kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১২ কার্তিক ১৪২৮। ২৮ অক্টোবর ২০২১। ২০ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

১৬১ ইউপি ৯ পৌরসভায় ভোট কাল

শঙ্কায় প্রার্থী-ভোটাররা

মাঠে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী, প্রচার শেষ

কাজী হাফিজ   

১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



শঙ্কায় প্রার্থী-ভোটাররা

করোনা মহামারির কারণে স্থগিত প্রথম ধাপের ১৬১ ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) ও ৯ পৌরসভার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে আগামীকাল সোমবার। শনিবার মধ্যরাতেই শেষ হয়েছে সব ধরনের প্রচার। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে মাঠে নেমেছেন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সদস্যরা।

তবে সুষ্ঠু ভোট নিয়ে শঙ্কা আর উৎকণ্ঠায় রয়েছেন প্রার্থী ও ভোটাররা। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আশঙ্কা, বিএনপি এই নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী না দিলেও ক্ষমতাসীন দলের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা সহিংসতায় রূপ নিতে পারে।

এ ব্যাপারে নির্বাচন কমিশনার কবিতা খানম বলেছেন, ইউপি ভোট সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে তাঁরা বদ্ধপরিকর। কোথাও কোনো অনিয়ম হলে ছাড় দেওয়া হবে না।

এ নির্বাচনও বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতা মুক্ত নয়। বাগেরহাটে ৬৫টি ইউপির মধ্যে চেয়ারম্যান পদে আওয়ামী লীগের ৩৯ জন প্রার্থী এরই মধ্যে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন। খুলনার দাকোপের লাউডোবে আওয়ামী লীগের প্রার্থী একইভাবে জয়ী হয়েছেন। চট্টগ্রামের বোয়ালখালী পৌরসভায় মেয়র পদে আওয়ামী লীগের একক প্রার্থী থাকায় এ পদে ভোটের প্রয়োজন হচ্ছে না।

গত ৩ মার্চ প্রথম ধাপের ৩৭১টি ইউপির তফসিল ঘোষণা করা হয়েছিল। সে অনুযায়ী ভোট হওয়ার কথা ছিল গত ১১ এপ্রিল। কভিড-১৯ পরিস্থিতির কারণে ওই দিনের ভোট স্থগিত করা হয়। পরে গত ৩ জুন ভোটের তারিখ পুনর্নির্ধারণ করে ২১ জুন করা হয়। তবে সীমান্তবর্তী এলাকায় কভিড-১৯ পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় ১৬৭টি ইউপির ভোট আবারও স্থগিত রাখা হয়। গত ২১ জুন ২০৪টি ইউপিতে ভোট অনুষ্ঠিত হয়। প্রথম ধাপের স্থগিত ১৬৭টি ইউপির মধ্যে ১৬১ ইউপিতে ভোট হবে সোমবার। পাঁচটি ইউপির চেয়ারম্যান প্রার্থী মারা গেছেন এবং কক্সবাজারের একটি ইউপিতে আপাতত ভোট বন্ধ রাখার জন্য অনুরোধ থাকায় সেখানে ভোট হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন নির্বাচন কমিশন (ইসি) সচিব মো. হুমায়ুন কবীর খোন্দকার।

যে ১৬১ ইউপিতে ভোট : যেসব ইউপিতে ভোট হবে সেগুলো হচ্ছে—খুলনার কয়রার আমাদি, বাগালী, মহেশ্বরীপুর, মহারাজপুর, কয়রা, উত্তর বেদকাশী ও দক্ষিণ বেদকাশী। দাকোপের পানখালী, দাকোপ, লাউডোব, কৈলাশগঞ্জ, সুতারখালী, কামারখোলা, তিলডাঙ্গা, বাজুয়া ও বানিশান্তা। বটিয়াঘাটার গঙ্গারামপুর, বালিয়াডাঙ্গা ও আমিরপুর। দিঘলিয়ার গাজীরহাট, বারাকপুর, দিঘলিয়া, সেনহাটা, আড়ংঘাটা ও যোগীপুল। পাইকগাছার সোলাদানা, রাড়ুলী, গড়ইখালী, চাঁদখালী, দেলুটি, লতা ও কপিলমুনি।

বাগেরহাটের ফকিরহাটের বেতাগা, লখপুর, পিলজংগ, ফকিরহাট, বাহিরদিয়া, মানসা, নলধা মৌভোগ ও শুভদিয়া। মোল্লাহাটের উদয়পুর, চুনখোলা, কোদালিয়া, আটজুড়ি, গাওলা ও কুলিয়া। চিতলমারীর বড়বাড়িয়া, হিজলা, শিবপুর, চিতলমারী, চরবানিয়ারী, কলাতলা ও সন্তোষপুর। কচুয়ার গজালিয়া, ধোপাখালী, মঘিয়া, গোপালপুর, রাঢ়ীপাড়া ও বাধাল। রামপালের গৌরম্ভা, বাইনতলা, হুড়কা, মল্লিকের বেড়, বাঁশতলী, উজলপুর, রামপাল, পেড়িখালী ও ভোজপাতিয়া। মোংলার চাঁদপাই, বুড়িরডাঙ্গা, চিলা, মিঠাখালী, সোনাইলতলা ও সুন্দরবন। মোরেলগঞ্জের পঞ্চকরন, দৈবজ্ঞহাটী, চিংড়াখালী, হোগলাপাশা, বনগ্রাম, বলইবুনিয়া, হোগলাবুনিয়া, বহরবুনিয়া, নিশানবাড়িয়া, মোরেলগঞ্জ, তেলিগাতী, পুটিখালী, রামচন্দ্রপুর, জিউধরা, বারইখালী। শরণখোলার ধানসাগর, খোন্তাকাটা, রায়েন্দা, সাউথখালী। বাগেরহাট সদরের বারুইপাড়া, বেমরতা, বিষ্ণুপুর, ডেমা, কাড়াপাড়া, খানপুর ও রাখালগাছি।

সাতক্ষীরার কলারোয়ার কয়লা, হেলাতলা, যুগীখালী, জয়নগর, জালালাবাদ, লাঙ্গলঝাড়া, কেঁড়গাছি, সোনাবাড়িয়া, চন্দনপুর ও দেয়াড়া। তালার ধানদিয়া, তেঁতুলিয়া, তালা, ইসলামকাটি, মাগুরা, খেসরা, জালালপুর, খলিলনগর, নগরঘাটা, সরুলিয়া ও খলিষখালী।

নোয়াখালীর সুবর্ণচরের চরবাটা, চরক্লার্ক, চরওয়াপদা, চর আমানউল্যাহ, পূর্বচরবাটা ও মোহাম্মদপুর। হাতিয়ার মুছাপুর, চরহাজারী, চর ঈশ্বর, চরকিং, তমরদ্দি, সোনাদিয়া, বুড়িরচর, জাহাজমারা ও নিঝুমদ্বীপ।

চট্টগ্রামের সন্দ্বীপের বাউরিয়া, গাছুয়া, সন্তোষপুর, আমানউল্ল্যা, হরিশপুর, রহমতপুর, আজিমপুর, মুছাপুর, মাইটভাঙ্গা, সারিকাইত, মগধরা ও হারামিয়া।

কক্সবাজারের মহেশখালীর হোয়ানক, মাতারবাড়ী ও কুতুবজোম। কুতুবদিয়ার আলী আকবর ডেইল, বড়ঘোপ, দক্ষিণধুরং, কৈয়ারবিল, লেমশীখালী ও উত্তরধুরুং। পেকুয়ার টেটং। টেকনাফের হ্নীলা, সাবরাং, টেকনাফ ও হোয়াইক্যং।

যে ৯টি পৌরসভায় ভোট : কুমিল্লার নাঙ্গলকোট, ফরিদপুরের ভাঙ্গা, কক্সবাজারের চকরিয়া ও মহেশখালী, ফেনীর সোনাগাজী, নোয়াখালীর কবিরহাট, পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জ, যশোরের নওয়াপাড়া ও চট্টগ্রামের বোয়ালখালী।

নির্বাচনী এলাকার পরিস্থিতি : খুলনার পাঁচটি উপজেলার ৩৪টি ইউপিতে ভোট হতে যাচ্ছে। এর মধ্যে দাকোপের লাউডোবে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন আওয়ামী লীগ প্রার্থী শেখ যুবরাজ। এরই মধ্যে কয়রার দক্ষিণ বেদকাশি, পাইকগাছার সোলাদানায়, দাকোপের পানখালী, দিঘলিয়ার সেনহাটি, বটিয়াঘাটার আমিরপুর ইউনিয়নের সৈয়দের মোড়ে সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এতে প্রার্থীসহ অর্ধশতাধিক কর্মী-সমর্থক আহত হয়েছেন। নির্বাচনী সহিংসতায় একাধিক মামলা হয়েছে। এ জেলার ইউপিগুলোর বেশির ভাগে আওয়ামী লীগ ও দলটির বিদ্রোহী প্রার্থীদের মধ্যে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে স্থানীয় লোকজনের ধারণা। বটিয়াঘাটা, পাইকগাছা ও কয়রা উপজেলার পাঁচটি ইউপিতে বিএনপি সমর্থিত, দাকোপের একটিতে ওয়ার্কার্স পার্টির প্রার্থীর সঙ্গে ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীর প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

সাতক্ষীরার তালা ও কলারোয়ার ২৪টি ইউপির মধ্যে ২১টিতে ভোট হবে। তালায় আওয়ামী লীগ প্রার্থীর নির্বাচনী কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর ও কর্মীদের পিটিয়ে আহত করার অভিযোগ উঠেছে একই দলের বিদ্রোহী প্রার্থী আজিজুর রহমান রাজু ও তাঁর কর্মী-সমর্থকদের বিরুদ্ধ। এ ঘটনায় গোটা ইউনিয়নে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। যেকোনো সময় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা করছে এলাকাবাসী। সাতক্ষীরার এই দুই উপজেলায় আওয়ামী লীগের একজন দলীয় প্রার্থীর বিপক্ষে গড়ে প্রায় চারজন বিদ্রোহী প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।

নোয়াখালীর উপকূলীয় সুবর্ণচর ও হাতিয়া উপজেলার ১৩টি ইউনিয়নে ভোট হবে। এর মধ্যে সুবর্ণচরে ছয়টি ও হাতিয়া উপজেলায় সাতটি ইউনিয়নে ভোট হবে। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের বেশির ভাগই সরকারদলীয়। চেয়ারম্যান প্রার্থীদের অনেকেই নিজ দল আওয়ামী লীগের মনোনয়ন না পেয়ে বিদ্রোহ করে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন। এ কারণে দুটি উপজেলাতেই প্রার্থী এবং ভোটাররা সহিংসতার আশঙ্কা করছেন।

গত বুধবার রাতে সুবর্ণচর উপজেলার চরওয়াপদা ইউনিয়নের আল-আমিন বাজার ও চরকাজি মোখলেছ এলাকায় আওয়ামী লীগ প্রার্থী ও একই দলের বিদ্রোহী প্রার্থীর কর্মীদের মধ্যে হামলা ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এতে উভয় পক্ষের ছয়জন আহত হয়েছেন।

হাতিয়ায় এই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে কিছুদিন আগে দুজন মেম্বারপ্রার্থী খুন হয়েছেন। সেখানেও নির্বাচনে সরকারি দলের মনোনয়নবঞ্চিতদের পাশাপাশি স্বতন্ত্র প্রার্থীরা জয়লাভের জন্য সহিংস ঘটনায় জড়াচ্ছেন।

বাগেরহাটে দলের সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে প্রার্থী হওয়ায় জেলার তিন উপজেলায় ২৩ জন নেতাকর্মীকে দল থেকে সাময়িকভাবে বহিষ্কার করা হয়েছে। চিতলমারী উপজেলায় এরই মধ্যে ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীর প্রচার কার্যালয় ভাঙচুর, পোস্টার ছেঁড়া ও কর্মীদের মারধরের ঘটনা ঘটেছে। এ অবস্থায় ভোটারদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে।

(প্রতিবেদনটি তৈরিতে সংশ্লিষ্ট এলাকার নিজস্ব প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিরা সহযোগিতা করেছেন)



সাতদিনের সেরা