kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১২ কার্তিক ১৪২৮। ২৮ অক্টোবর ২০২১। ২০ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

‘অনিরাপদ’ রাতের ট্রেন

ঝুঁকি নিয়ে ছাদে উঠছে যাত্রী, ঘটছে দুর্ঘটনাও

কমিউটারে ডাকাতের হানা, নিহত দুজন জামালপুরের

নিজস্ব প্রতিবেদক, ময়মনসিংহ, জামালপুর ও গফরগাঁও প্রতিনিধি   

২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



ঝুঁকি নিয়ে ছাদে উঠছে যাত্রী, ঘটছে দুর্ঘটনাও

ট্রেনের ছাদে যাত্রী ওঠা বেআইনি ও ঝুঁকিপূর্ণ। তবু ঢাকা থেকে গফরগাঁও, ময়মনসিংহ হয়ে জামালপুর যাওয়ার রুটে ঝুঁকি নিয়ে প্রায়ই ট্রেনের ছাদে উঠে ভ্রমণ করছে যাত্রী, ঘটছে নানা ধরনের দুর্ঘটনাও। গত বৃহস্পতিবার রাতে ঢাকা থেকে জামালপুরগামী কমিউটার ট্রেনের ছাদে ডাকাতরা হানা দেয়। নিহত হয় দুই যাত্রী, আহত হয় আরো একজন। ট্রেনযাত্রীদের অভিযোগ, এমনিতেই এই রুটে চাহিদার তুলনায় ট্রেন খুবই কম। এর ওপর বেশির ভাগ ট্রেনের কামরায়ই প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাকর্মী থাকেন না; রাতের বেলায় বাতিও জ্বলে না অনেক ট্রেনের কামরায়।

নিহত ওই দুই যাত্রী হলেন জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার চর আমখাওয়া ইউনিয়নের ফকিরপাড়া গ্রামের মো. ওয়াহিদুজ্জামানের ছেলে নাহিদ হাসান (৪০) এবং জামালপুর শহরের বাগেরহাটা এলাকার আচার বিক্রেতা দরিদ্র মো. হাফিজুর রহমানের ছেলে সাগর (২৩)। আর আহত রুবেলের (২২) বাড়ি জেলার ইসলামপুর উপজেলার মাঝপাড়া এলাকায়। নিহতদের মরদেহের ময়নাতদন্তের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন।

নিহত নাহিদ সম্প্রতি জামালপুর শহরের ইকবালপুর এলাকায় বিপাশা নামের এক নারীকে বিয়ে করেছেন। তিনি গাজীপুরে নেসলে কম্পানিতে চাকরি করতেন। স্ত্রীকে নিয়ে তিনি গাজীপুরেই থাকতেন। তাঁর মামা মো. সেলিম কালের কণ্ঠকে জানান, বৃহস্পতিবার বিকেলে জামালপুর কমিউটার ট্রেনে স্ত্রীকে নিয়ে নিজ বাড়ি দেওয়ানগঞ্জ যাওয়ার জন্য রওনা দিয়েছিলেন নাহিদ। ট্রেনে ভিড় থাকায় কামরার ভেতর স্ত্রীকে রেখে ছাদে উঠেছিলেন তিনি। ট্রেনটি ময়মনসিংহ স্টেশন ছাড়ার কিছুক্ষণ পরই দুর্ঘটনাটি ঘটে। এ ঘটনার সুষ্ঠু বিচার ও ক্ষতিপূরণ দাবি করে তাঁর স্বজনরা।    

নিহত সাগর ঢাকায় তাঁর বোনের বাসায় থেকে রিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন। তাঁর স্ত্রী ও দুই সন্তান রয়েছে। তাঁর বাবা হাফিজুর রহমান জানান, সাগর কমিউটার ট্রেনে ওঠার আগে বাড়িতে ফোন করেছিলেন। কিন্তু ট্রেনের সময় পার হয়ে গেলেও তিনি বাড়ি ফেরেননি। সকালে জানতে পারেন ট্রেনে ডাকাতের হামলায় দুজন মারা গেছেন। পরে জামালপুর সদর হাসপাতালের লাশ রাখার ঘরে ছেলেকে শনাক্ত করেন। এ ঘটনায় তিনি সুষ্ঠু বিচার দাবি করেন। 

আহত রুবেল (২২) মাসখানেক আগে ঢাকায় যান রিকশা চালাতে। বাড়িতে তাঁর শ্বশুর অসুস্থ, এই খবর পেয়ে তিনি ট্রেনের ছাদে উঠে জামালপুর ফিরছিলেন। রুবেল জানান, ডাকাতরা তাঁর কাছ থেকে চার হাজার টাকা ছিনিয়ে নিয়েছেন। তাঁকে তিনজনে ধরে কিলঘুষি মেরে আহত করেছে। এতে তিনি অজ্ঞান হয়ে ট্রেনের ছাদেই পড়ে ছিলেন। 

ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী আরেক যাত্রী ফারুক জানান, ট্রেনটি গফরগাঁও রেলস্টেশন ছাড়ার পর ছাদের যাত্রীদের অনেকেই ডাকাতদলের কবলে পড়েন। চার-পাঁচজনের ডাকাতদলটি নাহিদসহ অনেক যাত্রীর কাছ থেকে মানিব্যাগ ও মোবাইল ফোনসেট লুট করে ট্রেনের ইঞ্জিনের দিকে চলে যায়। এরপর ট্রেনটি রাত আনুমানিক পৌনে ৯টার দিকে ময়মনসিংহ রেলস্টেশন ছাড়ার কয়েক মিনিটের মধ্যেই যাত্রী ফারুক, নাহিদসহ বেশ কয়েকজন যাত্রী এক হয়ে ট্রেনের ছাদে ডাকাতদের খুঁজতে যান। তাঁরা ডাকাতদের চিনতে পেরে কিছু বলার আগেই ডাকাতরা তাঁদের ওপর হামলা করে। এতে যাত্রী নাহিদ, সাগর ও রুবেল গুরুতর আহত হয়ে ট্রেনের ছাদেই পড়ে থাকেন। তাঁদের মধ্যে সাগর ও নাহিদ মারা যান।

এদিকে রেলওয়ে পুলিশের ঢাকা রেঞ্জের এসপি সাইফুল্লাহ আল মামুন গতকাল শুক্রবার দুপুরে জামালপুর রেলওয়ে থানায় সাংবাদিকদের জানান, ট্রেনের ছাদে দুর্বৃত্তদের হামলায় দুই যাত্রীর মৃত্যুর ঘটনাটি গুরুত্ব সহকারে তদন্ত করা হচ্ছে।

স্থানীয় একাধিক সূত্রে জানা যায়, রেলের ছাদে যাত্রীদের ডাকাতির একাধিক চক্র রয়েছে। এরা যাত্রী বেশেই ট্রেনের ছাদে ওঠে। এদের টার্গেট থাকে রাতের ট্রেন। ট্রেন কিছুটা নীরব স্থানে এলে এরা ডাকাতি শুরু করে। যাত্রীদের কেউ বাদ প্রতিবাদ করলে ডাকাতরা তখন যাত্রীদের ট্রেন থেকে ফেলে দেয় কিংবা ছুরিকাঘাত করে। মাঝেমধ্যে এসব চক্রের সদস্যরা রেল পুলিশের হাতে আটকও হয়েছে। করোনা সংকটের কারণে দীর্ঘদিন ট্রেন চলাচল বন্ধ থাকায় এ চক্রটি নীরব ছিল। সম্প্রতি ট্রেন চলাচল শুরু হওয়ায় আবারও চক্রটি তৎপর হয়েছে বলে পুলিশের ধারণা।

এদিকে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক প্রশাসনের একজন দায়িত্বশীল ব্যক্তি বলেন, ট্রেনের ছাদে ওঠা বেআইনি। কিন্তু মানুষ কেন ট্রেনের ছাদে ওঠে, তা ভেবে দেখতে হবে। সমস্যার গোড়াতে যেতে হবে। ট্রেনের সংখ্যা বাড়ানো হবে, বগি বাড়াতে হবে, টিকিটের মূল্য সহনশীল থাকলে গরিব মানুষজন কেউ ছাদে উঠবে না। নয়তো শুধু আইনের কথা বলে ট্রেনের ছাদে যাত্রী ওঠা বন্ধ করা যাবে না।

রেল পুলিশের একটি সূত্র জানায়, বর্তমানে করোনাকালে ট্রেনের ছাদে যাত্রী তেমন থাকে না। তাই ছাদের নিরাপত্তার বিষয়টি তেমনভাবে এখন গুরুত্ব পাচ্ছে না। ঈদ কিংবা অন্য বিশেষ সময়ে যখন ট্রেনের ছাদে বিপুলসংখ্যক যাত্রী ওঠে, তখন তারা ছাদেও নিরাপত্তা জোরদার করে।

এদিকে ময়মনসিংহ রেলওয়ে পুলিশের ওসি মামুন রহমান বলেন, ঘটনাটি ঠিক কোন স্থানে ঘটেছে তা অস্পষ্ট। যাঁরা আহত হয়েছেন তাঁরাও নির্দিষ্টভাবে বলতে পারছেন না। তবে পুলিশ বিষয়টি নিয়ে তৎপর আছে।

গফরগাঁও থানার ওসি অনুকুল সরকার বলেন, তাঁরা গফরগাঁও স্টেশনের সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ পরীক্ষা করেছেন। সেখানে অস্বাভাবিক কিছু এখন পর্যন্ত চোখে পড়েনি। তবে তাঁরা আরো ভালোভাবে ফুটেজগুলো পরীক্ষা করছেন।



সাতদিনের সেরা