kalerkantho

সোমবার । ৯ কার্তিক ১৪২৮। ২৫ অক্টোবর ২০২১। ১৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

ময়মনসিংহের আলেকজান্ডার ক্যাসল

ঐতিহ্যের কুটির ক্ষয়ে যাচ্ছে

নিয়ামুল কবীর সজল, ময়মনসিংহ   

১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



ঐতিহ্যের কুটির ক্ষয়ে যাচ্ছে

ময়মনসিংহ নগরীতে যে কটি ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা আছে তার মধ্যে অন্যতম হলো আলেকজান্ডার ক্যাসল বা আলেকজান্দ্রা ক্যাসল। স্থানীয়ভাবে একে লোহার কুটিরও বলা হয়। সরকারি দপ্তরের তথ্য মতে, ১৮৭৯ সালে লোহা ও কাঠ দিয়ে তৈরি করা হয় দৃষ্টিনন্দন এই ভবন। ব্রহ্মপুত্র নদের পাশের এই ভবনে থেকেছেন মহাত্মা গান্ধী, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরসহ বহু গুণীজন। বিখ্যাত ্বহু মানুষের স্মৃতি জড়িয়ে আছে ভবনটিতে।

অথচ বহু বছর ধরে কোনো সংস্কারকাজ না হওয়ায় স্থাপনাটি দিনে দিনে ধ্বংসের পথে চলেছে। এরই মধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ভবনটির বেশ কিছু অংশ। চারদিকে সীমানাপ্রাচীর না থাকায় ভবনটি অনেকটা অরক্ষিত। অবহেলা-অনাদরে এর চেহারা এখন ম্লান। ঐতিহাসিক এই ভবন বর্তমানে টিচার্স ট্রেনিং কলেজের গ্রন্থাগার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ২০১৮ সালে স্থাপনাটি প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের সংরক্ষিত স্থাপনা হিসেবে গেজেটভুক্ত হলেও এর কাজ এখনো শুরু হয়নি। গবেষকদের মতে, যত দ্রুত এই ভবনটির উন্নয়ন ও সংস্কারকাজ করা যাবে ততই মঙ্গল।

জানা যায়, মুক্তাগাছার জমিদার মহারাজা সূর্যকান্ত আচার্য চৌধুরী শহরের জুবিলি উৎসব পালনের জন্য তৎকালীন ভারত সম্রাট সপ্তম এডওয়ার্ড পত্নী আলেকজান্দ্রার নামে দোতলা এই ভবন নির্মাণ করেন। মতান্তরে ময়মনসিংহের তৎকালীন ইংরেজ কালেক্টর আলেকজান্ডার আইসিএসের নামে এটি নির্মিত হয়। সে সময় এই ভবন নির্মাণে ব্যয় হয় ৪৫ হাজার টাকা। ভবনটি নির্মাণে লোহার ব্যবহার বেশি থাকার কারণেই স্থানীয়ভাবে একে লোহার কুটিরও বলা হয়। ভূমিকম্পের ঝুঁকি থেকে রক্ষা পেতেই এভাবে ভবনটি বানানো হয়েছে বলে গবেষকদের ধারণা।

ভবনটি মহারাজা সূর্যকান্ত আচার্যের বাগানবাড়ি হিসেবে ব্যবহৃত হতো। এ ভবন ঘিরে ১৯৪৮ সালে ২৭.১৫ একর জায়গায় প্রতিষ্ঠিত হয় টিচার্স ট্রেনিং কলেজ। শুরুতে আলেকজান্ডার বা আলেকজান্দ্রা ক্যাসলটি টিচার্স ট্রেনিং কলেজের শ্রেণিকক্ষ হিসেবে ব্যবহৃত হতো। পরে কলেজের ভবন বাড়লে ক্যাসলের দোতলায় শিক্ষকরা বসবাস শুরু করেন। এরপর দীর্ঘদিন ধরে ভবনটি কলেজের গ্রন্থাগার হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। নিচতলার আটটি কক্ষ কলেজের গ্রন্থাগার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে, যেখানে প্রায় ১৫ হাজার বই রয়েছে।

আগে ভবনটির সামনে ও চারপাশে ছিল ফোয়ারা, ছিল ৯টি ভাস্কর্য। লোহার ভবন, অসংখ্য ব্রোঞ্জ ও পাথরের ভাস্কর্য এবং দুর্লভ প্রজাতির গাছের কারণে এই ভবন ঘিরে তৈরি হয়েছিল এক অনন্য মোহনীয় পরিবেশ। নজরদারির অভাবে ভাস্কর্যগুলো কোনোটার অঙ্গহানি হয়েছে, কোনোটা চুরি হয়ে গেছে। ভবনের লোহার পাত, পিলার কিংবা রডগুলোতে রঙের আঁচড় পড়েনি বহুদিন। দোতলা পুরোপুরি ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। এ ছাড়া বর্তমানে ভবনটির আশপাশে একাধিক সরকারি প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠলেও এর প্রাকৃতিক ও নিরিবিলি পরিবেশ এখনো দর্শনার্থীদের মনে অন্যরকম শান্তি এনে দেয়।

ঐতিহাসিক এই ভবনটিতে বিভিন্ন সময় এসেছেন, থেকেছেন, রাত কাটিয়েছেন বহু গুণী মানুষ। ১৯২৬ সালে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ময়মনসিংহ সফরে এসে ভবনটিতে চার দিন অবস্থান করেছিলেন। একই বছর এখানে এসেছিলেন মহাত্মা গান্ধী। এসেছিলেন লর্ড কার্জন, চিত্তরঞ্জন দাশ, নওয়াব স্যার সলিমুল্লাহ, কামাল পাশা, মৌলভী ওয়াজেদ আলী খান পন্নী, নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু প্রমুখ।

ভবনটি সম্পর্কে ময়মনসিংহের প্রত্নতত্ত্ব গবেষক ও ছড়াকার স্বপন ধর বলেন, রাজা সপ্তম এডওয়ার্ড যখন ময়মনসিংহে এসেছিলেন, তখন তাঁর সঙ্গী ছিলেন স্ত্রী আলেকজান্দ্রা। সেই আলেকজান্দ্রার নামানুসারেই এ দোতলা ভবনটির নামকরণ করা হয়। মিয়ানমার থেকে সেগুন কাঠ আর চীন থেকে কারিগর এনে এ ভবনটি তৈরি করা হয়েছিল। ভবনটিতে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা ছিল। ওই সময় এই নগরীতে আসা বিদেশি সম্ভ্রান্ত অতিথিরা ভবনটিতে উঠতেন।

স্বপন ধর বলেন, যত দ্রুত এই ভবনটি সংরক্ষণ করা যাবে, ততই মঙ্গল। এ ভবনের সঙ্গে এই নগরীতে আসা বহু গুণী মানুষের স্মৃতি জড়িয়ে আছে। সেগুলোও প্রচার করা দরকার।

প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের একটি সূত্র জানায়, ময়মনসিংহের আলেকজান্ডার ক্যাসেলসহ ঐতিহ্যবাহী বেশ কয়েকটি স্থাপনা প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের গেজেটে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এটি সংরক্ষিত পুরাকীর্তি। দর্শনীয় হিসেবে গড়ে তোলার কাজ শুরু করার কথা থাকলেও করোনার জন্য সম্ভব হচ্ছে না। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেই সংশ্লিষ্ট কমিটি সংস্কারকাজ শুরুর উদ্যোগ নেবে।



সাতদিনের সেরা