kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৩ মাঘ ১৪২৮। ২৭ জানুয়ারি ২০২২। ২৩ জমাদিউস সানি ১৪৪৩

হাটে মেলে ঢাকি

শফিক আদনান, কিশোরগঞ্জ   

১২ অক্টোবর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



হাটে মেলে ঢাকি

কিশোরগঞ্জের কটিয়াদীর পুরানবাজারে ঢাক বাজাচ্ছেন ঢাকিরা। ছবি : কালের কণ্ঠ

বাদকরা একে অপরের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাজিয়ে চলেছেন ঢাক, ঢোল, ড্রাম, করতাল, খঞ্জনা, সানাই, কর্নেট, কাঁশি, মঞ্জরি, ঝনঝনি ও বাঁশি। তাঁদের লক্ষ্য, দূর-দূরান্ত থেকে আসা বায়নাকারীদের মন জয়। যিনি যত বেশি ভালো বাজাতে পারেন, তাঁর চাহিদাও তত বেশি, তাঁর বায়নাও হয় বেশি। পারিশ্রমিক নিয়ে বনিবনা হলে ঢাকির দল বায়নাকারীর সঙ্গে ছোটে পূজামণ্ডপে।

বিজ্ঞাপন

সেখানে তাদের বাদ্য বাজবে বিজয়া দশমী পর্যন্ত। মহাষষ্ঠী থেকে বিসর্জন—ঢাকে কাঠি না পড়লে পূজার আমেজ কি আসে?

সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজা উপলক্ষে প্রতিবছরের মতো কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী শহরের পুরানবাজারে এবারও বসে দেশের সবচেয়ে বড় ঢাকের হাট। ঐতিহ্যবাহী এই হাটটি বসে দুর্গাপূজার পঞ্চমী ও ষষ্ঠীর দিনে।

গত রবিবার দুপুরে সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, বাদ্যযন্ত্রের বোল-তাল আর সুরের মূর্ছনায় মুখরিত হয়ে উঠেছে কটিয়াদীর পুরানবাজার। বাদ্যের তালে তালে চলছে সুরেলা লড়াই। আর পূজা আয়োজকরা যাচাই করে দেখছেন, সঙ্গে চলছে দরদামও। সব মিলিয়ে বাজারে এক অন্য রকম আবহ। শুধু সনাতন ধর্মাবলম্বীরা নয়, অন্য ধর্মের লোকজনও ভিড় করে ঢাকের হাটে। তাদের কাছে এটি শুধু হাট নয়, হয়ে গেছে সংস্কৃতির অংশও।  

কটিয়াদী হিন্দু বৌদ্ধা খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সভাপতি বেণী মাধব ঘোষ জানান, এ হাটের ইতিহাস অন্তত ৫০০ বছরের পুরনো। সামন্ত রাজা নবরঙ্গ রায় তাঁর প্রাসাদে পূজার আয়োজনের জন্য সেরা ঢাকির খোঁজ করতে গিয়ে বিক্রমপুর পরগনার প্রসিদ্ধ সব ঢাকিকে আমন্ত্রণ জানান। তারপর সবার বাজনা শুনে বেছে নেন সেরা দলটিকে। সেই থেকে ঢাকের হাটের শুরু। স্বাধীনতার পর থেকে পুরানবাজারে এই হাটের তত্ত্বাবধান করছে উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ।

কটিয়াদীর পাট ব্যবসায়ী প্রশান্ত সাহা জানান, ব্যতিক্রমী হাটটি তাঁদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির অংশ হয়ে গেছে। পূজার চেয়ে দুটি ঢাকের হাটে আনন্দ বিনোদন কম হয় না। নাম ঢাকের হাট হলেও এখানে কোনো বাদ্যযন্ত্র বেচাকেনা হয় না। যাঁরা এসব বাজান, সেই ঢাকিরা অর্থমূল্যের বিনিময়ে পূজা আয়োজকদের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হন। পরে তাঁরাই বাদ্যের তালে তালে মাতিয়ে রাখেন পূজামণ্ডপগুলো। কোন দলের চুক্তিমূল্য কত হবে, তা নির্ধারিত হয় ঢাকিদের দক্ষতার ওপর।

নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার থেকে তিনজনের একটি বাদকদলের নেতা হয়ে হাটে আসেন কৃষ্ণ চন্দ্র দাস। তিনি জানান, গত বছর করোনার কারণে পূজার আড়ম্বর ছিল না। তাই তাঁদের চাহিদাও কম ছিল। এবার পূজার আয়োজন বেশি। এ কারণে তাঁদের চাহিদা বেড়েছে। আয়োজকরা ৩০ হাজার টাকা দরদাম করছেন, তাঁরা ৪০ হাজার পেলে যাবেন বলে জানালেন।

মুন্সীগঞ্জ থেকে প্রতিবন্ধী প্রাণ বল্লভ ঢাক-ঢোলের একটি দলের সঙ্গে এসেছেন। তিনি জানান, এটি তাঁর পেশা না। তবে বাড়তি আয়ের জন্য চলে এসেছেন। কটিয়াদীর মুমুরদিয়ার গিয়াস উদ্দিন মুসলিম সম্প্রদায়ের লোক হলেও ঢাক বাজাতে সিদ্ধহস্ত। তাঁর আরেকটি যোগ্যতা হচ্ছে, তিনি ঢাকের তালে তালে খুব সুন্দরভাবে নাচতে পাড়েন। তাই তাঁর চাহিদাও একটু বেশি। তাঁর আবার কোনো দল নেই। একাই ঢাক-ঢোল বাজান। তিনি জানান, হাটে যেতে না যেতেই তাঁকে চুক্তিবদ্ধ করে ফেলেছে স্থানীয় এক পূজা আয়োজক।

কটিয়াদীর পশ্চিমপাড়ায় দুর্গাপূজার আয়োজন করেছেন ব্যবসায়ী নিতাই সাহা। তিনি জানান, ঐতিহ্যবাহী হাট থেকে তাঁরা প্রতিবছর ঢাক-ঢোল নিয়ে যান। হাটে গিয়ে বিভিন্ন বাদকদলের বাজনা শুনে পছন্দ ও সামর্থ্যের মধ্যে একটি দলের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হন তাঁরা। এবার ৩০ হাজার টাকায় তিনজনের একটি বাদকদলের সঙ্গে কথা পাকা করে ফেলেছেন তিনি।

স্থানীয় লোকজন জানায়, মুন্সীগঞ্জ, ঢাকার নবাবগঞ্জ, কেরানীগঞ্জ, গাজীপুর, নরসিংদীসহ দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে বাদ্যযন্ত্র নিয়ে এ হাটে হাজির হয়েছে অসংখ্য বাদকদল। বর্তমানে বাদকদলগুলোতে ঐতিহ্যবাহী বাদ্যের পাশাপাশি যুক্ত হয়েছে আধুনিক বাদ্যও।  

হাটে আসা বাদকদলের থাকা-খাওয়া, নিরাপত্তাসহ যাবতীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করে স্থানীয় পূজা উদযাপন পরিষদ ও প্রশাসন। তবে এ হাটের জন্য অবকাঠামোগত উন্নয়নের প্রয়োজন আছে বলেও মনে করছে অনেকে। তারা বলছে, সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো হলে আরো জমজমাট হবে এ হাট।



সাতদিনের সেরা