kalerkantho

বুধবার । ৪ কার্তিক ১৪২৮। ২০ অক্টোবর ২০২১। ১২ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

বিশেষভাবে সক্ষম তরুণদের অংশগ্রহণ

নতুনরূপে ‘দ্য টেম্পেস্ট’

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



নতুনরূপে ‘দ্য টেম্পেস্ট’

মানুষ তার স্বপ্নের সমান বড়—এই বাক্যটি আলোকিত মানুষ গড়ার অন্যতম কারিগর অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের। তবে আসলে মানুষ তার স্বপ্নের চেয়েও বড় হতে পারে এবং প্রত্যাশার চেয়েও অধিক সাফল্য অর্জন করতে পারে। এ জন্য প্রয়োজন নিজের ওপর বিশ্বাস এবং সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপদানের জন্য নিরলস প্রচেষ্টা। সম্প্রতি এই বিষয়টিকে নিজেদের কাজের মধ্য দিয়ে বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরেছেন বিশেষভাবে সক্ষম বাংলাদেশের দুই প্রতিভাবান তরুণ শিল্পী মো. সাদ্দাম বেপারী ও মোরশেদ মিয়া।

চলতি বছরের জুনে ব্রিটিশ কাউন্সিলের আয়োজনে জাপানের আউলস্পট থিয়েটার এবং যুক্তরাজ্যের গ্রেআই থিয়েটারের সহযোগিতায় জাপানে মঞ্চস্থ হয় উইলিয়াম শেকসপিয়ারের ‘দ্য টেম্পেস্ট : সুইমিং ফর বিগিনারস’। এতে অংশ নেন যুক্তরাজ্য, জাপান ও বাংলাদেশের বিশেষভাবে সক্ষম প্রতিভাবান তরুণরা। গত বছরের মে মাসে নাটকটির চূড়ান্ত মঞ্চায়নের কথা থাকলেও কভিড-১৯ পরিস্থিতি বিবেচনা করে তা মঞ্চায়ন করা সম্ভব হয়নি। এ বছর বিভিন্ন বাধা-বিপত্তি অতিক্রম করে একই সঙ্গে ভার্চুয়ালভাবে এবং মঞ্চে অভিনেতাদের উপস্থিতিতে মঞ্চস্থ হয় ‘দ্য টেম্পেস্ট’। এ যেন শারীরিক ও পারিপার্শ্বিক সব ‘টেম্পেস্ট’কে অতিক্রম করেই ‘দ্য টেম্পেস্ট’-এর মঞ্চায়ন। 

ব্রিটেন ও বাংলাদেশের পাঁচজন অভিনেতা মঞ্চে ভিডিও স্ক্রিনে উপস্থিত হয়েছিলেন, আর সাত জাপানি অভিনেতা ভিডিওর সঙ্গে নিজেদের অভিনয়কে সামঞ্জস্যপূর্ণ করেছেন। সবার বোঝার সুবিধার জন্য মঞ্চে অন্য ভাষার সঙ্গে ইশারা ভাষাও ব্যবহার করা হয়। মঞ্চনাটকটি পরিচালনা করেন বিশেষভাবে সক্ষম ব্রিটিশ পরিচালক জেনি সিলি।

বিশেষভাবে সক্ষম ব্যক্তিদের আমাদের সমাজ বহু বছর ধরে মূলধারার সমাজ থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছে এবং তাদের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ইত্যাদি ক্ষেত্রে অংশ নেওয়ার পূর্ণ সুযোগ সৃষ্টি করছে না। সমাজের দৃষ্টিতে বিশেষভাবে সক্ষম ব্যক্তিরা সমাজের জন্য বোঝাস্বরূপ। কিন্তু মানুষ চাইলে কি না পারে। শারীরিক প্রতিবন্ধকতার সঙ্গে প্রতিভাহীনতার কোনোরূপ সংযোগ নেই, তা সবার সামনে তুলে ধরেছেন সাদ্দাম ও মোরশেদ। সব প্রতিবন্ধকতাকে উপেক্ষা করে তাঁরা তাঁদের সৃজনশীল দক্ষতা মঞ্চে উপস্থাপন করেছেন দেশে বসেই। ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে নাটকের পূর্বপ্রস্তুতির জন্য তাঁরা অংশ নেন লন্ডনে এক কর্মশালায়। করোনা মহামারির কারণে প্রস্তুতি ও অনুশীলন অনুষ্ঠিত হয় ভার্চুয়াল মাধ্যমে।

শারীরিক প্রতিবন্ধকতার সঙ্গে করোনার বৈশ্বিক মহামারির কারণে সারা বিশ্বের অচল অবস্থা দমাতে পারেনি নাটকে অংশ নেওয়া বিশেষভাবে সক্ষম শিল্পীদের। ‘দ্য টেম্পেস্ট’ এক মঞ্চে একত্র করে বাক, শ্রবণ ও শারীরিকভাবে প্রতিবন্ধকতার শিকার এবং ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতি থেকে আসা একদল প্রতিভাবানকে। প্রায় দুই বছর চলে এর অনুশীলন পর্ব। ২০১৯ সালে যখন নাটকের পূর্বপ্রস্তুতি শুরু হয়, তখন শুরুতে সবাই দ্বিধান্বিত ছিলেন একে অপরের সঙ্গে মঞ্চে কথোপকথন চালানো নিয়ে। মঞ্চে ইংরেজি, জাপানি ও ইশারা ভাষার ব্যবহারে মোকাবেলা করা হয়েছে ভাষাগত চ্যালেঞ্জ। আর একে অপরকে সহযোগিতা করার মাধ্যমে মঞ্চে তাঁরা কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হয়েছেন শারীরিক প্রতিবন্ধকতার বাধা। সিলির সহযোগী হিসেবে কাজ করেছেন হিরোয়ে ওহাশি। তিনি বলেন,  যে, বাক ও শ্রবণ প্রতিবন্ধীদের একসঙ্গে কাজ করা সবচেয়ে কঠিন। শব্দহীন জগতের সঙ্গে আলোহীন জগতের যখন সম্মিলন ঘটে, পৃথিবী তখন এক নতুন নাটক দেখতে পারে।’

মঞ্চনাটকটি উপভোগ করতে সরাসরি উপস্থিত ছিলেন বিভিন্ন অঙ্গনের মানুষ। দর্শক সারিতে ছিলেন জনপ্রিয় অভিনেতা-অভিনেত্রী, থিয়েটার সমালোচকসহ আরো অনেকে। অভিনেতাদের সাবলীল ও স্বতঃস্ফূর্ত অভিনয়ে চমত্কৃত হয়েছেন তাঁরা। নাটক উপস্থাপনের ব্যাপারে এক দর্শক বলেন, ‘আমি যেমনটি ভেবেছিলাম এটি একদমই তেমন ছিল না। অবিশ্বাস্যভাবে এতে একসঙ্গে অনেক বিষয়ের নিখুঁত সম্মিলন ঘটেছে। নাটকটি অসাধারণ ছিল।’

বিশেষভাবে সক্ষম ব্যক্তিদের অংশগ্রহণে নাটকের মঞ্চায়ন এবারই প্রথম। অথচ প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা পেলে অন্য সবার পাশাপাশি বিশেষভাবে সক্ষম ব্যক্তিরাও পারবে সমানভাবে এগিয়ে যেতে এবং নিজেদের প্রতিভার বিকাশ ঘটাতে। সমতাভিত্তিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠনে বিভিন্ন শিল্পগোষ্ঠীর উচিত ভবিষ্যতে দেশে এমন আয়োজনের ব্যবস্থা করা।



সাতদিনের সেরা