kalerkantho

শনিবার । ৩১ আশ্বিন ১৪২৮। ১৬ অক্টোবর ২০২১। ৮ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

দিনের পর দিন চলছে লবণযুদ্ধ

নিখিল ভদ্র, উপকূল থেকে ফিরে   

২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



দিনের পর দিন চলছে লবণযুদ্ধ

চিংড়ি চাষিরা প্রশাসনের নাকের ডগায় ঘেরে নদী থেকে লবণপানি ঢোকাতে ছিদ্র করেন বেড়িবাঁধে। এতে বাঁধ হয়ে পড়ে দুর্বল। ঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে পানির চাপে সেই বাঁধ ভেঙে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়। দ্রুত সেই বাঁধ মেরামত না হওয়ায় স্থায়ী জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। এতে লবণাক্ত হয়ে পড়ে পুরো এলাকা। এভাবেই সুন্দরবনসংলগ্ন উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ততা বাড়ছে, যা ওই অঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকায় ভয়াবহ সংকট তৈরি করেছে।

সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, ঘূর্ণিঝড় ইয়াসের পর থেকে খুলনার পাইকগাছা, কয়রা ও দাকোপ এবং সাতক্ষীরার আশাশুনি ও শ্যামনগরের বিভিন্ন এলাকার মানুষ সারা বছর লবণাক্ত পানিতে বন্দি হয়ে আছে। সেখানে মানুষের দৈনন্দিন স্বাভাবিক কার্যক্রম রয়েছে বন্ধ। ফলে পানিবন্দি ওই অঞ্চলের মানুষ সীমাহীন ভোগান্তিতে রয়েছে। বন্ধ হয়ে আছে চাষাবাদ। ওই এলাকায় নলকূপের পানি হয়ে গেছে নোনা। প্রতিবছরই নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হওয়ায় বাড়ছে লবণাক্ততা। ফলে গাছপালার সংখ্যাও কমে যাচ্ছে আশঙ্কাজনকভাবে। পুকুরে লবণাক্ততার মাত্রা বেড়ে মাছসহ জলজ প্রাণীও মারা পড়ছে। অতিরিক্ত লবণাক্ততার কারণে ক্রমেই বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে ওই এলাকা।

উপকূলীয় এলাকায় জীবন-জীবিকার উন্নয়নে কাজ করছে নাগরিক সংগঠন সুন্দরবন ও উপকূল সুরক্ষা আন্দোলন। তাদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, লবণাক্ততা ও পরিবেশগত সংকটের কারণে পেশাগত নিরাপত্তা নেই। সুন্দরবন উপকূলে একসময় ধান চাষ হতো। জমিতে

লবণাক্ততা বেড়েছে। ফলে মাছ চাষ শুরু হয়। এরপর সেই লবণাক্ততার মাত্রা আরো বেড়ে যাওয়ায় এখন মাছ চাষ বাদ দিয়ে করতে হচ্ছে কাঁকড়া চাষ। অতিরিক্ত লবণাক্ততার কারণে গাছপালার পুনর্জন্ম হতে পারছে না। একই কারণে সুন্দরীগাছ আগের চেয়ে হচ্ছে ছোট।

বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) মাইনর ইরিগেশন ইনফরমেশন সার্ভিস ইউনিট পরিচালিত ‘দক্ষিণাঞ্চলের ভূগর্ভে লবণ পানির অনুপ্রবেশ পূর্বাভাস প্রদান’ শীর্ষক গবেষণায় দেখা গেছে, ভূগর্ভস্থ পানিতে বঙ্গোপসাগর থেকে লবণ পানি এসে মিশছে। এই লবণ পানি ক্রমেই বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ছে। উপকূলীয় অঞ্চলের মাটিতে বর্তমানে লবণাক্ততার পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭.৬-১৫.৯ পিপিটি, অথচ মাটির সহনীয় মাত্রা ০.৪-১.৮ পিপিটি।

দেশে লবণাক্ত জমির পরিমাণ জানতে ১৯৭৩ সালে প্রথম জরিপ চালায় মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট (এসআরডিআই)। ওই জরিপে দেখা যায়, দেশের উপকূলীয় ১৮ জেলায় ২৮ লাখ ৬০ হাজার হেক্টর জমির মধ্যে আট লাখ ৩৩ হাজার হেক্টর জমি লবণাক্ত। প্রথম জরিপের ২৭ বছর পর ২০০০ সালে দ্বিতীয় এবং ২০০৯ সালে তৃতীয় জরিপ চালায় সংস্থাটি। ২০০০ সালের জরিপে দেখা যায়, লবণাক্ত জমি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০ লাখ ২০ হাজার ৭০০ হেক্টর। ২০০৯ সালের জরিপে লবণাক্ত জমি বেড়ে দাঁড়ায় ১০ লাখ ৫৬ হাজার ২৬০ হেক্টরে। অর্থাৎ ৩৬ বছরে লবণাক্ত জমি বেড়েছে প্রায় ২৬.৭ শতাংশ। ২০২০ সালে চতুর্থ জরিপ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু করোনা অতিমারির কারণে তা আর হয়নি।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, লবণাক্ততার ক্ষত স্থায়ীভাবে চেপে বসেছে উপকূলের প্রাণ-প্রকৃতির ওপর। কয়েক দশক ধরে এখানকার মাটি ও পানিতে বাড়ছে লবণাক্ততা। লবণের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবে নারীরা নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। মানুষ ফসলি জমি হারাচ্ছে, বাঁধ ভেঙে ভেসে যাচ্ছে বাড়িঘর। নতুন ভূমিষ্ঠ হওয়া শিশুও লবণাক্ততার নেতিবাচক প্রভাব থেকে বাদ যাচ্ছে না। আর এই লবণাক্ততা বাড়ার অন্যতম কারণ অপরিকল্পিত চিংড়ি চাষ। চিংড়ি চাষের জন্য বাঁধ ছিদ্র করে ঘেরে লবণপানি তোলা হয়। ছিদ্র করা বাঁধই বেশি ভাঙে। আবার ঘেরের গই (পানি ওঠানো-নামানোর জন্য মাটি কেটে ড্রেন তৈরি করা) জোয়ারের পানির প্রবল চাপে ভেঙে যায়। গত ২৫-২৭ মে পর্যন্ত ঘূর্ণিঝড় ইয়াস ও পূর্ণিমার প্রভাবে ভেঙে যাওয়া খুলনা ও সাতক্ষীরার বিভিন্ন স্থান পরিদর্শনে এর সত্যতা মিলেছে।

কয়রার শিক্ষক নেতা অধ্যক্ষ রাজীব বছাড় বলেন, ‘কয়রার যেসব স্থানে চিংড়ি ঘেরের পাইপ ও গই ছিল, সেখানেই ভেঙেছে। প্রভাবশালীরা অবৈধভাবে রাস্তা ছিদ্র করে এ কাজ করে। সাধারণ মানুষের রাস্তা নষ্ট করার সাহস নেই। আমরা এ নিয়ে আন্দোলন করলেও লাভ হয়নি।’

কয়রার মহারাজপুরের বাসিন্দা মো. শাহাজাহান সিরাজ বলেন, ‘ওই সময়ে জলোচ্ছ্বাসের শুরুতে একটি ঘেরের গই ভেঙে প্রথম মহারাজপুর এলাকায় লবণপানি  ঢোকে। শুধু এখানেই নয়, বাঁধের যেসব স্থানে পাইপ ছিল সেখানেই ভেঙেছে।’

শ্যামনগরের গাবুরার কৃষক আতিকুর রহমান বলেন, ‘লবণ ফসলের জন্য ক্ষতিকর। লবণের সঙ্গে যুদ্ধ করেই টিকে আছি। আমাদের অন্য কোথাও যাওয়ার সামর্থ্য নেই।’ আতিকুর রহমানের প্রতিবেশী জোছনা আক্তার এলাকা থেকে চলে যেতে চান। তিনি বলেন, ‘এখানে জীবনযাপন খুব কঠিন। দুই শিশুসন্তান অসুস্থ হয়ে পড়েছে।’ পাইকগাছার সোলাদানা ইউনিয়নের পতন আবাসনের সালমা বেগম বলেন, ‘আমাদের জীবনব্যবস্থা এখন জোয়ার-ভাটার সঙ্গে নামছে-উঠছে।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) খুলনার সমন্বয়কারী অ্যাডভোকেট বাবুল হাওলাদার বলেন, ‘লবণপানি তুলে চিংড়ি চাষ বন্ধে আমরা দীর্ঘদিন ধরে কথা বলছি। বাঁধ কেটে বা নষ্ট করে লবণপানি তোলা বন্ধে উচ্চ আদালত ও প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ রয়েছে। কিন্তু মাঠ পর্যায়ে সেই নির্দেশ মানা হচ্ছে না। উপকূলবাসীকে রক্ষায় লবণপানির এই ব্যবসা বন্ধ করতে হবে।’

অপরিকল্পিত চিংড়ি চাষ বন্ধের বিষয়ে একমত পোষণ করেন খুলনা-৬ আসনের সংসদ সদস্য আক্তারুজ্জামান বাবু। তিনি বলেন, ‘পাইকগাছা-কয়রাকে নোনা পানিমুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকারও এ বিষয়ে আন্তরিক। টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণের পাশাপাশি ওই এলাকাকে নোনা পানিমুক্ত করতে নতুন প্রকল্প নেওয়া হবে।’

নাগরিক সংগঠন সুন্দরবন ও উপকূল সুরক্ষা আন্দোলনের সংগঠক পলাশ আহসান বলেন, ‘এরই মধ্যে খুলনা-সাতক্ষীরা অঞ্চলের বেড়িবাঁধের ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলোর তালিকা তৈরি করা হয়েছে। সেই তালিকা পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়সহ সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোতে পাঠানো হয়েছে। ওই তালিকা অনুযায়ী জরুরি ভিত্তিতে বাঁধ সংস্কারের পদক্ষেপ নিতে হবে।’

 

 



সাতদিনের সেরা