kalerkantho

সোমবার । ১৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৮। ২৯ নভেম্বর ২০২১। ২৩ রবিউস সানি ১৪৪৩

২৭ বছর খেয়ার মাঝি সত্তরোর্ধ্ব তাসলিমা

সৈয়দ মেহেদী হাসান ডামুড্যা (শরীয়তপুর)    

২০ অক্টোবর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



২৭ বছর খেয়ার মাঝি সত্তরোর্ধ্ব তাসলিমা

শরীয়তপুরের গোসাইরহাটের সত্তরোর্ধ্ব তাসলিমার একমাত্র সম্বল এখন এই নৌকা। ছবি : কালের কণ্ঠ

সকাল থেকে সন্ধ্যা, রোদ কিংবা ঝড়, যা-ই হোক না কেন ছুটি নেই সত্তরোর্ধ্ব তাসলিমার। বয়সের দিকে তাকানোর সময় নেই। তাঁর কাছে বয়সের ভার সংসারের ভারের চেয়ে বড় নয়। কেননা নৌকা চালালে ঘরে রান্না হবে, তা না হলে তিনজনকে উপোস থাকতে হবে।

একসময় তাসলিমার স্বামীই নৌকা চালাতেন। তিনি অসুস্থ হয়ে পড়ার পর সেই নৌকার হাল ধরেন তাসলিমা, কিন্তু স্বামীকে বাঁচাতে পারেননি। আর তাঁরও বাঁচার একমাত্র সম্বল এখন এই নৌকা।

শরীয়তপুরের গোসাইরহাট উপজেলার কোদালপুর ইউনিয়নের জয়ন্তী নদীর মাছুয়াখালী-হাজীপাড়া খেয়াঘাটের মাঝি এই তাসলিমা। তিনি হাজীপাড়া গ্রামের প্রয়াত নাসির সরদারের স্ত্রী।

সম্প্রতি তাসলিমার খোঁজ পেয়ে খেয়াঘাটে গিয়ে শোনা গেল তাঁর জীবনসংগ্রামের কথা। তাসলিমা জানান, তাঁর স্বামী ১৯৯৪ সালে অসুস্থ হয়ে বিছানায় পড়েন। তখন নৌকার হাল ধরেন তিনি। সংসার চালানোর পাশাপাশি স্বামীর চিকিৎসা করিয়েছেন, কিন্তু স্বামীকে বাঁচাতে পারেননি। ১৯৯৭ সালে স্বামী মারা যান। তাঁদের তিন মেয়ে, এক ছেলে। ছেলে বিয়ে করে শ্বশুরবাড়ি থাকেন। তাঁর খোঁজ নেন না। দুই মেয়ের বিয়ে হয়েছে। এখন ছোট মেয়ে এবং বড় মেয়ের ঘরের নাতি মানছুরকে (৮) নিয়েই তাঁর সংসার।

কেন খেয়ার মাঝি হতে হলো তা বলতে গিয়ে তাসলিমা জানান, আগে জয়ন্তী নদীর মোহনা ছিল অনেক বড়। নদীতে তখন অনেক স্রোত ছিল। এর মধ্যেই তাঁর স্বামী মাঝিগিরি করতেন। তখন তিনি বিলে কৃষিকাজ করতেন। কিন্তু স্বামী অসুস্থ হওয়ায় কৃষিকাজের আয়ে সংসার চলছিল না। তাই এক মেয়েকে নিয়ে খেয়ার হাল ধরতে হয় তাঁকে।

তাসলিমার আক্ষেপ, দিন দিন নদী ছোট হচ্ছে। এতে রোজগারের পথও কমে আসছে। আগে প্রতিদিন কয়েক শ লোক এই নদী পার হতো। আর এখন দিনে এক শ থেকে দেড় শ লোক পার হয়। তারপর আবার এলাকার লোক সব বাকিতে পার হয়। বছর শেষে তারা ধান বা অন্য ফসল দেয়। এলাকার বাইরের যেসব লোক এই খেয়া দিয়ে যায় তাদের কাছ থেকে পাওয়া টাকাই মূলত তাঁর দিনের উপার্জন।

হাড়ভাঙা খাটুনির পরও ভাগ্যের পরিবর্তন না হওয়া নিয়ে তাসলিমা বলেন, ‘জীবন নদীর মতোই। নদীর পানি এদিক-সেদিক যায়, আমি আগের জাগায়ই।’ তবে এত কিছুর মধ্যেও নিজের যা আছে তা নিয়ে আবার সান্ত্বনা খোঁজেন তাসলিমা—‘বাড়তে দেড়-দুই কড়া (চার শতাংশের মতো) জমি আছে, ছোট্ট একটা ঘর। বৃষ্টিতে পানি পড়ে। তা-ও ভালো আছি।’

এই খেয়ার নিয়মিত যাত্রী নাজমুল হোসেন বলেন, ‘আমার বয়স হওয়ার পর থেকে তাঁকে দেখি এখানে নৌকা চালান। বয়স হয়েছে, এখনো চালান। কোদালপুরে প্রতি হাটবারে তিনি রাত ১১টা পর্যন্ত খেয়া বান।’

তাসলিমার জন্য কোনো সহায়তার ব্যবস্থা করা হয়েছে কি না, জানতে চাইলে কোদালপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এস এম মিজানুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘তাসলিমা মাছুয়াখালী খেয়াঘাটে নৌকা চালান। ছেলেটি থেকেও নেই। পরিষদ থেকে বয়স্ক ভাতার কার্ড দেওয়া হয়েছে। নৌকাঘাটের ইজারা নিই না আমরা, ফ্রি করে দিয়েছি।’



সাতদিনের সেরা