kalerkantho

রবিবার । ১৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৮। ২৮ নভেম্বর ২০২১। ২২ রবিউস সানি ১৪৪৩

১২৮ প্রতিষ্ঠানের কাছে পাওনা পৌনে দুই লাখ কোটি টাকা

► ২০১৯-২০ অর্থবছর পর্যন্ত অর্থ মন্ত্রণালয়ের হিসাব
► পুরো ঋণের টাকাই মেয়াদোত্তীর্ণ হয়েছে কিন্তু অনাদায়ি
► মেয়াদ অনুত্তীর্ণ ঋণের পরিমাণ ধরলে দাঁড়ায় আড়াই লাখ হাজার কোটি টাকা

সজীব হোম রায়   

২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



১২৮ প্রতিষ্ঠানের কাছে পাওনা পৌনে দুই লাখ কোটি টাকা

ঢাকাবাসীর পানির সমস্যা দীর্ঘদিনের। এই সমস্যা সমাধানে ঢাকা ওয়াসাকে সরকার নানা সময়ে উন্নয়নমূলক কাজ করার জন্য ঋণ দেয়। সেই ঋণ ২০১৯-২০ অর্থবছর পর্যন্ত জমে সুদ-আসলে ১২ হাজার ৫৮৯ কোটি টাকা হয়েছে। ঋণের টাকা এরই মধ্যে মেয়াদোত্তীর্ণও হয়ে গেছে। প্রতিষ্ঠানটির কাছ থেকে মেয়াদোত্তীর্ণ ঋণের সুদ-আসলের টাকা কবে নাগাদ পাওয়া যাবে, তা কেউ জানে না। একইভাবে বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) কাছে সরকারের পাওনা ১১ হাজার ৫১১ কোটি টাকা। ঢাকা ওয়াসা কিংবা বিসিআইসির মতো এমন ১২৮ প্রতিষ্ঠানের কাছে সরকারের মেয়াদোত্তীর্ণ ‘ডেট সার্ভিস লায়াবিলিটি’ বা ডিএসএলের পরিমাণ সুদ ও আসল মিলে দাঁড়িয়েছে প্রায় এক লাখ ৭৬ হাজার কোটি টাকা। আর মেয়াদ অনুত্তীর্ণ ঋণ ধরলে এর পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় দুই লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকা। বছরের পর বছর পার হলেও সংস্থাগুলো সরকারের এই দেনা পরিশোধ করছে না। অথচ শর্ত অনুযায়ী সব প্রতিষ্ঠানকে সময়মতো ঋণ পরিশোধ করার কথা রয়েছে।

যেহেতু হিসাবটি ২০১৯-২০ অর্থবছরের তাই বাজেটের দিকে তাকালে দেখা যায়, এই টাকা দিয়ে ওই অর্থবছরে বাজেট ঘাটতি মেটানো সম্ভব হতো। ওই অর্থবছরের বাজেট ঘাটতির পরিমাণ ছিল এক লাখ ৫৪ হাজার ২৫১ কোটি টাকা। কিংবা এই টাকা দিয়ে ওই অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) খরচ মিটিয়েও সরকারের কাছে ২০ হাজার কোটি টাকা বেশি থাকত। ২০১৯-২০ অর্থবছরে এডিপির আকার ছিল এক লাখ ৫৫ হাজার ৩৮০ কোটি টাকা। আর মেয়াদ অনুত্তীর্ণ ঋণের টাকার পরিমাণ ধরলে এটি চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেট ঘাটতি দুই লাখ ১৪ হাজার ৬৮১ কোটি টাকার চেয়েও বেশি। এই অর্থ দিয়ে পদ্মা সেতুর মতো বড় ছয়টি প্রকল্প বাস্তবায়ন করা সম্ভব। অর্থ বিভাগের ডিএসএল অধিশাখা সরকারের পাওনার এই হিসাব করেছে।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে অর্থ মন্ত্রণালয়ের কোনো কর্মকর্তা মন্তব্য করতে রাজি হননি।

এ প্রসঙ্গে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো অধ্যাপক মুস্তাফিজুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সরকারি অনেক প্রতিষ্ঠানে দুর্নীতি, অস্বচ্ছতা, অব্যবস্থাপনা, অদক্ষতা, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা এবং জবাবদিহির অভাব রয়েছে। এসব টাকা জনগণের করের টাকা দিয়ে পরিশোধ হচ্ছে। সুতরাং প্রতিষ্ঠানগুলোকে সংস্কার করতে হবে। প্রয়োজনে পুঁজিবাজারে এগুলোর শেয়ার ছাড়তে হবে, ব্যক্তিমালিকানা খাতে দিতে হবে। তা না হলে সরকারের দায় আরো বাড়বে।’

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের সাবেক ডিজি তৌফিজ আহমেদ চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘প্রতিষ্ঠানগুলো ঋণ ফেরত দিচ্ছে না তার একটি বড় কারণ অদক্ষতা ও দুর্নীতি। এগুলোতে সংস্কার আনা এখন সময়ের দাবি। প্রয়োজনে বেশি লোকসান দেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোকে বন্ধ করে দিয়ে সংস্কার করতে হবে। সরকার যেভাবে ঋণ করে ঘি খাচ্ছে তাতে দীর্ঘ মেয়াদে সমস্যা হবে। এটি অত্যন্ত দুশ্চিন্তার ব্যাপার।’

জানা গেছে, সরকার বিভিন্ন স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা, আধাস্বায়ত্তশাসিত সংস্থা, পাবলিক সেক্টর করপোরেশন এবং রাষ্ট্রায়ত্ত কম্পানিগুলোকে তাদের উন্নয়ন প্রকল্প ও অনুন্নয়নমূলক কাজে অর্থায়ন করে থাকে। ঋণ হিসেবে দেওয়া ডিএসএল হলো সরকারের সেই পাওনা অর্থ। উন্নয়ন প্রকল্প ও অনুন্নয়নমূলক কাজের অর্থের উত্স দুটি—বাংলাদেশ সরকারের নিজস্ব অর্থ এবং উন্নয়ন সহযোগীদের কাছে থেকে প্রাপ্ত প্রকল্প সহায়তা। উভয় ক্ষেত্রেই সরকার চুক্তির মাধ্যমে ঋণস্বরূপ এ অর্থ ওই সংস্থাগুলোকে দিয়ে থাকে। ঋণ গ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানগুলো চুক্তির শর্ত মতে পরিশোধের সময় অনুযায়ী কিস্তিভিত্তিক সুদসহ অথবা সুদ ব্যতীত এ অর্থ সরকারকে ফেরত দেওয়ার নিয়ম রয়েছে। কিন্তু বলা বাহুল্য, এসব শর্ত ও ঋণ বেশির ভাগ কম্পানি আর পরিশোধ করে না। ফলে সরকারের পাওনা বছর বছর বৃদ্ধি পাচ্ছে। রাষ্ট্রায়ত্ত এসব সংস্থা, আধাস্বায়ত্তশাসিত, স্থানীয় সরকার সংস্থার কাছে সরকারের বৈদেশিক ও স্থানীয় মুদ্রায় ঋণ রয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক সংকটের কারণে সরকার এসব ঋণ বিভিন্নভাবে নিজেই পরিশোধ করে থাকে।

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা, আধাস্বায়ত্তশাসিত সংস্থা, পাবলিক সেক্টর করপোরেশনের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতিষ্ঠা হওয়ার পর থেকেই সরকার নানা কাজে ঋণ দেয়। এসব কাজের মধ্যে সরকারের সেবামূলক ও ভর্তুকির মতো কাজও রয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলো ঋণ নিলেও বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তা ফেরত দেয় না। অর্থ মন্ত্রণালয়ের ২০০৯-১০ অর্থবছরের ২০১০ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত হিসাবে ৬৯টি প্রতিষ্ঠানে তখন মেয়াদোত্তীর্ণ ঋণের সুদ-আসলের পরিমাণ ছিল ৭৮ হাজার ৭১ কোটি ৬২ লাখ টাকা। আর মেয়াদ অনুত্তীর্ণ ঋণের পরিমাণ ছিল ২০ হাজার ১৯১ কোটি তিন লাখ টাকা। ১০ অর্থবছরের ব্যবধানে প্রতিষ্ঠানের পরিমাণ বাড়ার পাশাপাশি মেয়াদোত্তীর্ণ এই ঋণের সুদ-আসলের পরিমাণ দ্বিগুণ হয়েছে।

মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, ২০১৯-২০ অর্থবছর পর্যন্ত ১২৮টি প্রতিষ্ঠানের মেয়াদোত্তীর্ণ ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬৮ হাজার ৩৯৩ কোটি ৭১ লাখ টাকা। এ ঋণের বিপরীতে সুদ জমেছে পাহাড়সম। সুদের পরিমাণ এক লাখ সাত হাজার ১৭৩ কোটি ৫২ লাখ টাকা। মেয়াদোত্তীর্ণ সুদ এবং আসল মিলে মোট টাকার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে এক লাখ ৭৫ হাজার ৫৬৭ কোটি ২৩ লাখ টাকা। আর মেয়াদ অনুত্তীর্ণ ঋণের মোট পরিমাণ দাঁড়িয়েছে দুই লাখ ৪০ হাজার ১০০ কোটি ছয় লাখ টাকা।

সারা দেশে শতভাগ নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুত্ নিশ্চিতে কাজ করছে সরকার। স্বাভাবিকভাবেই এ খাতে ঋণও গেছে বেশি। এ খাতের ১০টি সংস্থার কাছে সরকারের মেয়াদোত্তীর্ণ ঋণের সুদ-আসল বাবদ পাওনা ৮১ হাজার ২৬৯ কোটি ১৮ লাখ টাকা।

একই রকমভাবে সারা দেশের জ্বালানি চাহিদা মেটাতে সরকারকে প্রতিবছরই প্রচুর পরিমাণে আমদানি করতে হয়। এ খাতের সাত সংস্থার কাছে সরকারের পাওনা ৩২ হাজার ৭১৭ কোটি ৯১ লাখ টাকা। আর শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীন পাঁচ সংস্থার কাছে সরকার ২৮ হাজার ৮৪৯ কোটি ৩১ লাখ টাকা পায়। এই ২২ সংস্থা ছাড়া আরো ১০৬ প্রতিষ্ঠানের কাছে সরকার বিশাল পরিমাণ ঋণের সুদসহ অর্থ পায়। যেগুলো আদৌ পরিশোধ হবে কি না, তা নিয়ে নিশ্চিত নন অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা।



সাতদিনের সেরা