kalerkantho

বুধবার । ১১ কার্তিক ১৪২৮। ২৭ অক্টোবর ২০২১। ১৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

ওড়ার অপেক্ষায় পায়রা!

সেতুই বাঁচাবে নিজেকে

রফিকুল ইসলাম, বরিশাল   

১৪ অক্টোবর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



সেতুই বাঁচাবে নিজেকে

বরিশাল-কুয়াকাটা সড়কের লেবুখালীর পায়রা নদীতে নির্মিত পায়রা সেতু। ছবি : সংগ্রহ

ভারী যানবাহন আটকে দেবে। পূর্বাভাস দেবে ভূমিকম্প, বজ্রপাতসহ নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগের। আর এই আগাম তথ্য দেবে সেতু নিজেই। তাতে আগেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারবে কর্তৃপক্ষ।

পদ্মা সেতুর পিলারে একের পর এক ফেরির আঘাতের ঘটনার মধ্যে এমন সেতুর কথা চমকে দেওয়ার মতো। হ্যাঁ, বিদেশে নয়, দেশেই হয়েছে এমন এক সেতু। দেশে প্রথমবারের মতো পায়রা সেতুতে ব্যবহার করা হয়েছে ‘হেলথ মনিটরিং সিস্টেম’। এটি দেশের দ্বিতীয় সেতু, যা এক্সট্রা ডোজ কেবল সিস্টেমে তৈরি। অচিরেই ‘পাখা’ মেলবে চার লেনের ‘পায়রা’। দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের জন্য এই সেতু আসলে উড়াল দিয়ে গন্তব্যে পৌঁছার মতোই।

৩৯ কিলোমিটার বরিশাল-পটুয়াখালী-কুয়াকাটা মহাসড়কে বিচ্ছেদ ঘটিয়েছিল পায়রা নদী। সেই নদীর ওপর এক হাজার ১৭০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত পায়রা সেতু। এর দৈর্ঘ্য এক হাজার ৪৭০ মিটার, প্রস্থ ১৯.৭৬ মিটার। কুয়েত ফান্ড ফর আরব ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট, ওপেক ফান্ড ফর ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট এবং বাংলাদেশ সরকারের যৌথ বিনিয়োগে হয়েছে এই সেতু। ২০১৬ সালে সড়ক ও জনপথ বিভাগ পায়রা সেতুর নির্মাণকাজ শুরু করে। সেতুটি নির্মাণ করেছে চীনের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান লনজিয়ান রোড অ্যান্ড ব্রিজ কনস্ট্রাকশন।

নৌযানের ধাক্কা থেকে রক্ষা : সম্প্রতি পদ্মা সেতুর পিলারের সঙ্গে বারবার ফেরির ধাক্কা লাগার বিষয়টি সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে ভাবিয়ে তোলে। তবে বিষয়টি মাথায় রেখে পায়রা সেতুর দুটি পিলারে আগেই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এ জন্য পিলারের পাশে স্টিলের কাঠামো দিয়ে প্রতিরক্ষাব্যূহ তৈরি করা হয়েছে।

আধুনিক প্রযুক্তি ও নান্দনিক নকশা : সেতুর লেবুখালী প্রান্তে বসানো হয়েছে টোল ঘর। সেখানে থাকবে বিশ্বমানের প্রযুক্তি। সেখানকার মনিটরে ভেসে উঠবে সেতুর সম্ভাব্য ঝুঁকি। তা দেখে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে পারবে কর্তৃপক্ষ।

চট্টগ্রামের তৃতীয় কর্ণফুলী সেতুর আদলে নান্দনিক নকশায় সেতুটি নির্মাণ করা হয়েছে। সেতুর দুই পাশ এক্সট্রা ডোজ কেবল দিয়ে সংযুক্ত করায় নদী অংশে মাত্র একটি পিলার ব্যবহার করা হয়েছে। পায়রা নদীর মূল অংশে ৬৩০ মিটার বক্স গার্ডার চারটি স্প্যানের ওপর এটি নির্মিত হয়েছে। নৌযান চলাচলের জন্য মূল অংশে ২০০ মিটার করে দুটি স্প্যানে ১৮.৩০ মিটার ভার্টিক্যাল ক্লিয়ারেন্স রাখা হয়েছে।

সেতু কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নদীর তলদেশে বসানো হয়েছে ১৩০ মিটার দীর্ঘ পাইল, যা দেশে সর্ববৃহৎ। ৩২টি স্প্যানের মূল সেতুটি বিভিন্ন মাপের ৫৫টি টেস্ট পাইলসহ ১০টি পিয়ার, পাইল ও পিয়ার ক্যাপের ওপর নির্মিত হয়েছে। এ ছাড়া ১৬৭টি বক্স গার্ডার সেগমেন্ট রয়েছে এটিতে। ফলে দূর থেকে সেতুটিকে মনে হবে ঝুলে আছে। এ ছাড়া জোয়ারের সময় নদী থেকে সেতুটি ১৮.৩০ মিটার উঁচুতে থাকবে। চার লেনের সেতুটির উভয় প্রান্তে মোট এক হাজার ২৬৮ মিটার সংযোগ সড়ক নির্মাণ করা হয়েছে। টোল প্লাজা, প্রশাসনিক ভবন, ইলেকট্রিফিকেশনও শেষ হয়েছে। পায়রা সেতুর প্রকল্প পরিচালক মো. আব্দুল হালিম জানান, সেতুটির কিছু শৈল্পিক বিশেষত্ব আছে; যেমন—পায়রা সেতুটি বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় স্প্যানবিশিষ্ট সেতু, যার দৈর্ঘ্য ২০০ মিটার। পদ্মা সেতুতে ১২০ মিটার পাইল করা হলেও পায়রা সেতুতে ১৩০ মিটার পাইল করা হয়েছে। তিনি বলেন, এটি বাংলাদেশের দ্বিতীয় সেতু, যা এক্সট্রা ডোজ কেবেল সিস্টেমে তৈরি করা হয়েছে। নদীর মাঝখানে একটি এবং দুই পারে দুটি পিলারের ওপর মূল সেতুটি দাঁড়িয়ে আছে।

দূর থেকে কাছে : একটা সময় ছিল, বরিশাল থেকেই সড়কপথে কুয়াকাটা যেতে সময় লাগত ৯-১০ ঘণ্টা। তখন কীর্তনখোলা আর পায়রাসহ বরিশাল-পটুয়াখালীর ছয়টি নদী পার হয়ে পৌঁছতে হতো কুয়াকাটায়। তখন সূর্যোদয়ের সময় বরিশাল থেকে রওনা হয়ে কুয়াকাটায় গিয়ে সূর্যাস্ত দেখা কঠিন হয়ে পড়ত। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এর আগে ছয়টি নদীর মধ্যে পাঁচটিতেই সেতু হয়েছে। বাকি থাকা পায়রা নদীর ওপরও দাঁড়িয়েছে গর্বের সেতু।

এ সেতুর উদ্বোধন হলেই বরিশাল থেকে সড়কপথে কুয়াকাটা সৈকতে পৌঁছা যাবে মাত্র দুই ঘণ্টায়। আর রাজধানী ঢাকা থেকে লাগবে বড়জোর সাত থেকে আট ঘণ্টা। সেতুটি চালু হলে সময়ের এ হিসাব এক ধাক্কায় কমে দাঁড়াবে পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টায়। তাইতো পদ্মার পাশাপাশি পায়রা সেতু ঘিরে এখন আগ্রহ দক্ষিণাঞ্চলবাসীর। এ মাসেই উদ্বোধনের পর যানবাহন চলাচলের জন্য সেতুটি খুলে দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা।

অর্থনৈতিক মুক্তির আশা : ‘শস্যভাণ্ডার এখন ভাঙা কুলা’—বঞ্চনার কারণে বরিশাল নিয়ে কটাক্ষ করে অনেকে বলতেন এই কথা। তবে পায়রা ও পদ্মা সেতু চালু হলে ঘুচে যাবে সেই বঞ্চনা। দক্ষিণে গড়ে উঠবে নানা শিল্প। তাই পায়রা সেতু ঘিরে এখন দক্ষিণাঞ্চলবাসীর মুক্তির স্বপ্ন। যেন পায়রার বুকে জমা ব্যথার স্থান নেবে উল্লাস।



সাতদিনের সেরা