kalerkantho

বুধবার । ১৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৮। ১ ডিসেম্বর ২০২১। ২৫ রবিউস সানি ১৪৪৩

সারদেশ্বরীতে আরেক ‘স্মৃতিসৌধ’

দিনাজপুর প্রতিনিধি   

২২ অক্টোবর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



সারদেশ্বরীতে আরেক ‘স্মৃতিসৌধ’

দিনাজপুরের সারদেশ্বরী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে তৈরি করা হচ্ছে জাতীয় স্মৃতিসৌধের প্রতিকৃতি।

সারদেশ্বরী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়। দিনাজপুরের প্রায় শতবর্ষী এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দেশে অনেক কিছুতে প্রথম। যেমন, শিক্ষার্থীদের মাসিক চাঁদায় ‘দুই টাকার ব্যাংক’ দেশে প্রথম চালু করে এই বিদ্যালয়। এটি পরিচালনাও করে বিদ্যালয়টির ছাত্রীরা। এবার সারদেশ্বরী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে নির্মাণ করা হচ্ছে জাতীয় স্মৃতিসৌধের আদলে স্মৃতিসৌধ। পাওয়া তথ্য মতে, এটি জাতীয় স্মৃতিসৌধের আদলে দেশে কোনো বিদ্যালয়ে নির্মাণাধীন প্রথম স্মৃতিসৌধ। স্মৃতিসৌধের বেদিতেই নির্মাণ করা হচ্ছে শহীদ মিনার। স্থাপনা দুটির মাঝখানে থাকছে শহীদদের আত্মদানে পাওয়া বাংলাদেশের মানচিত্র।

আগামী ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবসে এই স্মৃতিসৌধ, শহীদ মিনার ও বাংলাদেশের মানচিত্র উদ্বোধনের পরিকল্পনা রয়েছে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের।

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রতন কুমার রায় বলেন, বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মোসাদ্দেক হোসেনের নকশায় স্মৃতিসৌধ, শহীদ মিনারের মাঝে বাঙালির শ্রেষ্ঠ অর্জন মানচিত্রকে স্থান দেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে অনুধাবন এবং হৃদয়ে ধারণ করতে পারবে। প্রতিদিন শিক্ষার্থীরা এই বেদির সামনে দাঁড়িয়ে পিটি প্যারেড করবে। সালাম অভিবাধন জানাবে। জাতীয় সংগীতের সঙ্গে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হবে। স্বাধীনতার ইতিহাস ভেসে উঠবে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সামনে।

প্রধান শিক্ষক জানান, জাতীয় স্মৃতিসৌধের আদলে নির্মাণাধীন বিদ্যালয়কেন্দ্রিক প্রথম স্মৃতিসৌধটির চওড়া ১৫ ফুট ও উচ্চতা ২২ ফুট। উপজেলা প্রশাসন ও বিদ্যালয়ের নিজস্ব অর্থায়নে মুজি বর্ষ উপলক্ষে এই স্থাপনা নির্মাণ করছে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।

সারদেশ্বরী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. ফরিদুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের ঢাকার সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধ দেখতে যাওয়ার সুযোগ হয় না। ১ শতাংশ শিক্ষার্থীও হয়তো সরাসরি স্মৃতিসৌধ দেখেনি। প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শহীদ মিনার থাকায় শিক্ষার্থীরা জানে শহীদ মিনার কী। কিন্তু স্মৃতিসৌধ কী জানে না। তাই স্মৃতিসৌধ ও বাংলাদেশের স্বাধীনতা সম্পর্কে সঠিক তথ্য জানার জন্য প্রতিটি বিদ্যালয়ে শহীদ মিনারের মতো স্মৃতিসৌধ নির্মাণের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

নাগরিক উদ্যোগ, দিনাজপুরের আহ্বায়ক বীর মুক্তিযোদ্ধা বিশিষ্ট রাজনীতিক আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘এক লাইনে শহীদ মিনার, স্মৃতিসৌধ ও বাংলাদেশের মানচিত্র আমাকে অভিভূত করেছে। এটা প্রশংসনীয় উদ্যোগ। ইদানীং মানুষ স্বাধীনতা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ ইত্যাদির স্মৃতি কেমন যেন ভুলে যাচ্ছে। যে চেতনা নিয়ে মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল, সেই চেতনা অনেকখানি ভুলে গেছে। আমরা সাংগঠনিকভাবে সেই চেতনাও দিতে পারছি না। সাংগঠনিকভাবে তেমন কাজও হচ্ছে না। কাজেই স্মৃতিসৌধ হচ্ছে, এটা খুব খুশির খবর। বাচ্চারা শহীদ মিনার চিনল। এখন স্মৃতিসৌধের মাধ্যমে জানবে দেশ স্বাধীনের জন্য একটা যুদ্ধ হয়েছিল। সেদিক থেকে সারদেশ্বরী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ একটা অনুকরণীয় কাজ করেছে। এটা দেখেই হয়তো ভবিষ্যতে প্রতিটি স্কুলে স্মৃতিসৌধ নির্মিত হবে।’ সারদেশ্বরী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ৯ম শ্রেণির ছাত্রী মন্দিরা রায় বলে, ‘৩০ লক্ষ শহীদের বিনিময়ে আমাদের দেশ স্বাধীন হয়েছে। আমার বিদ্যালয়ে এক লাইনে স্মৃতিসৌধ, শহীদ মিনার হচ্ছে, এ জন্য আমি গর্বিত। প্রতিটি বিদ্যালয়ে এ রকম স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করা হলে শহীদদের প্রতি আমাদের ভক্তি ও কৃতজ্ঞতা বেড়ে যাবে। আমরা সবাই জানতে পারব কাদের জন্য আমরা বাংলা ভাষায় কথা বলছি, কাদের জন্য আমাদের দেশ স্বাধীন হয়েছে।’

যার চেতনা থেকে এই ধারণা এসেছে সেই শিক্ষক মোসাদ্দেক হোসেন বলেন, ‘শহীদ মিনার, স্মৃতিসৌধ, মানচিত্র—প্রতিটি অর্জনের পেছনে রয়েছে আন্দোলন, সংগ্রাম ও রক্ত দেওয়ার ইতিহাস। এক সাগর রক্তের বিনিময়ে আমাদের এই বাংলাদেশ। আমি বিষয়গুলোকে একসঙ্গে শিক্ষার্থীদের সামনে নিয়ে আসার বিষয়টি তুলে ধরলে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ আমার ধারণাটি গ্রহণ করে। এক সারিতে শহীদ মিনার, স্মৃতিসৌধ, মানচিত্র নির্মাণের অনুমোদন দেয়। নির্মাণাধীন এসব একজন প্রকৌশল বিদ্যালয়ের শুভাকাঙ্ক্ষী হিসেবে এসে দেখাশোনা করেন। আমি আনন্দিত, আমাদের বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা একসঙ্গে ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের বিষয়গুলো সরাসরি প্রত্যক্ষ করবে।’ জেলা প্রশাসনের একটি সূত্র জানায়, তারা বিষয়টিকে সুন্দর উদ্যোগ হিসেবে দেখছে।

জেলায় বিদ্যালয়গুলোর মধ্যে প্রথম বঙ্গবন্ধু কর্নার উদ্বোধন করে সারদেশ্বরী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়। জেলার প্রথম বেসরকারি এই বালিকা বিদ্যালয়ে রয়েছে শাপলা কর্নার, যেখান থেকে শিক্ষার্থীরা মাছসহ জলজ প্রাণির খাদ্য সম্পর্কে ধারণা পায়। বিদ্যালয়ের বিজ্ঞান ল্যাবে যেসব কার্যক্রম হয়, সে সম্পর্কে শিক্ষার্থীরা তাদের ইনবক্সে তথ্য পেয়ে যায় বিদ্যালয়ের ডিজিটাল ল্যাব ইনবক্স সাইটের মাধ্যমে। এই দুটিও দেশের বিদ্যালয়ে সম্ভবত প্রথম। এ ছাড়া তারা মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর করার চেষ্টা করছে।



সাতদিনের সেরা