kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৩ মাঘ ১৪২৮। ২৭ জানুয়ারি ২০২২। ২৩ জমাদিউস সানি ১৪৪৩

ডাকাতির সোনা বার বানিয়ে পাচার

► অলংকারে রূপান্তরিত হয়ে ফেরে সেসব বার
► দুই বড় ডাকাতির তদন্তে তাঁতীবাজারের পাঁচজনের ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তি
► তাঁতীবাজারের কিছু অসাধু ব্যবসায়ীর যোগসাজশ

এস এম আজাদ   

১২ অক্টোবর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



ডাকাতির সোনা বার বানিয়ে পাচার

দেশের নদীতীরের বাজারসহ রাজধানীর সোনার দোকানে ডাকাতি করে লুট করা স্বর্ণালংকার তাঁতীবাজারে নিয়ে গলিয়ে বার বানায় চক্রের সদস্যরা। এই চক্রের সঙ্গে কিছু অসাধু সোনা ব্যবসায়ী জড়িত। তাঁরা সোনা গলিয়ে বারে ‘বাংলা গোল্ড’ লেবেল লাগিয়ে ভারতে পাচারকারী চক্রের কাছে বিক্রি করে। এই বার থেকে স্বর্ণালংকার তৈরি হয়ে আবার অবৈধ পথে দেশে আসে।

বিজ্ঞাপন

গত ৬ সেপ্টেম্বর রাতে আশুলিয়ার বংশী নদীর তীরে নয়ারহাটে ১৯টি সোনার দোকান থেকে ১২৬ ভরি সোনা লুট এবং গত ৭ ফেব্রুয়ারি রাতে ধানমণ্ডির রাপা প্লাজার রাজলক্ষ্মী জুয়েলার্সের প্রায় ২০০ ভরি সোনা লুটের ঘটনা তদন্তে এই তথ্য পেয়েছে সিআইডি। দুই মামলায় সবুজ রায় ও আব্দুর রহিম নামের দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যাঁরা ডাকাতির সোনা গলিয়ে বিক্রি করেন। পরে সুমন মিয়া নামের এক সোনা ব্যবসায়ী এবং কারিগর ইসমাইল ও মিজানুর রহমানকে গ্রেপ্তার করে সিআইডি। নয়াবাজার এলাকার রহিমের বাসা থেকে আশুলিয়ায় লুট হওয়া ২০ ভরি সোনা এবং সবুজের বাসা থেকে রাপা প্লাজায় লুট হওয়া ১২ ভরি সোনা উদ্ধার করা হয়েছে। তাঁরা পাঁচজনই আদালতে দণ্ডবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।

সিআইডির তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, সারা দেশে লুট হওয়া সোনাগুলো বার বানিয়ে পাচারের সঙ্গে ডাকাতির একটি আলাদা গ্রুপ জড়িত। তারা সোনা সংগ্রহ করে পরবর্তী কারবার করে। তাঁতীবাজারের চারটি প্রতিষ্ঠানসহ আরো তিন-চারজনের নাম তদন্তে এসেছে। তাদের গ্রেপ্তারের জন্য নজরদারি করা হচ্ছে। চাঞ্চল্যকর দুই ঘটনায় স্পিডবোট নিয়ে ডাকাতি করা দলের প্রধান সোহরাব হোসেনসহ ১৪ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁতীবাজারের পাঁচজনসহ ১০ জন এরই মধ্যে আদালতে স্বীকারোক্তি দিয়েছেন।

তাঁতীবাজারের ব্যবসায়ী নেতারা বলছেন, কিছু ব্যক্তি নিজস্ব সোনা বলে ছোট আকারের বার বানিয়ে অবৈধ কর্মকাণ্ড করছেন। এর পুরো দায়ভার পড়ছে সব ব্যবসায়ীর ওপর। কোনো রসিদ ছাড়া এসব সোনা বেচাকেনা হয়।

সিআইডির অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক (অ্যাডিশনাল ডিআইজি) ইমাম হোসেন বলেন, ‘ডাকাতির সোনার বারগুলো তাঁতীবাজারে বানানোর পর পাচার করা এবং ওই বার দিয়ে ফের অলংকার বানানোর তথ্য আমরা পেয়েছি। ৩০ ভরি ওজনের বার দিলে কারবারিরা ২০ ভরি গহনা দেয়। এভাবে অবৈধ সোনা বৈধ বাজারে চালানোর চেষ্টা করছে চক্রটি। সরাসরি তারা ডাকাতদের কাছ থেকে সোনা নেয়। এরপর তাঁতীবাজারের কয়েকজন ব্যবসায়ী ও কারিগরের সহায়তায় পাচারকারীদের হাতে যায়। ’

সিআইডির সূত্র জানায়, ১৫ সেপ্টেম্বর শাহানা আক্তার নামে এক ডাকাতের স্ত্রীকে সোনা বিক্রির দুই লাখ ৪৪ হাজার ৮৪০ টাকা এবং আনুমানিক চার ভরি সোনাসহ গ্রেপ্তার করা হয়। পরে দেশের বিভিন্ন জায়গায় অভিযান চালিয়ে সোহরাব হোসেন, আনোয়ার হাওলাদার, দেলোয়ার হোসেন খলিফা, আব্দুর রহিম, আল মিরাজ ওরফে মিন্টু, কামাল খান, সাগর, সবুজ রায়, সুমন, শাহিন, দানিস, ইসমাইল ও মিজানুরকে গ্রেপ্তার করা হয়। মাওয়া থেকে স্পিডবোট নিয়ে ২০ জনের ডাকাতদল আশুলিয়ায় হানা দেয়। রাজধানীর নয়াবাজারে রহিমের বাসা থেকে আশুলিয়ায় লুট হওয়া ২০ ভরি সোনা উদ্ধার করা হয়। একই এলাকায় সবুজের বাসা থেকে রাপা প্লাজায় লুট হওয়া ১২ ভরি সোনা উদ্ধার করে সিআইডি। দুজন আদালতে দেওয়া ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে তাঁতীবাজারের নিউ খাজা করপোরেশন, রাজিয়া বুলিয়ান স্টোর, মোরসালিন জুয়েলার্স ও নক্ষত্র মার্কেটের সুমন বুলিয়ান স্টোরের নাম উঠে এসেছে।

সূত্র জানায়, সবুজ ও রহিম ডাকাতির সোনা এনে তাঁতীবাজারের মোড়ের নিউ খাজা করপোরেশনে ভাঙিয়েছেন। অল্প অল্প করে তাঁরা সোনা ও রুপা গলিয়ে বার বানান। পাশের মোরসালিন জুয়েলার্সের জালালের কাছে সেই সোনা ৩০ হাজার টাকা ভরি দরে বিক্রি করেন তাঁরা। জালাল আবার তা রাজিয়া স্টোরের সুমন পোদ্দারের কাছে ৪১ হাজার টাকা ভরি দরে বিক্রি করেন। সেই সোনা নক্ষত্র মার্কেটের সুমন বুলিয়ানের সুমন ৪২ হাজার ৮০০ টাকা দরে কিনে নেন। এরপর কিছু কারবারির কাছে তিনি বিক্রি করেন। সূত্র মতে, বার বানাতে সোনায় দুটি লেবেল লাগানো হয়। এর একটি বাংলা গোল্ড, অন্যটি ঢাকা গোল্ড। তাঁতীবাজার থেকে বাংলা গোল্ড  লেবেল দেওয়া হয়। পাঁচজনকে গ্রেপ্তারের পর নাম আসা কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা গাঢাকা দিয়েছেন।

তাঁতীবাজারের পোদ্দার সমিতির সহসাধারণ সম্পাদক দেবব্রত ঘোষ গগন বলেন, ‘ব্যক্তিগতভাবে কিছু লোক গহনা ভাঙিয়ে বার বানায়। তখন কেনার রসিদ না থাকলে তাদের জাতীয় পরিচয়পত্র রাখা হয়। এভাবে অল্প অল্প করে বার বানিয়ে নিয়ে গেছে অভিযুক্তরা। দোকানের কর্মচারী সবুজ এভাবে করেছে শুনেছি। এখানে অন্য ব্যবসায়ীরা জড়িত না। ’

সিআইডির একটি সূত্র জানায়, গত মাসে চুয়াডাঙ্গায় বিজিবির অভিযানে ১১টি সোনার বার জব্দ হয়। ওই বারগুলোর সঙ্গে তাঁতীবাজারের ছাঁচের লেবেলের মিল আছে। একইভাবে ভারতের সীমান্তে এবং রেলওয়ে পুলিশের কাছে আটক হওয়া কয়েকটি চালানের সোনার বারগুলো একই রকম বলে তথ্য পেয়েছেন তদন্তকারীরা।



সাতদিনের সেরা