kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১২ কার্তিক ১৪২৮। ২৮ অক্টোবর ২০২১। ২০ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

মালেক সহযোগীরা এখনো বহাল

► ২৬ হাজার টাকা বেতনের গাড়িচালকের পাঁচ কোটি টাকার সম্পদের প্রমাণ
► আরো কয়েক কোটি টাকা সরানোর আলামত চলছে তদন্ত

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২২ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



মালেক সহযোগীরা এখনো বহাল

আব্দুল মালেক ওরফে বাদল হাজি ছিলেন স্বাস্থ্য বিভাগের তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী। লেখাপড়া করেছেন অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত। ১৯৮২ সালে সাভারে একটি প্রকল্পের গাড়িচালক হিসেবে যোগ দেন তিনি। চার বছর চাকরির পর স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিবহন পুলে তাঁর চাকরি স্থায়ী হয়। গত বছরের ২০ সেপ্টেম্বর র‌্যাবের হাতে গ্রেপ্তারের আগে স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের পরিবহন পুলের গাড়িচালক মালেকের বেতন ছিল মাসে ২৬ হাজার টাকা। তবে তাঁর দামি পাজেরো গাড়ি, ২৪ ফ্ল্যাটের আলিশান বাড়ি, জমি, গরুর খামারসহ কোটি কোটি টাকার সম্পদের তথ্য পেয়েছেন তদন্তকারীরা। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে অস্ত্র ও বিশেষ ক্ষমতা আইনের মামলার তদন্ত করে র‌্যাবই আদালতে চার্জশিট দেয়।

এই তদন্তে উঠে এসেছে তাঁর অনেক অবৈধ সম্পদের তথ্য। গত ১৫ ফেব্রুয়ারি মালেক ও তাঁর স্ত্রী নার্গিস বেগমের বিরুদ্ধে দুই কোটি ৬০ লাখ টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং ৯৩ লাখ ৫৩ হাজার টাকার সম্পদের তথ্য গোপনের অভিযোগে দুটি মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। সে মামলার তদন্তে প্রমাণ মিলেছে, অভিযোগের চেয়ে দুই কোটি টাকা বেশি অর্থাৎ পাঁচ কোটি টাকারও বেশি সম্পদ অবৈধ। গতকাল দুই মামলায় ১৫ বছর করে তাঁর ৩০ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দুর্নীতির মামলার তদন্তও শেষ পর্যায়ে।

র‌্যাব, সিআইডি ও দুদকের সূত্র জানায়, পৈতৃক সম্পত্তি, গরুর খামার ও আত্মীয়-স্বজনের নামে আরো কিছু সম্পদ বৈধ বলে প্রমাণের চেষ্টা করেছে মালেকের পরিবার। ব্যাংক হিসাব থেকেও টাকা সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। দীর্ঘদিন স্বাস্থ্য এবং পরে গঠিত স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের শীর্ষ কর্মকর্তাদের গাড়িচালক থাকার সুযোগে তাঁদের সঙ্গে সখ্য গড়ে তোলেন তিনি। শীর্ষ কর্মকর্তাদের হাত করে নিয়োগ, বদলি, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পেনশনের টাকা তোলার নামে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে ড্রাইভার্স অ্যাসোসিয়েশন নামে সংগঠন করে ২০ বছর ধরে সেটির সভাপতি ছিলেন তিনি। ২০১৭ সাল থেকে সরকারি ড্রাইভারস অ্যাসোসিয়েশন নামের একটি জোট গঠন করে সেটিরও সভাপতি হন তিনি। তৃতীয়-চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের সংগঠনের নেতা পরিচয়ে দোর্দণ্ড প্রতাপে তদবির সিন্ডিকেট চালিয়েছেন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক (ডিজি) অধ্যাপক ডা. শাহ মনির হোসেনের সময় দুই বছরে অন্তত ১০০ জন স্বাস্থ্য সহকারী নিয়োগ দেন মালেক। দুই অধিদপ্তরের প্রশাসন ও পেনশন বিভাগে মালেকের সঙ্গে কাজ করতেন কয়েকজন। তাঁর সহযোগীরা অনেকে এখনো বহাল তবিয়তে আছেন।

সিআইডির সূত্র জানায়, মালেক একজন সরকারি কর্মচারী হওয়ায় তাঁর ব্যাপারে অনুসন্ধান করে কোনো মামলা করেনি সিআইডি। তবে র‌্যাবের চিঠি পেয়ে প্রাথমিক অনুসন্ধানের তথ্য তারা দুদককে দিয়েছে।

দুদকের পরিচালক (জনসংযোগ) প্রণব কুমার ভট্টাচার্য্য জানিয়েছেন, ১৫ ফেব্রুয়ারি করা এক মামলায় আব্দুল মালেকের বিরুদ্ধে এক কোটি ৫০ লাখ ৩১ হাজার ৮১০ টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং ৯৩ লাখ ৫৩ হাজার ৬৪৮ টাকার সম্পদের তথ্য গোপনের অভিযোগ আনা হয়েছে। দুদকের অনুসন্ধানে আব্দুল মালেকের মোট দুই কোটি ৯৯ হাজার টাকার সম্পদের তথ্য পাওয়া যায় বলে এ মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে মালেকের স্ত্রী নার্গিস বেগমের এক কোটি ১০ লাখ ৯২ হাজার ৫০ টাকার অবৈধ সম্পদ থাকার প্রমাণ পাওয়া যায়।

দুদকের সূত্র জানায়, পরবর্তী তদন্তে মালেক ও তাঁর স্ত্রীর পাঁচ কোটি টাকার বেশি মূল্যমানের অবৈধ সম্পদের খোঁজ পাওয়া গেছে। তাঁদের সাততলা বাড়ি, বিলাসবহুল ফ্ল্যাট, পাজেরো জিপ ও গরুর খামারের সন্ধান মিলেছে।

র‌্যাবের তদন্তকারীরা জানান, মালেকের আদি নিবাস কুমিল্লায়। তাঁর বাবা একসময় হাতিরপুল এলাকায় বসবাস করতেন। তিনি বড়ও হয়েছেন সেখানে। মালেকের বাবা সচিবালয়ে পিয়ন পদে চাকরি করতেন। অষ্টম শ্রেণি পাস মালেক ১৯৮২ সালে সাভারে একটি স্বাস্থ্য প্রকল্পে গাড়িচালক হিসেবে যোগ দেন। ১৯৮৬ সালে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিবহন পুলে তাঁর চাকরি স্থায়ী হয়। এরপর তিনি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডিজি এবং পরে স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের ডিজির গাড়িচালকের দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৯ সালের ১৮ জানুয়ারি থেকে ২০১০ সালের ১১ নভেম্বর পর্যন্ত সাবেক ডিজি অধ্যাপক ডা. শাহ মনির হোসেনের আমলে অন্তত ১০০ জন স্বাস্থ্য সহকারী নিয়োগে তদবির করেছেন মালেক।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বছরখানেক আগে বিদায়ি মহাপরিচালক আবুল কালাম আজাদের সঙ্গেও তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রশাসনিক কর্মকর্তা কবির হোসেন চৌধুরী, শাহজাহান ফকির, প্রধান সহকারী সৈয়দ জালাল, জাহাঙ্গীর হোসেন হাওলাদার ও জাকির হোসেন, হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা মজিবুল হক মুন্সি, ডাটা এন্ট্রি অপারেটর তোফায়েল আহমেদ ভুঁইয়া এবং স্বাস্থ্য শিক্ষা ব্যুরোর মাঠ কর্মকর্তা আমিনুল ইসলাম ছিলেন মালেকের সিন্ডিকেটের সদস্য। তাঁর ভাগ্নে সোহেল, ভায়রা মাহবুব হোসেন, শাহজাহান ড্রাইভার, মাইনুল হোসেন ড্রাইভার, রফিকুল ইসলাম ওরফে জামাল ড্রাইভার, উচ্চমান সহকারী নাসরিন আক্তার ও হিসাবরক্ষক আবদুল মতিন তাঁর সহযোগী হিসেবে কাজ করতেন। তাঁদের কয়েকজনের বিরুদ্ধে দুদকের তদন্ত চললেও তাঁরা চাকরিতে বহাল আছেন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কয়েকজন অসাধু কর্মকর্তা মালেকের মাধ্যমে অর্থ কামাতেন। নিজের স্ত্রী, মেয়ে ভায়রা, জামাতা, ভাগ্নেসহ ১০-১৫ জন আত্মীয়কে বিভিন্ন পদে চাকরি দিয়েছেন মালেক। তুরাগের দক্ষিণ কামারপাড়ায় রমজান মার্কেটের উত্তর পাশে ছয় কাঠা জমির ওপর সাততলার দুটি ভবনের নাম ‘হাজী কমপ্লেক্স’। সেখানে ২৪টি ফ্ল্যাট রয়েছে। এর একটি ভবনের তৃতীয় তলায় রাজকীয় দরজার এক আলিশান ফ্ল্যাটে থাকতেন তিনি। বাকি ফ্ল্যাটগুলো ভাড়া দিয়েছেন। মালেকের আরো ১০ থেকে ১২ কাঠা জায়গা রয়েছে। এর মধ্যে ধানমণ্ডি মৌজার হাতিরপুল এলাকায় সাড়ে চার কাঠা জমিতে ১০ তলা ভবন নির্মাণাধীন। তাঁর বড় মেয়ের নামে দক্ষিণ কামারপাড়া এলাকায় ১৫ কাঠা জায়গার ওপর একটি গরুর খামার রয়েছে।

সূত্র জানায়, তদন্তে মালেকের অবৈধ সম্পদের তথ্য পেয়ে র‌্যাব কর্মকর্তারা তা সিআইডি ও দুদককে দিয়েছেন। মালেক দাবি করেছেন, পৈতৃকভাবে অনেক সম্পদের মালিক হয়েছেন তিনি। তুরাগের যে একাধিক বাড়ি, তা একসময় ‘পানির দামে’ কিনেছেন। সেই জমি-বাড়ির দাম এখন কোটি কোটি টাকা হয়েছে।

 



সাতদিনের সেরা