kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১২ কার্তিক ১৪২৮। ২৮ অক্টোবর ২০২১। ২০ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

ঢাকায় আরো ১০ বাড়িতে ভিওআইপির অবৈধ কারবার

শিগগিরই বড় অভিযান

রেজোয়ান বিশ্বাস   

২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



ঢাকায় আরো ১০ বাড়িতে ভিওআইপির অবৈধ কারবার

আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর কঠোর অবস্থানের মধ্যেও ভিওআইপি (ভয়েস ওভার ইন্টারনেট প্রটোকল) অবৈধ কারবার থেমে নেই। চক্রগুলো কৌশলে বন্ধ সিম অ্যাক্টিভ করে এই অবৈধ কারবার চালাচ্ছে। তবে সরকার এ বিষয়ে কঠোর অবস্থানে। গত ১৪ সেপ্টেম্বর থেকে রাজধানীতে কয়েকটি অভিযানে বিপুল পরিমাণ ভিওআইপির অবৈধ সরঞ্জাম ও এতে ব্যবহার হওয়া সরকারি মোবাইল অপারেটর টেলিটকের সিম উদ্ধার হয়েছে। অভিযানে গ্রেপ্তার হয়েছে ১০ জন। তবে এই চক্রের মূল হোতারা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে। এসব অভিযানের পর বিষয়টি নিয়ে নতুন করে আলোচনা  ও খোঁজখবর শুরু হয়েছে।

নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসি ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সূত্র জানায়, রাজধানী ঢাকায় কমপক্ষে ১০টি এবং ঢাকার বাইরে চট্টগ্রামসহ আরো কয়েকটি বিভাগীয় শহরে ভিওআইপির অবৈধ স্থাপনার তথ্য মিলেছে। চট্টগ্রামের এক রাজনৈতিক নেতার পুত্র এই চক্রের সঙ্গে জড়িত বলেও জানা গেছে। এই বিতর্কিত ব্যক্তির নাম শারুন। স্থাপনাগুলোর অবস্থান সুনির্দিষ্ট করতে জোরদার করা হয়েছে গোয়েন্দা তৎপরতা। আশা করা হচ্ছে, শিগগির বড় ধরনের অভিযান পরিচালিত হবে।

এদিকে বেসরকারি ইন্টারন্যাশনাল গেটওয়ে (আইজিডাব্লিউ) অপারেটরদের ফোরাম ‘আইওএফ’ সম্প্রতি কালের কণ্ঠকে জানায়, ভিওআইপির চোরাকারবারিরা প্রতিদিন তিন কোটি মিনিট বৈদেশিক কল আনছে। এর ফলে সরকার বিপুল পরিমাণে রাজস্ব হারাচ্ছে এবং আইজিডাব্লিউগুলো ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ও প্রচুর লোকসানের সম্মুখীন হচ্ছে। দৈনিক অবৈধ পথে আসা তিন কোটি মিনিট কল থেকে বিদ্যমান রেটে সরকারের রাজস্ব হারানোর পরিমাণ বছরে ২১৮ কোটি টাকা এবং দেশের সব আইজিডাব্লিউয়ের হারানো আয়ের পরিমাণ বছরে ১০৯ কোটি টাকা।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সাম্পতিক অভিযানে এই অবৈধ কারবার সম্পর্কে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র  জব্দ করা হয়েছে। রাজধানীর শেরেবাংলানগর ও কাকরাইলের দুটি স্থাপনায় ভিওআইপি অবৈধ কারবারিদের ধরতে অভিযানে নেতৃত্ব দেওয়া র‌্যাব-১০-এর পরিচালক মাহফুজুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, গত দুই দিনে দুটি অবৈধ ভিওআইপি কারবার চক্রের স্থাপনা শনাক্ত করে বিপুল পরিমাণ ভিওআইপি সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়েছে। সেখান থেকে পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের তথ্য মতে এখনো অন্তত ১০ সিন্ডিকেট এই অবৈধ কর্মকাণ্ডে জড়িত রয়েছে।

তিনি আরো বলেন, চক্রের সদস্যরা অবৈধভাবে আন্তর্জাতিক পেমেন্ট ও রিচার্জ সেবা প্রদানের পাশাপাশি হুন্ডির মাধ্যমে অর্থ লেনদেন করছে। এতে তারা সরকারের বিপুল পরিমাণ রাজস্ব ফাঁকি দিচ্ছে।

বিটিআরসির উপপরিচালক (এনফোর্সমেন্ট) গোলাম সারোয়ার বলেন, ‘র‌্যাবকে সঙ্গে নিয়ে অবৈধ ভিওআইপি কারবার ঠেকাতে আমরা প্রতি ১২ ঘণ্টা পর পর মনিটর করি। যেসব সিমে সন্দেহজনক কোনো কিছু পাই, সেগুলো ব্লক করে দিই। চক্রগুলো পরবর্তী সময়ে অন্যভাবে সিম অ্যাক্টিভ করে আবার এ ধরনের কাজ করে। আমরা প্রতিনিয়ত এসব বিষয়ে নজর রাখছি।’

জানতে চাইলে র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন কালের কণ্ঠকে বলেন, অবৈধ ভিওআইপি কারবারে জড়িতদের ধরতে গত প্রায় সাত বছরে সাড়ে ৫০০ অভিযান চালানো হয়েছে। এতে গ্রেপ্তার হয়েছে প্রায় ৮০০ কারবারি। এ সময় টেলিটকসহ অন্যান্য মোবাইল অপারেটরের বিপুল পরিমাণ সিমসহ কোটি কোটি টাকার ভিওআইপি সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়েছে।

সাম্প্রতিক অভিযান : গত বৃহস্পতিবার রাতে ফকিরাপুল গরম পানির গলি এলাকায় অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ ভিওআইপির অবৈধ সরঞ্জামসহ চারজনকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব। তারা দীর্ঘ সাত থেকে আট বছর ধরে ভিওআইপির অবৈধ কারবার এবং আন্তর্জাতিক পেমেন্ট ও রিচার্জের কাজ করে আসছিল। এ সময়ে তারা সরকারের অন্তত ১০ কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি দিয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে তথ্য পেয়েছে র‌্যাব। এর আগে গত বুধবার বিকেলে শেরেবাংলানগর থানার ইন্দিরা রোড এলাকা থেকে বিপুল পরিমাণ অবৈধ ভিওআইপি সরঞ্জামসহ শামসুজ্জামান নামের এক যুবককে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব ও বিটিআরসির যৌথ দল। র‌্যাব কর্মকর্তারা বলছেন, গ্রেপ্তার শামসুজ্জামানসহ সংঘবদ্ধ চক্রের অন্তত ১১ জন অবৈধভাবে ভিওআইপি, আন্তর্জাতিক পেমেন্ট ও রিচার্জ কারবার চক্রের সদস্য। গত দেড় বছরে চার কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি দিয়েছে এই চক্র।

এর আগে গত ১৪ সেপ্টেম্বর রাজধানীর মোহাম্মদপুরের লালমাটিয়ায় অভিযান চালিয়ে অবৈধ ভিওআইপি কারবারের সরঞ্জামসহ শফিকুল ইসলাম নামের একজনকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব। অভিযানে টেলিটকের এক হাজারের বেশি সিম উদ্ধার করা হয়। ওই অভিযানের পর র‌্যাব জানিয়েছিল, অবৈধ এই ভিওআইপি কারবারের হোতা সৌদি আরব প্রবাসী। তিনি সৌদি আরবে বসে এই কারবার পরিচালনা করতেন। এর আগে গত মঙ্গলবার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হাসান আলী নামের এক বিদেশগামীকে তল্লাশি করে পাওয়া যায় তিন হাজার ভিওআইপি কলিং কার্ড। কার্ডগুলো নিয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাতের শারজাহ শহরে যাওয়ার পথে ছিলেন হাসান আলী। কার্ডগুলো বাংলাদেশেই বানানো হয়েছিল। এ ছাড়া গত ৩ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর নিউ মার্কেট, তুরাগ ও শাহ আলী থানা এলাকায় বিটিআরসি ও র‌্যাব মিলে অভিযান চালিয়ে অবৈধ ভিওআইপি ব্যবসায় জড়িত তিনজনকে গ্রেপ্তার করে টেলিটক মোবাইলের তিন হাজার ৪৮৩টি সিম জব্দ করে।   বিটিআরসির তদন্ত প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, এই অবৈধ কারবারে টেলিটকের কয়েকজন কর্মকর্তাও জড়িত।

গত ১৭ সেপ্টেম্বর জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য পীর ফজলুর রহমান জাতীয় সংসদে বলেন, অবৈধ ভিওআইপির ভয়াবহ সিন্ডিকেটের কারণে সরকার বিপুল রাজস্ব হারাচ্ছে। এ বিষয়ে তিনি জাতীয় সংসদের ৩০০ বিধিতে ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রীর বিবৃতি এবং দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান। তিনি বলেন, ‘টেলিটকের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কয়েকজন রাজনৈতিক নেতা মিলে এই অবৈধ ভিওআইপি কারবার করছেন।’ তবে কারা এই রাজনৈতিক নেতা, তা তিনি প্রকাশ করেননি।



সাতদিনের সেরা