kalerkantho

সোমবার । ১৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৮। ২৯ নভেম্বর ২০২১। ২৩ রবিউস সানি ১৪৪৩

দেশ সামাজিক সংক্রমণমুক্ত

তৌফিক মারুফ   

১৯ অক্টোবর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



দেশ সামাজিক সংক্রমণমুক্ত

টানা তিন সপ্তাহের বেশি সময় ধরে দেশে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগী শনাক্তের দৈনিক হার ৫ শতাংশের নিচে রয়েছে। এর মধ্যে দুই সপ্তাহের বেশি সময় অবস্থান করছে ৩ শতাংশের নিচে। আর ২ শতাংশেরও নিচে রয়েছে গত তিন দিন। নতুন রোগী শনাক্ত হারের এমন চিত্র পর্যালোচনা করে করোনা মোকাবেলায় বিভিন্ন পদক্ষেপের সঙ্গে যুক্ত বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে এখন করোনার বিস্তার আর সামাজিক সংক্রমণ (কমিউনিটি ট্রান্সমিশন) পর্যায়ে নেই। এই পর্যায়টিকে তাঁরা বলছেন, গুচ্ছ ও বিচ্ছিন্ন পর্যায়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সামাজিক সংক্রমণমুক্ত হলেও দেশ মহামারি থেকে বেরিয়ে আসার পর্যায়ে আসেনি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা অনুযায়ী, কোনো দেশ চাইলে এমন অবস্থায় সে দেশকে সামাজিক সংক্রমণমুক্ত ঘোষণা দিতে পারে।

তাঁরা আরো বলছেন, সামাজিক সংক্রমণ থেকে বেরিয়ে গেলেও অসাবধানতার কারণে যেকোনো সময় আবারও সংক্রমণ ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় রয়েছে, যেমন—যেসব এলাকায় টিকা নেওয়ার হার কম, সেখানে সব সময়ই আবার সংক্রমণ বিস্তারের ঝুঁকি বেশি। কত সময় পরে আবার সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়বে, সেটা

 নির্দিষ্ট করে বলা যায় না।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (পরিকল্পনা) অধ্যাপক ড. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সংক্রমণ প্রটোকল অনুসারে কয়েকটি জেলা বাদে দেশে এখন সামাজিক সংক্রমণ পরিস্থিতি নেই। ওই পর্যায়ে থেকে আমরা বেরিয়ে গেছি।’ তিনি যোগ করেন, ‘যেসব জায়গায় এখনো অপেক্ষাকৃত বেশি হারে শনাক্ত রয়েছে, সেদিকে আমাদের নজরদারিও বেশি রয়েছে।’

দেশে গত তিন সপ্তাহের সংক্রমণ পরিস্থিতির তথ্য-পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ধারাবাহিকভাবে করোনা সংক্রমণ, শনাক্ত, মৃত্যু ও সুস্থতা—সব সূচকেই উন্নতি হয়েছে। ২৫ সেপ্টম্বর থেকে ১ অক্টোবর পর্যন্ত দেশে মোট নমুনা পরীক্ষা হয়েছে এক লাখ ৫৯ হাজার ৩২টি। এর বিপরীতে রোগী শনাক্ত হয়েছে ছয় হাজার ৩৮৭ জন। এই সাত দিনে মারা গেছে ১৩৮ জন ও

 সুস্থ হয়েছে ছয় হাজার ৭৩৪ জন। এই সপ্তাহে গড় শনাক্ত হার ছিল ৪.০১ শতাংশ। পরের সপ্তাহে, অর্থাৎ ২ অক্টোবর থেকে ৯ অক্টোবর পর্যন্ত পরীক্ষা হয়েছে এক লাখ ৫৮ হাজার ৫৯৭টি নমুনা। এর বিপরীতে শনাক্তের সংখ্যা চার হাজার ৫৩১। মারা গেছে ১১৯ জন ও সুস্থ হয়েছে পাঁচ হাজার ৪৯২ জন। গড় শনাক্ত হার নেমে আসে ২.৮৫ শতাংশে। শেষ সপ্তাহে বা গত সাত দিনে পরীক্ষা হয়েছে এক লাখ ৪২ হাজার ৭২৬ নমুনা। বিপরীতে শনাক্ত হয়েছে তিন হাজার ১২৯ জন। মারা গেছে ৮০ জন ও সুস্থ হয়েছে চার হাজার ২৯ জন। শনাক্ত হার আরো কমে নেমেছে ২.১৯ শতাংশ। গত শনিবার থেকে সোমবার পর্যন্ত শনাক্ত হার যথাক্রমে ১.৮৮, ১.৭৪ ও ১.৮০ শতাংশ।

অন্যদিকে প্রতিদিনই ২৫-৩০টি জেলায় দৈনিক শনাক্ত সংখ্যা থাকছে শূন্যের ঘরে, ৫০টির বেশি জেলায় শনাক্ত থাকছে ১০ জনের নিচে। এ ছাড়া সারা দেশে হাসপাতালে এখন নির্ধারিত শয্যার ৮৮ শতাংশই খালি পড়ে আছে।

গত রবিবারের তথ্য অনুসারে, ওই দিন ২৯ জেলায় নতুন কোনো রোগী শনাক্ত হয়নি। এগুলোর মধ্যে ছিল ঢাকা বিভাগের কিশোরগঞ্জ, নরসিংদী, শরীয়তপুর ও রাজবাড়ী, ময়মনসিংহ বিভাগের ময়মনসিংহ ও শেরপুর; চট্টগ্রামের বান্দরবান, খাগড়াছড়ি, কুমিল্লা ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া; রাজশাহীর চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ ও সিরাজগঞ্জ; রংপুরের লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধা; খুলনার বাগেরহাট, চুয়াডাঙ্গা, কুষ্টিয়া, মাগুরা, মেহেরপুর ও নড়াইল, বরিশাল বিভাগের বরিশাল, ভোলা, বরগুনা ও ঝালকাঠি এবং সিলেটের সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজার।

সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) উপদেষ্টা ড. মুশতাক হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, এখনো দেশের কোনো কোনো এলাকায় বিচ্ছিন্নভাবে রোগী শনাক্তের হার ৫ শতাংশের ওপরে ও নিচে ওঠা-নামা করছে। সরকার চাইলে বর্তমান পরিস্থিতি অনুসারে নতুন করে মহামারি নিয়ে পরিকল্পনা সাজাতে পারে। কারণ অনেক দেশেই গণসংক্রমণ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর আবার তীব্র সংক্রমণ দেখা গেছে। ফলে সতর্ক থাকতেই হবে; সেটা রাষ্ট্রীয়, প্রাতিষ্ঠানিক কিংবা ব্যক্তিগত—সব পর্যায়ে।

আইইডিসিআরের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. এ এস এম আলমগীর কালের কণ্ঠকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া কিংবা যুক্তরাজ্যের যেখানে টিকা নেওয়ার প্রবণতা কম ছিল, সেখানেই আবার সংক্রমণ বেড়েছে। এসব দেশে স্কুলগুলো থেকে আবার সংক্রমণের বিস্তার ঘটেছে। বাংলাদেশ এখন সামাজিক সংক্রমণের পর্যায় থেকে বেরিয়ে এলেও সামনে আবার বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি প্রবলভাবেই আছে। মানুষের মধ্যে যে রকম উদাসীনতা দেখা যাচ্ছে তাতে সেই ঝুঁকি জোরালো হচ্ছে। তাই টিকাও যেমন দিতে হবে, তেমনি মাস্ক পরাসহ সব ধরনের স্বাস্থ্যবিধি মানতে হবে।

দেশে করোনা রোগীদের চিকিৎসার জন্য নির্ধারিত হাসপাতালগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ওই সব হাসপাতালে সব ধরনের শয্যা মিলে ২২ হাজার ২৯৩টি শয্যার মধ্যে এখন রোগী আছে দুই হাজার ৭০৬ জন বা ১২ শতাংশ। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনা অনুসারে বাকি শয্যা এখন অন্য রোগীদের জন্য ব্যবহার করা শুরু হয়েছে।



সাতদিনের সেরা