kalerkantho

বুধবার । ৭ আশ্বিন ১৪২৮। ২২ সেপ্টেম্বর ২০২১। ১৪ সফর ১৪৪৩

নতুন শিক্ষাক্রম বাস্তবায়নে চ্যালেঞ্জ অনেক

► প্রশিক্ষণের মাধ্যমে শিক্ষকদের যুগোপযোগী করতে হবে
► শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রস্তুত করতে হবে
► শিক্ষায় বিনিয়োগ আরো বাড়াতে হবে

শরীফুল আলম সুমন   

১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



নতুন শিক্ষাক্রম বাস্তবায়নে চ্যালেঞ্জ অনেক

বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আধুনিক ও যুগোপযোগী শিক্ষা নিশ্চিত করতে ২০২৩ সাল থেকে বদলে যাবে শিক্ষাব্যবস্থা। এরই মধ্যে নতুন শিক্ষাক্রমের খসড়া রূপরেখার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এতে পরীক্ষানির্ভরতা কমিয়ে শিখনকালীন মূল্যায়নে জোর দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ শ্রেণিকক্ষেই একজন শিক্ষক তাঁর শিক্ষার্থীকে মূল্যায়ন করবেন। কিন্তু কিছু শিক্ষকের মান নিয়ে প্রশ্ন আছে। তাঁদের প্রশিক্ষণ দিয়ে যুগোপযোগী করা না গেলে নতুন শিক্ষাক্রম বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়বে।

শিক্ষাবিদরা বলছেন, নতুন শিক্ষাক্রম বাস্তবায়নে একাধিক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। প্রথমত, শিক্ষকদের প্রস্তুত করতে হবে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ দিয়ে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো যুগোপযোগী করে প্রস্তুত করতে হবে। শুধু ঢাকা শহরের প্রতিষ্ঠানগুলোর দিকে তাকালে হবে না। মফস্বল ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের স্কুলগুলোর দিকেও তাকাতে হবে। শিক্ষায় বিনিয়োগ আরো বাড়াতে হবে। আর এই বিনিয়োগ ব্যবহারে স্বচ্ছতা থাকতে হবে।

জানা যায়, ইউনেসকো দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষা খাতে জিডিপির ৬ শতাংশ অথবা মোট বাজেটের ২০ শতাংশ বরাদ্দের কথা বলে আসছে। তবে বরাদ্দ একবারে ২০ শতাংশ দেওয়া সম্ভব না হলেও অন্তত জাতীয় বাজেটের ১৫ শতাংশ বরাদ্দের কথা বারবার বলে আসছেন শিক্ষাবিদরা। কিন্তু কয়েক বছর ধরেই শিক্ষায় বরাদ্দ ১২ শতাংশের আশপাশেই ঘুরপাক খাচ্ছে। চলতি অর্থবছরেও শিক্ষায় বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১১.৯২ শতাংশ।

তিন বছর আগে প্রকাশিত মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা (মাউশি) অধিদপ্তরের সর্বশেষ একাডেমিক সুপারভিশন রিপোর্ট অনুযায়ী, ৪০.৮১ শতাংশ শিক্ষক নিজেরা সৃজনশীল প্রশ্নপত্র প্রণয়ন করতে পারেন না। অন্য বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সহায়তায় প্রশ্নপত্র প্রণয়ন করেন ২৫.৯৯ শতাংশ শিক্ষক। আর বাইরে থেকে প্রশ্ন প্রণয়ন করেন ১৪.৮৩ শতাংশ শিক্ষক।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, যে শিক্ষক নিজে প্রশ্নই করতে পারেন না, তিনি কিভাবে শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন করবেন। অথচ নতুন শিক্ষাক্রমে শিক্ষকদের হাতেই বেশির ভাগ নম্বর রাখা হয়েছে। তাই কারিকুলাম বাস্তবায়নের আগে অবশ্যই শিক্ষকদের যথাযথভাবে প্রশিক্ষিত করে তুলতে হবে। এ ছাড়া শিক্ষকরা শুধু ক্লাসে পড়িয়ে গেলেই হবে না, ওই শিক্ষার্থী বিষয়টি বুঝল কি না তা-ও শিক্ষককেই নিশ্চিত করতে হবে। নয়তো নতুন কারিকুলাম বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়বে।

শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কায়কোবাদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘শিক্ষায় অনেক বড় পরিবর্তন আনা হচ্ছে। এই পরিবর্তনের আগে যথেষ্ট গবেষণা করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে শিক্ষায় বিনিয়োগও বাড়াতে হবে। নতুন শিক্ষাক্রম বাস্তবায়নে শিক্ষায় বিনিয়োগ বাড়ানো আরো বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। অত্যন্ত ভালো পাঠ্য পুস্তক প্রণয়ন করতে হবে। পাঠদানে পরিবর্তন আনতে হবে। পাঠদানের সঙ্গে প্রযুক্তি যুক্ত করতে হবে।’

স্বাধীনতা শিক্ষক পরিষদের (স্বাশিপ) সাধারণ সম্পাদক অধ্যক্ষ শাহজাহান আলম সাজু কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সরকার শিক্ষাব্যবস্থা ঢেলে সাজানোর যে উদ্যোগ নিয়েছে, তাকে আমরা স্বাগত জানাই। তবে এর সফল বাস্তবায়ন করতে হলে শিক্ষায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। শিক্ষকদের মান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মান বাড়াতে হবে। মান বাড়াতে হলে শিক্ষকদের মর্যাদা ও বেতন বাড়াতে হবে। আর এ জন্য শিক্ষাব্যবস্থা জাতীয়করণের কোনো বিকল্প নেই।’

জানা যায়, ১০০ প্রাথমিক বিদ্যালয় ও ১০০ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের মাধ্যমে আগামী বছর থেকে নতুন শিক্ষাক্রমের পাইলটিং শুরু হবে। ২০২৩ সালে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণি এবং ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে শিক্ষাক্রম বাস্তবায়ন শুরু হবে। ২০২৪ সালে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণি এবং অষষ্টম ও নবম শ্রেণি এই শিক্ষাক্রমের আওতায় আসবে। ২০২৫ সালে পঞ্চম ও দশম শ্রেণি যুক্ত হবে। ২০২৬ সালে একাদশ ও ২০২৭ সালে দ্বাদশ শ্রেণি যুক্ত হবে।

রূপরেখায় বলা হয়েছে, শিক্ষাক্রমের রূপরেখায় প্রাক-প্রাথমিক পর্যায় থেকে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত শতভাগ শিখনকালীন মূল্যায়ন। চতুর্থ থেকে পঞ্চম শ্রেণিতে বাংলা, ইংরেজি, গণিত, বিজ্ঞান ও সামাজিকবিজ্ঞান বিষয়ে ৬০ শতাংশ শিখনকালীন মূল্যায়ন ও ৪০ শতাংশ সামষ্টিক মূল্যায়ন। এ ছাড়া জীবন ও জীবিকা, ডিজিটাল প্রযুক্তি, শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য এবং সুরক্ষা, ধর্ম শিক্ষা এবং শিল্প ও সংস্কৃতি বিষয়ে শতভাগ শিখনকালীন মূল্যায়ন থাকবে। অর্থাৎ পাঁচটি বিষয়ে ৪০ নম্বরের পরীক্ষা হবে। আর বাকি সব নম্বরই থাকবে শিক্ষকদের হাতে।

নবম ও দশম শ্রেণিতে বাংলা, ইংরেজি, গণিত, বিজ্ঞান ও সামাজিকবিজ্ঞান বিষয়ে ৫০ শতাংশ শিখনকালীন মূল্যায়ন ও ৫০ শতাংশ সামষ্টিক মূল্যায়ন থাকবে। এ ছাড়া জীবন ও জীবিকা, ডিজিটাল প্রযুক্তি, শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য এবং সুরক্ষা, ধর্ম শিক্ষা এবং শিল্প সংস্কৃতি বিষয়ে শতভাগ শিখনকালীন মূল্যায়ন হবে। ফলে এসব শ্রেণিতেও পাঁচটি বিষয়ে ৫০ নম্বরের পরীক্ষা হবে। বাকি সব মূল্যায়নই করবেন শিক্ষকরা। একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণিতে আবশ্যিক বিষয়ে ৭০ শতাংশ সামষ্টিক অর্থাৎ পরীক্ষার মাধ্যমে মূল্যায়ন করা হবে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত শ্রেণিকক্ষের মূল্যায়নে বার্ষিক পরীক্ষার চেয়েও বেশি নম্বর রাখা হয়েছে। আর দশম শ্রেণিতেও ৫০ শতাংশ। কিন্তু শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ বড় একটি চ্যালেঞ্জ। আর সব শিক্ষক কতটা নিরপেক্ষভাবে এই মূল্যায়ন করবেন, সেটা নিয়েও নানা প্রশ্ন তৈরি হতে পারে। তাই শুরুতে শ্রেণিকক্ষের মূল্যায়নে কম নম্বর রেখে ধীরে ধীরে তা বাড়ানো যেতে পারে।

মাউশি অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশিক্ষণ) ড. প্রবীর কুমার ভট্টাচার্য কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নতুন শিক্ষাক্রমের কারিকুলাম প্রণয়নের পর জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্য পুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) থেকে উপজেলাভিত্তিক মাস্টার ট্রেইনার তৈরি করে দেওয়া হবে। এরপর আমরা তাঁদের মাধ্যমে সারা দেশের শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দিব। আমরা আগামী বছরের মধ্যেই নতুন কারিকুলামের উপযোগী করে শিক্ষকদের তৈরি করতে পারব। এ ছাড়া আইসিটি, কারিকুলামভিত্তিক যেসব প্রশিক্ষণ কার্যক্রম রয়েছে সেগুলোও চলমান থাকবে।’



সাতদিনের সেরা