kalerkantho

মঙ্গলবার । ৩ কার্তিক ১৪২৮। ১৯ অক্টোবর ২০২১। ১১ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

জলে ধাপ, দেশি স্বাদ

বানারীপাড়ার উমারেরপাড়ের ২০০ বছরের ঐতিহ্য

রফিকুল ইসলাম, বরিশাল   

২০ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে




জলে ধাপ, দেশি স্বাদ

যেদিকে চোখ যায় বিল আর বিল। একসময় সেগুলো কচুরিপনা, শেওলাসহ বিভিন্ন জলজ উদ্ভিদে ঠাসা থাকত। বলা হচ্ছে, বরিশালের বানারীপাড়ার বিষারকান্দি ইউনিয়নের উমারেরপাড় গ্রামের কথা। তাই বলে উমারেরপাড় গ্রামে চাষাবাদ হবে না! এসব জলজ উদ্ভিদকেই কাজে লাগালেন কৃষকরা। বের করলেন নতুন পদ্ধতি। সেগুলো স্তূপ করে পচিয়ে তৈরি করলেন পানিতে ভেসে থাকতে পারে এমন ধাপ (বেড)। এই ধাপের ওপরেই হচ্ছে চাষাবাদ।

প্রায় ২০০ বছর ধরেই বরিশালের অনেক নিচু এলাকায় ধাপ পদ্ধতিতে চাষাবাদ করা হচ্ছে। এমন চাষাবাদ হচ্ছে অনেক হাওর এলাকায়ও। নিচু এলাকাগুলোর হাজার হাজার হেক্টর জমি পতিত থাকার কথা, কিন্তু সেখানে এখন ভাসমান আবাদের সমারোহ। এতে কৃষকদের জীবনের এসেছে সচ্ছলতা, মুখে ফুটেছে হাসি।

ধাপ পদ্ধতি চাষাবাদে শুধু যে কৃষকরাই লাভবান হচ্ছেন, তা নয়। তাঁদের কারণে দেশি জাতের বীজ টিকে আছে। কৃষকরা সরকারি সহযোগিতা ছাড়াই দেশি জাতের বীজ বাঁচিয়ে রাখতে হাইব্রিডের সঙ্গে লড়ে যাচ্ছেন। 

বিশ্বকৃষির ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে ধাপ পদ্ধতির চাষাবাদ স্বীকৃতি পেলেও ধাপ চাষিদের জীবনমানের কোনো উন্নয়ন ঘটেনি। বানারীপাড়ার বিষারকান্দি ইউনিয়নের উমারেরপাড় গ্রামের অন্তত ২০০ কৃষক ধাপের সঙ্গে জড়িত রয়েছেন, কিন্তু তাঁদের মধ্যে চারজন কৃষিকার্ড পেয়েছেন।

স্থানীয় কৃষকরা জানান, জলাভূমিতে প্রথমে কচুরিপানা ও শেওলা স্তরে স্তরে সাজিয়ে দুই ফুট পুরু ধাপ বা ভাসমান বীজতলা তৈরি করা হয়। একেকটি ভাসমান ধাপ ৫০-৬০ মিটার লম্বা ও দেড় মিটার চওড়া হয়। ধাপে সরাসরি বীজ বপন করা যায় না। তাই কৃষকরা প্রতিটি বীজের জন্য এক ধরনের আধার তৈরি করেন। তাঁরা এর নাম দিয়েছেন ‘দৌল্লা’। দৌল্লার মধ্যে বিভিন্ন সবজির অঙ্কুরিত বীজ পুঁতে শুকনা জায়গায় রাখা হয়। এর আগে ভেজা জায়গায় বীজ অঙ্কুরিত করা হয়। দৌল্লাগুলো এভাবে তিন থেকে সাত দিন সারি করে রাখা হয়। এরপর ধাপে নিয়ে বসানো হয়। পাঁচ-ছয় দিন পর পর ধাপের নিচের কচুরিপানার মূল বা শেওলা দৌল্লার গোড়ায় বিছিয়ে দেওয়া হয়। একটি অঙ্কুর বীজতলায় রোপণ করার ২০-২২ দিনের মধ্যে

পূর্ণবয়স্ক চারা হয়ে ওঠে। ৫০-৬০ মিটারের একটি ধাপ তৈরিতে প্রায় ১০ হাজার টাকা খরচ হয়। চাষাবাদ শেষ হলে ওই পচা ধাপ বোরো চাষের আগে জমিতে জৈব সার হিসেবে ব্যবহার করেন চাষিরা।

এদিকে ধাপ পদ্ধতি চাষাবাদ দিন দিন বৃদ্ধি পাওয়ায় বানারীপাড়ার বিষারকান্দির খালে প্রতিদিন ভোরে বসছে ভাসমান হাট। এখানে ধাপ থেকে শুরু করে চারা তৈরির বিভিন্ন উপকরণ বিকিকিনি হচ্ছে। তবে ধাপ চাষিরা বলছেন, ভাসমান হাটে লোকজন বেড়াতে, ছবি তুলতেই বেশি আসছে। কিনছে হাতে গোনা কয়েকজন। তা ছাড়া যে জলাশয়ে ওই বাজার বসছে, সেখানকার পানি এখনো পরিষ্কার হয়নি। সেখানে ভাসছে প্লাস্টিকসহ নানা আবর্জনা। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মশার উপদ্রব। এর মধ্য দিয়েই কেনাবেচা করতে হচ্ছে তাঁদের।

পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অনুষদের সাবেক ডিন অধ্যাপক আ ক ম মোস্তফা জামান বলেন, ‘ধাপ চাষ পদ্ধতি বিশ্বকৃষির ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। তাই দেশের বিল অঞ্চলে এই পদ্ধতি অনুসরণ করে চাষাবাদ করা যেতে পারে। তাতে করে খাদ্য উৎপাদন বাড়বে। দেশি প্রজাতির বীজ সংরক্ষণে ধাপ চাষিরা যেটি করছেন—তা অকল্পনীয়।’



সাতদিনের সেরা