kalerkantho

সোমবার । ৯ কার্তিক ১৪২৮। ২৫ অক্টোবর ২০২১। ১৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

মিয়ানমারে ইয়াবার ল্যাবে তৈরি আইস আসছে দেশে

বন্ধের উদ্যোগ না নিয়ে উল্টো দায় চাপানোর ফন্দি মিয়ানমারের

এস এম আজাদ   

১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে




মিয়ানমারে ইয়াবার ল্যাবে তৈরি আইস আসছে দেশে

১০ বছর ধরে মিয়ানমারের দায়িত্বশীলদের ইয়াবা তৈরির ল্যাব ও পাচারের রুটের ব্যাপারে তথ্য দিয়ে আসছে বাংলাদেশ। গত বছরের ডিসেম্বরেও চতুর্থ দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে ৩৭ ল্যাব ও ১২ কারবারির ব্যাপারে তথ্য দেওয়া হয়। সর্বশেষ বৈঠকে মিয়ানমার প্রথমবারের মতো ইয়াবা জব্দের তথ্য দিলেও গত ৯ মাসে ল্যাব শনাক্ত করে কারবারিদের গ্রেপ্তারের উদ্যোগ নেয়নি দেশটির আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী। কয়েকটি গোয়েন্দা সূত্র জানিয়েছে, মিয়ানমার সীমান্তের রাখাইন, মংডু ও শান এলাকায় যেখানে ইয়াবা বানানোর কারখানা রয়েছে, সেসব এলাকা থেকেই ইয়াবা আসছে। একই সঙ্গে ওই সব এলাকা ও রুট দিয়েই আসছে ক্রিস্টাল মেথ বা আইস। এই নতুন মাদক নিয়েও উত্কণ্ঠা তৈরি হয়েছে। উল্টো বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ‘রহস্যজনক অভিযোগ’ তুলেছে মিয়ানমারের প্রশাসন।

দেশটির সেন্ট্রাল কমিটি ফর ড্রাগ অ্যাবিউজ কন্ট্রোলের (সিসিডিএসি) এক চিঠিতে বলা হয়, মিয়ানমারে জব্দ করা ইয়াবা চীন ও ভারতের পাশাপাশি বাংলাদেশ থেকে যাচ্ছে! এর জবাবে বাংলাদেশের মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি) জানিয়েছে, বাংলাদেশে ইয়াবার উপাদান সিউডোফেড্রিন নিষিদ্ধ। কারবার ও রুট বন্ধের ব্যাপারে তাগিদ দিয়ে কড়া জবাব দিয়েছে বাংলাদেশ। তবে সে বিষয়ে আশানুরূপ কোনো অগ্রগতি নেই। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, আগেও মিয়ানমারের প্রতিনিধিরা দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের যৌথ স্মারকে স্বাক্ষর করেননি। পরবর্তী সময়ে তাঁরা বিভিন্ন অজুহাতে ইয়াবা তৈরির ল্যাবের অস্তিত্ব পায়নি বলে জানায়। মাদক কারবারের রুট নিয়ন্ত্রণে আন্তর্জাতিক চাপ এড়াতে মিয়ানমার এবার আরো কৌশলী আচরণ করছে। বাংলাদেশে কঠোর অবস্থান থাকার পরও এমন অবস্থায় ইয়াবা ও আইসের জোগান কমছে না। আবার চাঙ্গা হয়ে উঠেছে কারবার। সীমান্তে কঠোর নজরদারির পাশাপাশি মিয়ানমারের সহায়তা পেতে যোগাযোগ বাড়ানো হয়েছে।

জানতে চাইলে ডিএনসির মহাপরিচালক (ডিজি) আব্দুস সবুর মণ্ডল বলেন, ‘মিয়ানমারের সঙ্গে আমরা যোগাযোগ করে বারবার অনুরোধ করছি, কিন্তু তারা সেভাবে সহায়তা করে না। যৌথ স্মারকে স্বাক্ষর করে না। যা বলে, তা-ও করে না। আমরা যোগাযোগ বাড়িয়ে চেষ্টা করে যাচ্ছি।’ তিনি আরো বলেন, ‘এখনো ইয়াবা আসছে। আইস আসছে বলেও তথ্য পেয়েছি আমরা। একই এলাকা ও রুট দিয়ে আসছে। আমরা সীমান্তে ঢুকলে ধরার চেষ্টা করছি।’

গত বছরের ১৫ ডিসেম্বর মাদকপাচার প্রতিরোধে বাংলাদেশ-মিয়ানমার চতুর্থ দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এই বৈঠকেই প্রথম মিয়ানমারের পক্ষ থেকে সে দেশে ইয়াবার কাঁচামাল পাওয়া যাচ্ছে বলে স্বীকার করা হয়। শান, রাখাইন ও মংডু প্রদেশে ২০২০ সালের ১১ মাসে ৩১ কোটি ৪০ লাখ ইয়াবা উদ্ধার হয়েছে। সিসিডিএসি মিয়ানমার প্রতিনিধিরা দাবি করে, চীন ও থাইল্যান্ড থেকে চোরাকারবারিরা তাদের দেশে ইয়াবা তৈরির কাঁচামাল সিউডোফেড্রিন নিয়ে আসছে। তবে বৈঠকের আগে দেওয়া চিঠিতে তারা দাবি করে, বাংলাদেশ থেকেও যাচ্ছে ইয়াবা! এখান থেকে নাকি গাঁজা ও ইজজেকটিং ড্রাগও মিয়ানমারে পাচার হচ্ছে। ওই চিঠির জবাবে ডিএনসি কড়া ভাষায় জানায়, আগে ওষুধের কাঁচামাল হিসেবে সামান্য পরিমাণ আমদানি হলেও ২০১৭ সাল থেকে সিউডোফেড্রিন আমদানি, প্রসেসিং, বিক্রি, ওষুধ থেকে সংগ্রহ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ইয়াবায় বাংলাদেশ চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। তাই মিয়ানমারকে পদক্ষেপ নেওয়ার তাগিদ দেওয়া হয়। পর পর বৈঠকে তারাও ইয়াবা জব্দের খবর দেয়, কিন্তু ওই ল্যাব বা কারখানার ব্যাপারে ছিল নীরব। 

সূত্র জানায়, গোয়েন্দা সূত্রে বরার দিয়ে ল্যাব, কারবারি ও রুটের ব্যাপারে অবহিত করা হলেও মিয়ানমারের পক্ষ থেকে সাড়া মিলছে না। এ কারণে সম্প্রতি যোগাযোগ বাড়ানো হয়েছে। চলতি বছর পঞ্চম দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের দিনক্ষণ নির্ধারণের তাগিদও আছে।

সূত্র জানায়, সীমান্ত এলাকায় বাড়ির ছোট জায়গায় কিচেন ল্যাবের আদলে পরিচালিত কারখানাগুলো মিয়ানমারের বিভিন্ন বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন ও মাদক কারবারিরা পরিচালনা করছে। অলোচনা হলে তারা বাড়ি বদল করলেও এলাকা বদলায় না। মিয়ানমারের সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতাবাদী বিদ্রোহী গ্রুপ কাচিন ডিফেন্স আর্মির (কেডিআই) ১০টি ইয়াবা কারখানা রয়েছে। এই বাহিনীর নিয়ন্ত্রিত কুখাই এলাকায় পানসাই খেও মেও ইয়াং মৌলিয়ান গ্রুপের অধীনে সীমান্ত এলাকা নামখামে দুটি, হো স্পেশাল পিলিস জে হোলি ট্রাক্ট গ্রুপের অধীনে কুনলং এলাকায় একটি, মং মিল্লিটা শান স্টেট আর্মির (নর্থ) অধীনে ১ নম্বর ব্যারিকেড ট্যানগিয়ান এলাকায় একটি, আনজু গ্রুপের একটি, শান ন্যাশনালিটিজ পিপল লিবারেশন (এসএনপিএল) গ্রুপের নামজাং এলাকায় দুটি, একই গ্রুপের মাহাজা ও হোমোং এলাকায় দুটি, ইউনাইটেড ?উই স্টেট আর্মি (ইউডাব্লিউএসএ) গ্রুপের মংটন এলাকায় তিনটি, একই গ্রুপের মংসাত এলাকায় আরো দুটি এবং ত্যাছিলেক এলাকায় তিনটি, মংইয়াং এলাকায় চারটি কারখানা রয়েছে। এ ছাড়া এই গোষ্ঠীর পাংসাং এলাকায় দুটি কারখানা রয়েছে বলে তালিকায় উল্লেখ আছে। শান ন্যাশনাল পিপল আর্মির মওখামি এলাকায় দুটি এবং মিয়ানমার ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক অ্যালিন্স আর্মির (এমএনডিএ) কোকান এরিয়ায় একটি ইয়াবা তৈরির কারখানা রয়েছে। 

সূত্র মতে, কারখানার তালিকার সঙ্গে বাংলাদেশে নিয়মিত ইয়াবার চালান পাঠায়, এমন ১২ মাদক কারবারিকেও দ্রুত আইনের আওতায় আনার আহবান জানিয়ে আসছে ডিএনসি। মিয়ানমারের সেই ১২ রোহিঙ্গা নাগরিক হলো মংডুর মংগোলা এলাকার সাফিউর রহমানের ছেলে আলম, মংডুর আকিয়াব এলাকার কেফায়েত আলীর ছেলে সাঈদ, মংডুর গাজুবিল এলাকার মৃত আহম্মেদের ছেলে কালাসোনা, বাদগাজুবিলিং এলাকার আব্দুল মোতালেবের ছেলে নূর, মংডুর করীমের ছেলে মহিবুল্লাহ, দইলাপাড়া এলাকার মৃত আমির আহম্মেদের ছেলে আব্দুর রশীদ, গুনাপাড়া এলাকার বাদলের ছেলে হারুন, সুদাপাড়া এলাকার নুরুল ইসলামের ছেলে আলী জহুর, ফাইজাপাড়া এলাকার মৃত আবু বক্কর সিদ্দিকের ছেলে সৈয়দ করীম, গুনাপাড়া এলাকার আলী আহম্মেদের ছেলে জায়ার এবং সাফিউর রহমানের ছেলে শাফি।

 



সাতদিনের সেরা