাহমান কবিতার জন্য অনুভূত তীব্র তাড়নায় ছুটে গেছেন প্রকৃতির কাছে, অর্জন করেছেন বিবিধ দীক্ষা। নদী, পাহাড়, বৃক্ষ—এগুলোর নিজস্ব জীবনের দগ্ধ অভিজ্ঞতা তাঁকে ঋদ্ধ করেছে, ছুটে গেছেন সারা পৃথিবীর নানা কবির কাছে, শিল্পীর কাছে, দেশজ ও বিশ্বপুরাণের কাছে। ২০ বছর বেঁচে থাকলেও কবিতা লিখবেন, এক দিন বেঁচে থাকলেও কবিতা লিখবেন—এই ছিল তাঁর জীবনের লক্ষ্য।

তাঁর প্রথম কাব্যে ব্যক্তি রোমান্টিকতার প্রসার অচিরেই সামষ্টিক চেতনায় রূপান্তরিত হয়। ‘নিজ বাসভূমে’র গণমানুষের অতল-গভীর বঞ্চনার বেদনা তাঁর চিত্তে মর্মরিত হয়েছে। জীবনের পারিপার্শ্ব ও বৈশ্বিক চেতনার যৌথতা উৎস হয়ে উঠেছে তাঁর কবিতার। বৈশ্বিক ঘটনা বর্ণনায় দেশই শেষাবধি মুখ্য হয়ে ওঠে, তেমনই দেশের অব্যক্ত যন্ত্রণায় তিনি যখন ছটফট করেন, তা বৈশ্বিক এক সর্বজনীন বেদনাই বাঙ্ময় হয়। এ অনায়াস ভঙ্গিই তাঁকে মর্যাদাপূর্ণ একটি অবস্থানে অধিষ্ঠিত করেছে। তাঁর কাব্যভাষা নিতান্তই আত্মতামুদ্রিত।

সব ছন্দেই তিনি অনায়াস। অনেক গম্ভীর বিষয়কেও তিনি স্বরবৃত্ত ও মাত্রাবৃত্ত ছন্দে লিখে পাঠকচিত্তে সংবেদনা সৃষ্টি করতে পেরেছেন। অক্ষরবৃত্ত ছন্দকে মুখের কথার মতো এমন এক স্তরে উন্নীত করেছিলেন তিনি, যে অনেক সময় যেন অন্তর্হিত হয়ে যায়। ছন্দের সেই কলাকৌশল বোঝাই যায় না, বোঝার কোনো প্রয়োজনও হয় না—কবিতা অনায়াসে মনকে দখল করে নেয়।

কবিতা ও কবিতার ইতিহাস, নন্দনতত্ত্বকে নিয়েও তিনি অনেক কবিতা লিখেছেন। যেমন আমাদের সহজেই মনে পড়বে তাঁর ‘কাব্যতত্ত্ব’, ‘রবীন্দ্রনাথের প্রতি’, ‘বাংলা কবিতার প্রতি’, ‘কবিকে দিও না দুঃখ’, ‘একজন কবি : তাঁর মৃত্যু’, ‘সংকটে কবির সত্তা’, ‘কবিতার সঙ্গে গেরস্থালি’, ‘বুদ্ধদেব বসুর প্রতি’, ‘শব্দের সংস্রবে কতকাল’, ‘আরাগঁ তোমার কাছে’ বা ‘কবিতার মৃত্যুশোক’ প্রভৃতি কবিতার কথা।

কবি শামসুর রাহমানকে আমি অনুসরণ করি প্রায় শৈশব থেকে। আমার বড় ভাই শাহাদাত হোসাইন কবিতা লিখতেন—কবিতা ও কবিতা সম্পর্কিত বইপত্র, লিটল ম্যাগাজিন—বাসায় একাধিক পত্রিকা রাখা হতো—বিশেষ সংখ্যাগুলোতে শামসুর রাহমানের কবিতা গুরুত্ব দিয়ে মুদ্রিত হতো, তিনি আমাদের দেখাতেন। আমি পড়তাম ও আলোড়িত হতাম।

সত্তর-আশির দশকে নারায়ণগঞ্জের সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো অনেক সৃষ্টিশীল ও সক্রিয় ছিল। বিভিন্ন সময়ে নানা অনুষ্ঠানে শামসুর রাহমান আসতেন, সেখানে আমার উপস্থিতি ছিল অনিবার্য কিন্তু নিশ্চুপ। চিঠি লিখতাম তাঁকে, একটি চিঠির জবাব দিয়েছিলেন, প্রমাণ রক্ষা করতে পারিনি।

‘প্যাপিরাস সাহিত্য চক্র’ নামের একটি সংগঠন গড়ে তুলেছিলাম, নামটা নিয়ে কথা বলার জন্য তাঁর পুরান ঢাকার বাসায় গিয়েছিলাম গল্পকার বন্ধু আনিস রহমানকে নিয়ে। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন সাহিত্যস্রষ্টাকে নিয়ে গিয়েছি আমাদের সংগঠনে, শামসুর রাহমানকেও অতিথি হিসেবে নিয়ে গিয়ে তাঁর সান্নিধ্য পেয়েছি। ‘নারায়ণগঞ্জ জেলার ইতিহাসে’ তার কিছু বিবরণ আছে।

আমি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে যোগ দেওয়ার পরে তাঁকে নানা অনুষ্ঠানে পাওয়ার ইচ্ছাকে আনুকূল্য দিয়েছেন তিনি। একবার আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘মানববিদ্যা চর্চাকেন্দ্র’ নামের একটি সংগঠন করেছিলাম, প্রথম অনুষ্ঠানে ‘আমার জীবন’ শিরোনামে বক্তৃতা করেছিলেন সরদার ফজলুল করিম, আর দ্বিতীয় অনুষ্ঠানে শামসুর রাহমান। তিনি বলতেন, ‘কথা বলতে আমি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি না।’ কিন্তু সেদিন সচ্ছল এক বাগভঙ্গিতে তাঁর নিজের জীবনের কথা স্ফূর্ত এক ঝরনার মতো বেরিয়ে আসছিল যে শ্রোতাদের মধ্যে হাসি-কান্নার ঢেউ বয়ে গিয়েছিল। বলেছিলেন যাপিত জীবনের কথা, আর চোখের আলো ক্রমান্বয়ে মিলিয়ে দৃশ্যকে অদৃশ্য করে দেওয়া বর্তমানের কথা—ভবিষ্যত্বের সম্ভাবনার কথাও। ‘মিথ্যে কেন বলব?’ ‘মৃত্যুকে আমি ঘৃণা করি।’ নতুন কিছু নয়, কিন্তু সেদিন সবার বুকে এ কথাগুলো তীরের ফলার মতো ঢুকেছিল।

তরুণদের প্রতি আগ্রহ ছিল। শামীম কবীরের কবিতার বইটি আমার কাছে আছে কি না, জানতে চেয়েছিলেন। আমি তাঁর শ্যামলীর বাসায় পৌঁছে দিয়েছিলাম। ‘প্রতিক্ষণ’ তাঁর একটি ছড়ার বই প্রকাশ করেছিল, তাঁর নিজের কাছে কোনো কপি ছিল না, তা-ও। আমি একটি কবিতার বই তাঁকে উৎসর্গ করেছিলাম। 

একটা সময় ল্যান্ডফোনে বেশ কথা হতো। আমার স্ত্রী আইরীন খুব ভোরে সাভার ক্যান্টনমেন্ট কলেজে চলে যেত। আইরীন বলত, কবি ফোন করেছেন। আলাপ হতো। একদিন, কোনো এক শুক্রবারে, আমি ফোন করে বললাম, নজরুলকে নিয়ে তাঁর লেখাটি খুব ভালো লেগেছে। তিনি বললেন, একটু আগে রশীদ করীম ফোন করে এমন কথাই বলেছেন।

স্মৃতি অনেক। প্রীতি অনেক। এমন অসাম্প্রদায়িক চেতনার মানবিকবোধে সমুজ্জ্বল হতে পারার সামর্থ্য সব কবির মধ্যে থাকে না। আত্মনির্মিতির প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে—মগ্ন সাধনা ও সক্রিয়তার যৌথতায় বাংলা সাহিত্যে শামসুর রাহমান অসামান্য হয়ে উঠেছেন। আর অসাধারণ মানবিকবোধের মধ্য দিয়ে তিনি আমাদের অস্থির, লোভপরায়ণ ও ভারসাম্যহীন সমাজে অনন্যসাধারণ একজন মানুষ। মানুষ ও শিল্পীসত্তার সমবায়েই তিনি আলোকিত মহাকালের বুকে একটি জায়গা করে নিয়েছেন। ৯৩তম জন্মদিনে তাঁকে শ্রদ্ধা নিবেদন করে আমাদের মানবিক দায়ই কেবল পূর্ণ করার চেষ্টা মাত্র।   

লেখক : কবি, প্রাবন্ধিক ও অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়



সাতদিনের সেরা