kalerkantho

সোমবার । ১৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৮। ২৯ নভেম্বর ২০২১। ২৩ রবিউস সানি ১৪৪৩

কালের কণ্ঠ-সাইটসেভার্স গোলটেবিলে বক্তারা

সব প্রতিবন্ধীকে জনশুমারির আওতায় আনতে হবে

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২০ অক্টোবর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



সব প্রতিবন্ধীকে জনশুমারির আওতায় আনতে হবে

রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপের সম্মেলনকক্ষে গতকাল কালের কণ্ঠ ও সাইটসেভার্স আয়োজিত ‘ষষ্ঠ জনশুমারি ও গৃহগণনায় (২০২১) প্রতিবন্ধী ব্যক্তির সংখ্যা নিরূপণ’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে অতিথিরা। ছবি : কালের কণ্ঠ

ষষ্ঠ জনশুমারি ও গৃহগণনা-২০২১-এর আওতায় দেশে ও বিদেশে বসবাসকারীসহ সব বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন (প্রতিবন্ধী) ব্যক্তিকে গণনায় আনতে হবে। একজনও প্রতিবন্ধী ব্যক্তি এই গণনা থেকে বাদ পড়ছে না—এটা নিশ্চিত করতে হবে। প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন ২০১৩ ও নীতিমালা ২০১৫ এবং প্রতিবন্ধকতাবিষয়ক জাতীয় কর্মপরিকল্পনার আলোকে পদক্ষেপ নিতে হবে, যেন দেশে ষষ্ঠ জনশুমারির মাধ্যমে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির প্রকৃত সংখ্যা এবং তাদের প্রতিবন্ধিতার সব ধরনের তথ্য বের হয়ে আসে।

গতকাল মঙ্গলবার বিকেল ৪টায় ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়ার (ইডাব্লিউএমজিএল) সম্মেলনকক্ষে কালের কণ্ঠ ও সাইটসেভার্সের উদ্যোগে আয়োজিত ‘ষষ্ঠ জনশুমারি ও গৃহগণনায় (২০২১) প্রতিবন্ধী ব্যক্তির সংখ্যা নিরূপণ’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা এসব কথা বলেন।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান বলেন, ‘সমাজের একটি বড় অংশ নানা কারণে প্রতিবন্ধিতায় ভুগছে। হয়তো আমরা তা পুরোপুরি নির্মূল করতে পারব না। আমাদের দায়িত্ব হবে এটা কমিয়ে আনা। প্রকল্পের উপপরিচালক আপনাদের সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনাগুলো শুনেছেন। তিনি ফিরে গিয়ে সে বিষয়গুলো নিয়ে কথা বললেন। আর প্রয়োজন হলে আমার সঙ্গে কথা বলবেন, আমি আছি। আমরা সবাই মিলে এই গণনার কাজটাকে আরো কিভাবে শাণিত করা যায় সে বিষয়ে কাজ করব। এটি একটি জাতীয় কাজ।’

মন্ত্রী বলেন, ‘আমি কিছুদিন আগে বলেছিলাম, এটিই আমাদের শেষ কাজ—পরবর্তী সময়ে আর যেন এভাবে করতে না হয়। এই যুগে এসে আমরা বাড়ি বাড়ি মাথা গুনছি। দেশ ডিজিটাল হয়েছে। আগামী দিনে যারা আসবে, প্রতি মুহূর্তে তারা তথ্য জানতে পারবে—এ ধরনের প্রযুক্তি আছে; আমাদের শুধু তা প্রয়োগ করতে হবে। তবে এবারের শুমারি আমাদের শেষ করতে হবে, যেহেতু আমরা এই কাজের মধ্যে আছি।’

ইডাব্লিউএমজিএল পরিচালক ও কথাসাহিত্যিক ইমদাদুল হক মিলন বলেন, ‘আমরা চাই পৃথিবীর অন্য দেশগুলোতে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা যে ধরনের সুযোগ-সুবিধা পায় পরিবার, রাষ্ট্র ও সমাজ থেকে—সেই সুবিধাগুলো যেন আমাদের প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা পায়। যদি তাদেরকে জনশুমারি ও গৃহগণনায় সম্পৃক্ত না করা হয়, তাহলে তো প্রথমেই প্রতিবন্ধীদের ব্যাপারে এক ধরনের উদাসীনতা অনুভব করি। সুতরাং প্রতিবন্ধীদের জন্য কী কী সুযোগ-সুবিধা আমরা চাই, সেগুলো এই বৈঠকে আলোচনার মধ্য দিয়ে সরকারের গোচরে আনতে চাই।’

শুভেচ্ছা বক্তব্যে কালের কণ্ঠের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক শাহেদ মুহাম্মদ আলী কালের কণ্ঠের আমন্ত্রণে অনুষ্ঠানটিতে উপস্থিত হওয়ায় পরিকল্পনামন্ত্রীসহ সব অতিথির প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ‘সঠিক তথ্য না থাকলে পরিকল্পনা ঠিক হয় না। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সংখ্যাটি জানা, সে অনুযায়ী চাহিদা নিরূপণ করা এবং পরিকল্পনা তৈরি করে তা বাস্তবায়ন করা—এটিই কাজের মূল জায়গা।’বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো জনশুমারি ও গৃহগণনা-২০২১ প্রকল্পের উপপরিচালক মো. আক্তার হোসেন বলেন, ‘আলোচনা থেকে আমি যতটুকু বুঝলাম, গণনা থেকে কোনোভাবে যেন প্রতিবন্ধীরা বাদ না যায়। এ জন্য তাদের যে ১২টি ক্যাটাগরি আছে, সে অনুযায়ী লিপিবদ্ধ করতে হবে। আমরা সে অনুযায়ী কাজ করছি। আমরা এবার পুরো জনশুমারি ডিজিটালি ট্যাবের মাধ্যমে করব। এতে একদিকে যেমন ডাটা অ্যানালিসিস করা সহজ হবে, অন্যদিকে তথ্য হারানোর সুযোগ নেই।’

তিনি আরো বলেন, ‘আমরা যে প্রশ্নপত্রটি তৈরি করেছি, সেখানে প্রতিবন্ধীর সংখ্যা শুধু নয়, তাদের কতজন চাকরিজীবী, তাদের বয়স কত এবং তাদের কতজন ইন্টারনেট ব্যবহার করে—সবই জানা যাবে। এসব তথ্য থেকে চাইলে প্রতিবন্ধীদের আলাদা ডাটাবেইসও করা সম্ভব।’ 

সমাজসেবা অধিদপ্তরের প্রতিবন্ধিতা শনাক্তকরণ জরিপ কর্মসূচির পরিচালক অদ্বৈত কুমার রায় বলেন, ‘আমরা ২০১১ সালে একটি জরিপ করি। তার আলোকে একটা নীতিমালা আমরা এক মাস আগে করতে পেরেছি। এই জরিপ অনুযায়ী, আজকের দিন পর্যন্ত ১২টি ক্যাটাগরিতে ২৩ লাখ ৮৩ হাজার জন প্রতিবন্ধীকে নিবন্ধিত করা আছে। চাইলে যে কেউ তথ্য নিতে পারবে, তবে তা মন্ত্রণালয়ের নীতিমালা অনুযায়ী। আমরা কাজ করছি। আমাদের সার্ভারে সর্বশেষ ২০-২১ অর্থবছরে চার লাখের ওপর ডাটা এন্ট্রি হয়েছে।’

ইন্টারন্যাশনাল ডিস-এবিলিটি অ্যালায়েন্সের ওপিডি এনগেজমেন্ট অফিসার ও আইনজীবী রেজাউল করিম সিদ্দিকী বলেন, ‘আমাদের জনশুমারিতে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ফল আসে। কখনো দেড় শতাংশ আসে তো কখনো ৯ শতাংশ আসে। এখানে ১৭ কোটি মানুষের দেশে ১ শতাংশের ব্যবধান মানে কয়েক লাখ মানুষ। অর্থাৎ যখন ৮ শতাংশ পার্থক্য হয়ে যাচ্ছে সরকারেরই দুটি বিভাগের মধ্যে, তখন ব্যবধানের অঙ্কটা কোটির কাছাকাছি চলে যায়। এই বড় ব্যবধানের মূল কারণ গণনার পদ্ধতির ধরন। আমরা কিভাবে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের খুঁজে বের করছি, সেই জায়গা থেকেই ব্যবধান তৈরি হচ্ছে। এ ছাড়া আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ; প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য যা কিছু করা হচ্ছে, তার সবই তাদের সঙ্গে আলোচনা করে করতে হবে। এ জন্য দেশব্যাপী প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের যেসব সংগঠন ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে, তাদের কাজে লাগাতে হবে।’

অ্যাকসেস বাংলাদেশ ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক আলবার্ট মোল্লা বলেন, ‘তথ্য সংগ্রহ খুব কঠিন ব্যাপার। যাঁরা তথ্য সংগ্রহে মাঠ পর্যায়ে কাজ করবেন, তাঁদের কাছেও পূর্ণ পরিকল্পনা থাকতে হবে। প্রতিবন্ধীদের ব্যাপারে যদি নির্ভুল তথ্য তুলে আনা না যায়, তাহলে সঠিক সংখ্যা আমরা পাব না।’

সিএসআইডির এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর খন্দকার জহিরুল আলম বলেন, ‘মাঠ পর্যায়ে কাজ করার সময় বড় বড় বাড়িতে ঢোকাই যায় না। ফলে সেসব বাড়ির যেগুেলোতে প্রতিবন্ধী মানুষ আছে, তাদের কোনো সংখ্যাই জানা যায় না। বাড়িতে ঢোকার সময় দারোয়ানরাই আটকে দেয়। এ নিয়ে মানুষের আরো সচেতনতা বাড়াতে হবে। আমাদের গণমাধ্যমেরও বড় ভূমিকা দরকার।’

বৈঠকে আরো বক্তব্য দেন সাইটসেভার্স বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর অমৃতা রেজিনা রোজারিও, ইউএনএফপিএ বাংলাদেশের পপুলেশন প্ল্যানিং অ্যান্ড রিসার্চের প্রধান মাহবুব-ই-আলম, লিওনার্ড চ্যাশায়ার বাংলাদেশের কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ জহির বিন সিদ্দিক, জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির সামাজিক নিরাপত্তা ও নীতি বাংলাদেশের প্রকল্প ব্যবস্থাপক আমিনুল আরিফিন, সাইটসেভার্স বাংলাদেশের অ্যাডভোকেসি কো-অর্ডিনেটর অয়ন দেবনাথ, ইনকুশন ওয়ার্কস প্রগ্রাম অফিসার উৎপল মল্লিক, এসডিএসএলের ট্রেজারার হাসিবা হাসান জয়া প্রমুখ।



সাতদিনের সেরা