kalerkantho

রবিবার । ১৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৮। ২৮ নভেম্বর ২০২১। ২২ রবিউস সানি ১৪৪৩

নিম্নমানের চাল গছাতে মরিয়া সরবরাহকারী

জাহাজে আড়াই মাস পড়ে আছে ১৬ হাজার টন চাল খাদ্য বিভাগের নিতে অস্বীকৃতি

আসিফ সিদ্দিকী, চট্টগ্রাম   

১৭ অক্টোবর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



নিম্নমানের চাল গছাতে মরিয়া সরবরাহকারী

ল্যাব পরীক্ষায় ‘নিম্নমান’ নিশ্চিত হওয়ার পর ভারত থেকে আসা চালের একটি চালান নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে খাদ্য বিভাগ। চিঠি দিয়ে বিষয়টি জানিয়েও দেওয়া হয়েছে ভারতীয় সরবরাহকারীকে। এর পরও সেই চাল সরকারি গুদামে পাঠাতে মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছে সরবরাহকারী, খুঁজছে ভিন্ন কৌশল। এরই অংশ হিসেবে সরকারের জন্য আনা চালবোঝাই জাহাজটি আড়াই মাস ধরে বহির্নোঙরে বসিয়ে রাখা হয়েছে।

বিষয়টি স্বীকার করে এমভি ড্রাগন জাহাজের দেশীয় শিপিং এজেন্ট ট্রাইটন শিপিংয়ের মালিক লিটন চক্রবর্তী বলেন, ‘মান নিয়ে সমস্যা ধরা পড়ার পর থেকেই জাহাজটি জেটি থেকে বহির্নোঙরে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। এর পর থেকে আড়াই মাস ধরে জাহাজটি সাগরে বসে আছে। অথচ একটি জাহাজ সাগরে বসে থাকার জন্য লাখ লাখ টাকা আর্থিক ক্ষতি গুনতে হচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘জাহাজে থাকা সব চালের মান খারাপ নয়। ভালো চালগুলো নেওয়ার জন্য ভারতীয় সরবরাহকারীরা নতুন করে খাদ্য বিভাগে আপিল করেছে। সেটাও প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। এখন নতুন করে আদালতে মামলা করে সেগুলো ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে বলে জানি।’

এই চাল সরকারকে দেবেন, নাকি বাইরে বিক্রি করবেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি শিপিং এজেন্ট, এই কাজটি করছে সরবরাহকারী নিজে। ফলে এর বেশি কিছু জানি না।’

অভিযোগ উঠেছে, সেই সরবরাহকারী মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাকে ম্যানেজ করে নামমাত্র কিছু চাল জাহাজ থেকে বাদ দিয়ে বাকি চাল সরকারি গুদামে গছাতে চাইছে। এ কারণে গত ৮ আগস্ট এমভি ড্রাগন জাহাজটি বন্দর জেটি থেকে বহির্নোঙরে চলে গেলেও ভারতে ফেরত যায়নি। অথচ জাহাজভাড়া বাবদ তাদের দিনে দুই লাখ টাকা করে ক্ষতি হচ্ছে। এর পরও বিষয়টি প্রেস্টিজ ইস্যু হিসেবে নিয়েছে সরবরাহকারী। কারণ চাল ফেরত যাওয়া মানে ভাবমূর্তির সংকট। এ জন্য জাহাজের আর্থিক ক্ষতি হলেও যেকোনোভাবে চাল গ্রহণে রাজি করাতে চায় সরবরাহকারী।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সরকারিভাবে (জিটুজি) ভারত থেকে একাধিক সরবরাহকারী চাল সরবরাহ দিচ্ছে। এর মধ্যে ভারতীয় সরবরাহকারী ন্যাশনাল অ্যাগ্রিকালচারাল কো-অপারেটিভ মার্কেটিং ফেডারেশন অব ইন্ডিয়া লিমিটেড (নাফেদ) ৫০ হাজার টন সিদ্ধ চাল সরবরাহের চুক্তি করে। নাফেদ থেকে প্রথম চালানে কনটেইনারে করে ৫৩৪ টন চাল চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছায়। দ্বিতীয় চালানে ভারতের বিশাখাপত্তনম বন্দর থেকে এমভি ড্রাগন জাহাজে করে ১৯ হাজার ২০০ টন চাল চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে পৌঁছায় ২২ জুলাই। জাহাজ থেকে নমুনা সংগ্রহ করে সরকারি খাদ্য বিভাগের ল্যাবে পাঠানো হয়। প্রতিবেদন আসার পরই চট্টগ্রাম বন্দরের ১ নম্বর জেটিতে ভিড়িয়ে জাহাজ থেকে চাল খালাস শুরু হয়। এরই মধ্যে তিন হাজার ২৮৯ টন চাল ছাড় নিয়ে উপজেলা পর্যায়ে বিভিন্ন সরকারি গুদামে পাঠানোর পর দেখা যায় সেখানে নিম্নমানের চাল আছে। পরে বিষয়টি নিয়ে হৈচৈ শুরু হলে ঢাকা থেকে খাদ্য বিভাগের দল এসে জাহাজের সব কটি হ্যাজ (ঢাকনা) ওপরে-নিচে থেকে নতুন করে নমুনা সংগ্রহ করে ল্যাবে পাঠায়। প্রতিবেদনে ‘নিম্নমান’ আসার পর সেই চাল নিতে অস্বীকৃতি জানায় খাদ্য বিভাগ। বিষয়টি ভারতীয় সরবরাহকারী নাফেদকে জানিয়েও দেওয়া হয়। এরই মধ্যে ৮ আগস্ট জাহাজটি চট্টগ্রাম বন্দর জেটি থেকে বহির্নোঙরে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। জাহাজটি ১৫ হাজার টনের কিছু বেশি চাল নিয়ে গতকাল শনিবারও সেখানে অলস বসে আছে।

এ ব্যাপারে চট্টগ্রাম খাদ্য বিভাগের চলাচল সংরক্ষণ পরিবহন নিয়ন্ত্রক আ ন ম শফিউল হক বলেন, ‘এক লাখ টন সিদ্ধ চাল সরবরাহ চুক্তির মধ্যে চট্টগ্রামে ৩০ হাজার টন চাল নামানোর শিডিউল ছিল। এর মধ্যে দুটি চালানে তিন হাজার ৮২৩ টন চাল আমরা নিয়েছি। এর সব চাল ভালো মানের ছিল। সর্বশেষ ল্যাব প্রতিবেদনে মান খারাপ আসার পর থেকেই আমরা এমভি ড্রাগন জাহাজ থেকে আর কোনো চাল নিইনি। সেই জাহাজটি এখন বহির্নোঙরে আছে। এখন তারা জাহাজ ফেরত নেবে, নাকি সাগরে বসিয়ে রাখবে, সেটি তাদের বিষয়।’

জাহাজে থাকা চালের মধ্যে ভালো চাল গ্রহণের সরবরাহকারীর আবেদনের বিষয়ে আ ন ম শফিউল হক বলেন, ‘খাদ্য মন্ত্রণালয় এরই মধ্যে সেই চাল গ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত দিয়েছে। ছাড়পত্রও দিয়েছে। ফলে জাহাজটির চলে যেতে কোনো বাধা নেই। এখন সেই চাল কৌশল করে গছানোরও কোনো সুযোগ নেই।’

খাদ্য বিভাগ বলছে, ভারতীয় সরবরাহকারী নাফেদ আরো ৫০ হাজার টন আতপ চাল সরবরাহের চুক্তি করে সরকারের খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে। সেই চালানের মধ্যে ১৪ হাজার ৫২৬ টন চাল আমরা গ্রহণ করেছি। সেই চালানের চাল ভালো ছিল বলেও জানান আ ন ম শফিউল হক।

উল্লেখ্য, ১ জুলাই থেকে ১৩ অক্টোবর পর্যন্ত পাঁচ লাখ ৬৮ হাজার টন চাল সরকারি-বেসরকারিভাবে আমদানি হয়েছে। সরকারি গুদামে ১৩ অক্টোবর পর্যন্ত ১৫ লাখ ৪২ হাজার টন খাদ্যশস্য মজুদ আছে। এর মধ্যে চাল আছে ১৪ লাখ ১৮ হাজার টন।



সাতদিনের সেরা