kalerkantho

সোমবার । ১৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৮। ২৯ নভেম্বর ২০২১। ২৩ রবিউস সানি ১৪৪৩

অনুমোদন ছাড়াই কাটা হলো সাড়ে তিন শ গাছ

সিলেট অফিস   

২০ অক্টোবর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



অনুমোদন ছাড়াই কাটা হলো সাড়ে তিন শ গাছ

সিলেট নগরের উপশহর এলাকায় রাস্তা সম্প্রসারণ ও ড্রেন নির্মাণের নামে নির্বিচারে গাছ কাটছে সিলেট সিটি করপোরেশন। ছবি : কালের কণ্ঠ

সিলেট নগরের অভিজাত উপশহর এলাকার পুরোটাই ছিল সবুজের আচ্ছাদনে ঢাকা। তিন দশক আগে এই এলাকারই সড়কগুলোর দুই পাশে সারি সারি গাছ লাগিয়ে বৃক্ষরোপণে জাতীয় পুরস্কার পেয়েছিলেন বৃক্ষপ্রেমী আফতাব চৌধুরী। রাস্তা সম্প্রসারণের নামে সেখান থেকেই তিন দশকের পুরনো প্রায় সাড়ে ৩০০ গাছ কেটে ফেলেছে সিলেট সিটি করপোরেশন (সিসিক)। এলাকার মানুষ ও পরিবেশ অনুরাগীদের মধ্যে ব্যাপক বিস্ময় ও ক্ষোভের সঞ্চার করেছে বিষয়টি।

উপশহরের বিভিন্ন ব্লকে গাছ কাটা চলছিল প্রায় ১২ দিন ধরেই। তবে সোমবার রাতে একসঙ্গে প্রধান সড়কের অনেক কাছ কাটা হয়। এতে বিষয়টি নিয়ে সমালোচনা শুরু হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কথায়, বন বিভাগকে চিঠি দিয়ে মতামত পাওয়ার আগেই তাড়াহুড়া করে গাছ কেটে ফেলেছে সিসিক। এসব গাছের মূল্য আনুমানিক দুই কোটি টাকার কাছাকাছি।

স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সিটি করপোরেশন উপশহর এলাকার বিভিন্ন ব্লকের সড়কে গাছ কাটছিল বলে এত দিন বিষয়টি সেভাবে চোখে পড়েনি। কিন্তু সোমবার এক রাতেই প্রধান সড়কের আশপাশ থেকে বহু গাছ কেটে ফেলা হয়। গাছগুলোকে বড় বড় টুকরা করে রাস্তার পাশেই ফেলে রাখা হয়েছিল। কিছু গাছের ফালি ট্রাকে করে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

গাছ কাটার স্থানে কর্মরত সিটি করপোরেশনের কর্মচারী ও গুঁড়িবহনকারী ট্রাকচালকদের সঙ্গে কথা বললে তাঁরা জানান, দুই শর বেশি গাছ কাটা হয়েছে। তার মধ্যে ২১৭টি বড় আকারের পরিপক্ব গাছ। তবে উপশহরের বাসিন্দারা অভিযোগ করেছেন প্রায় সাড়ে ৩০০ গাছ কাটা হয়েছে। উপশহরের বাসিন্দা বৃক্ষপ্রেমী

আফতাব চৌধুরী কালের কণ্ঠের কাছে অভিযোগ করে বলেন, ‘সিটি  করপোরেশন উন্নয়নকাজের নামে উপশহর এলাকার অন্তত সাড়ে ৩০০ গাছ কেটে ফেলেছে। যেখানে দুটি গাছ কাটলে চলত, সেখানে তারা ১০ থেকে ১৫টি গাছ কেটেছে।’ নানাভাবে গাছ কাটা ঠেকানোর চেষ্টা করেছেন জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এত দিন তারা বিভিন্ন ব্লকে গাছ কেটেছে। শুরুর দিকে ‘এ’ ব্লকে শতাধিক গাছ কেটেছে। এরপর বি, সি ও ডি ব্লকে কমপক্ষে আরো ১৫০টি গাছ কেটেছে। গত রাতে মূল সড়কের অন্তত ১০০ গাছ কেটে ফেলেছে।’ সুবহানীঘাট হয়ে উপশহরের প্রবেশমুখ থেকে শিবগঞ্জ পর্যন্ত সড়কে নির্বিচারে গাছ কাটা হয়েছে বলে মন্তব্য করেন আফতাব চৌধুরী।

১৯৯০ সাল থেকে উপশহর এলাকার পথের দুই পাশে নিজ উদ্যোগে গাছ লাগানো শুরু করেন আফতাব চৌধুরী। গাছগুলো বড় হলে একসময় উপশহর এলাকা সবুজের বেষ্টনীতে ঢাকা পড়ে। এ কাজের জন্য ১৯৯৮ সালে তিনি বৃক্ষরোপণে জাতীয় পুরস্কার পান। নিজের হাতে লাগানো গাছগুলোকে নির্বিচারে কেটে ফেলায় খুবই মর্মাহত তিনি। কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি অসুস্থ বোধ করছি। বাসা থেকে বের হচ্ছি না।...যারা নির্দয়ভাবে গাছ কেটে অমার্জনীয় অপরাধ করেছে, তাদের বিচার চাই আমি।’

বন বিভাগের বিধি অনুযায়ী সরকারি জমি এমনকি বেসরকারি মালিকানার ভূমিতে গাছ কাটার আগে সংশ্লিষ্ট এলাকার বিভাগীয় বন কর্মকর্তার কাছে নির্ধারিত ফরমে আবেদন করতে হয়। যাচাই করে আবেদনের যৌক্তিকতা পাওয়া গেলে গাছের দরদাম নির্ধারণ এবং পরবর্তী সময়ে আরো গাছ লাগানোর শর্তে তা কাটার অনুমতি দেওয়া হয়।

বন বিভাগের সিলেট টাউন রেঞ্জার মো. শহীদুল্লাহ বিষয়টি জানিয়ে গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘উপশহরে রাস্তার দুই পাশে ড্রেন নির্মাণের জন্য গাছ কাটার প্রয়োজনীয়তা জানিয়ে ১৭ অক্টোবর বন বিভাগে চিঠি দিয়েছে সিটি করপোরেশন। আমাকে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এখনো গাছের মাপ নেওয়া শেষ হয়নি। আগামীকাল (আজ বুধবার) আবার আমরা যাব। এরপর মতামত জানাব।’

সিলেটের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা তৌফিকুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘সিটি করপোরেশন আমাদের কাছে উপশহরের প্রধান সড়কের উভয় পাশের বিদ্যমান গাছ কাটার জন্য অনুমোদন চেয়েছে। কিন্তু বিভিন্ন ব্লকের রাস্তার গাছ কাটার যে অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে, সে বিষয়ে তারা কোনো অনুমোদনই চায়নি।’ সাড়ে ৩০০ গাছ কাটার বিষয়ে বন কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা এক দিন তদন্ত করে ৩২টি গাছ পেয়েছি। ঠিক কতটি গাছ কাটা দরকার তা আগামীকাল জানা যাবে। কিন্তু তার আগে গাছ কেটে ফেলা তো উচিত হয়নি।’

আবেদন করে অনুমোদন পাওয়ার আগেই গাছ কাটা প্রসঙ্গে প্রশ্ন করলে সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী নূর আজিজুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা গাছ কাটার অনুমোদন চেয়ে বন বিভাগকে চিঠি দিয়েছি। কিন্তু ওই কাজের সঙ্গে যুক্ত লোকজন অতি উৎসাহী হয়ে অনুমোদনের আগেই কাটা শুরু করে দিয়েছে। এটি ঠিক হয়নি। আমাদের লোকজন ভুল করেছে। আমরা খোঁজখবর নিয়ে ব্যবস্থা নেব।’

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) সিলেটের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল করিম বলেন, ‘সিটি করপোরেশন উপশহরে যেভাবে নির্বিচারে গাছ কাটছে, তা অত্যন্ত নিন্দ্যনীয়।



সাতদিনের সেরা