kalerkantho

মঙ্গলবার । ৩ কার্তিক ১৪২৮। ১৯ অক্টোবর ২০২১। ১১ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

উলামা দলকে হেফাজত বানানোর চেষ্টা!

► বিএনপির সিরিজ বৈঠকে তোপের মুখে সংগঠনটির নেতারা
► দোয়া আর মিলাদ মাহফিলেই দায়িত্ব শেষ

শফিক সাফি   

২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে




উলামা দলকে হেফাজত বানানোর চেষ্টা!

উলামা দল। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) অঙ্গসংগঠন। বিএনপির গঠনতন্ত্রে উলামা দলকে দেওয়া হয়েছে আলাদা মর্যাদা। একসময় ডাকসাইটের অনেক আলেম-উলামা এই সংগঠনের ছায়াতলে যেতে মুখিয়ে থাকতেন। কিন্তু সময়ের রং বদলে আর নেই সেই মাদকতা। এখন বলার মতো কোনো আলেম-উলামা এই সংগঠনের সঙ্গে নেই। খেই হারিয়ে এখন অনেকটা ‘দমহীন’ উলামা দল। এমনকি বিএনপির কর্মসূচিতেও সংগঠনটির নেই বড় কোনো অবদান। শুধু দোয়া আর মিলাদ মাহফিলেই দায়িত্ব শেষ করছেন সংগঠনটির নেতারা। গুলশানের রাজনৈতিক কার্যালয়ে হয়ে যাওয়া দলের নেতাদের সঙ্গে সিরিজ বৈঠকের তৃতীয় দিন গত ১৬ সেপ্টেম্বর সংগঠনটির শীর্ষ নেতাদের পড়তে হয় তোপের মুখে।

এ প্রসঙ্গে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘আমাদের বেশির ভাগ কমিটি তাদের পুনর্গঠনের কাজ শুরু করেছে, কাজ চলছে। বেশ কিছুদিন ধরে অঙ্গসংগঠনগুলোরও কাজ শুরু হয়েছে। করোনার কারণে সম্মেলনগুলো করা সম্ভব হয়নি। বেশির ভাগ জায়গায় সম্মেলনের জন্য প্রস্তুত হয়ে আছে।’

জানতে চাইলে উলামা দলের আহ্বায়ক মাওলানা নেছারুল হক বলেন, ‘দেশের বেশির ভাগ মসজিদ-মাদরাসা এমপিওভুক্ত বা ইসলামী ফাউন্ডেশনের অধীনে। তাই এসব প্রতিষ্ঠান থেকে কর্মী বা নেতা আনা সম্ভব হচ্ছে না। কেউ এলেই তাঁকে চাকরিচ্যুত করা হচ্ছে বা বেতন ও পেনশন আটকে দেওয়া হয়। বাকি যেসব বেসরকারি প্রতিষ্ঠান রয়েছে আমরা সেখান থেকে কর্মী নিয়ে কাজ করছি।’

জানা যায়, সরকারবিরোধী আন্দোলন শুরুর আগে অঙ্গসংগঠনগুলো ‘ঠিক করার’ তাগাদা এসেছে বিএনপির ধারাবাহিক বৈঠকে। বৈঠকে উলামা দল নিয়ে আলোচনার সূত্রপাত করেন যুবদল সাধারণ সম্পাদক সুলতান সালাহ উদ্দিন  টুকু। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে ইসলামী দলগুলোর প্রায় সবাই বড় ধরনের সমাবেশ করতে পারে নিজেরাই। রাজপথে আন্দোলনে তাঁরা ব্যাপক ভূমিকা রাখেন। কিন্তু আমাদের সংগঠনের কোনো ভূমিকা নেই। তাঁরা শুধু দোয়া আর মিলাদ মাহফিল নিয়ে আছেন।’

আরেক নেতা বলেন, ‘হেফাজতে ইসলাম যদি মাদরাসাকেন্দ্রিক সংগঠন গড়ে তুলে কর্মী সমাবেশ করতে পারে, তাহলে উলামা দল কী করছে। তারাও তো হেফাজতের মতো অন্য ইসলামী দলগুলোর মতো কর্মী সংগ্রহ করে আন্দোলন-সংগ্রামে ভূমিকা রাখতে পারে।’

বৈঠকে বেশ কয়েকজন নেতা বলেন, যোগ্য নেতৃত্বের হাতে সংগঠনটির দায়িত্ব দিলে দেশের প্রখ্যাত আলেম-উলামা অন্তর্ভুক্ত হতেন। সারা দেশে জেলা ও থানা কমিটিগুলো বাস্তবায়ন করতে পারলে শক্তিশালী সংগঠন হিসেবে আন্দোলন-সংগ্রামে ভূমিকা রাখতে পারত উলামা দল। গতিহীন সাংগঠনিক নাজুক অবস্থার কারণে উলামা দলে যুক্ত হচ্ছেন না দেশের প্রখ্যাত আলেম-উলামারা। বর্তমান কমিটিতে এমন কোনো আলেম নেই যাঁকে দল-মত-নির্বিশেষে সবাই শ্রদ্ধার চোখে দেখে। এমনকি সাধারণ জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য আলেম-উলামাদের সংগঠনটিতে অন্তর্ভুক্ত করতে বিএনপির পক্ষ থেকেও কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ১৯৭৯ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর ইসলামী চিন্তাসম্পন্ন ব্যক্তিদের নিয়ে উলামা দল গঠন করেন সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। নব্বই দশকে সংগঠনটির প্রথম সম্মেলনে মাওলানা এস এম রুহুল আমিনকে সভাপতি আর মোয়াজ্জেম হোসেনকে সাধারণ সম্পাদক করা হয়। পরে ১৯৯৭ সালে ওই কমিটি ভেঙে দিয়ে নজিবুল বাশার মাইজভাণ্ডারীকে আহ্বায়ক করে নতুন কমিটি ঘোষণা করা হয়। ২০০১ সালের সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হলেও তিনি জিততে না পেরে দল থেকে বেরিয়ে যান এবং তরিকত ফেডারেশন গঠন করেন। ২০০৫ সালের ৮ অক্টোবর হাফেজ আব্দুল মালেককে সভাপতি এবং হাফেজ মাওলানা নেছারুল হককে সাধারণ সম্পাদক করে ১৫১ সদস্যের কমিটি ঘোষণা করা হয়। পরে ২০১৯ সালের ৫ এপ্রিল মাওলানা শাহ মো. নেছারুল হককে আহ্বায়ক ও মাওলানা মো. নজরুল ইসলাম তালুকদারকে সদস্যসচিব এবং ৩৩ জন যুগ্ম আহ্বায়কসহ ১৩৬ সদস্য নিয়ে সর্বমোট ১৭১ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়। এই আহ্বায়ক কমিটি তিন মাসের মধ্যে সম্মেলন করে কেন্দ্রীয় পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করার কথা বলা হয়। কিন্তু তারা এখনো সেটি করতে পারেনি।

বিএনপির একাধিক নেতা জানান, বর্তমানে সংগঠনটির কর্মী সংখ্যা নেই বললেই চলে। এমনকি কমিটির ১৭১ নেতার মধ্যে সর্বোচ্চ ২০-২৫ জন মাঝেমধ্যে বিএনপির বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যোগ দেন। ইসলামবিরোধী কোনো ইস্যুতে রাজপথে নামা তো দূরের কথা, একটি বিবৃতিও দেননি দলের কেন্দ্রীয় নেতারা।

যদিও দলটির আহ্বায়ক মাওলানা নেছারুল হকের দাবি, সারা দেশে ৮৫টি সাংগঠনিক জেলার মধ্যে ৬৪ জেলায় আহ্বায়ক কমিটি গঠন করেছেন তাঁরা।

তিনি আরো বলেন, ‘গত সোমবার উত্তরায় মহাসচিবের বাসায় আমরা উলামা দল বসেছিলাম। সেখানে বর্ধিত সভা করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এ ছাড়া আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর উলামা দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে দলের প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের মাজার জিয়ারত ও ৩ অক্টোবর জাতীয় প্রেস ক্লাবে আমাদের আলোচনা হবে।’



সাতদিনের সেরা