kalerkantho

রবিবার । ১ কার্তিক ১৪২৮। ১৭ অক্টোবর ২০২১। ৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

কালের কণ্ঠে দুর্নীতি নিয়ে খবর

পিডিবিএফের আমিনুল ও মনারুলের নামে বিভাগীয় মামলা

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



পিডিবিএফের আমিনুল ও মনারুলের নামে বিভাগীয় মামলা

অবশেষে পল্লী দারিদ্র্য বিমোচন ফাউন্ডেশনের (পিডিবিএফ) দুর্নীতির মানিকজোড় বলে খ্যাত পরিচালক আমিনুল ইসলাম ও যুগ্ম পরিচালক মনারুল ইসলামের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করা হয়েছে। পিডিবিএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুহম্মদ মউদুদউর রশীদ সফদার বিষয়টি কালের কণ্ঠকে নিশ্চিত করেছেন।

পিডিবিএফ ব্যবস্থাপনা পরিচালক জানান, বিভাগীয় মামলার পর দুজনই জবাব দাখিল করেছেন। নোটিশ ইস্যু থেকে ১৮০ দিনের মধ্যে বিভাগীয় মামলা নিষ্পত্তি করার কথা বলা হয়েছে। তিনি জানান, অভিযোগ প্রমাণিত হলে গুরুদণ্ডের মধ্যে রয়েছে চাকরিচ্যুতি। লঘুদণ্ড হলে তার মধ্যে আছে তিরস্কার, নির্দিষ্ট মেয়াদে বেতন বৃদ্ধি স্থগিত, বেতনক্রম এক ধাপ কিংবা সর্বনিম্ন স্তরে নামিয়ে দেওয়া, পদাবনতি (ডিমোশন) করা, আর্থিক ক্ষতি করলে আদায় করা। চাকরিচ্যুত হলে গ্র্যাচুইটিসহ অনেক সুবিধা থেকে বঞ্চিত হতে পারেন।

মন্ত্রণালয়ের তদন্ত, অডিট রিপোর্ট এবং বাংলাদেশ ব্যাংক আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিটের রিপোর্টে অভিযোগের প্রমাণ পাওয়া গেলেও দুজন দায়িত্বে বহাল রয়েছেন। এর কারণ জানতে চাইলে পিডিবিএফ ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, ‘অনেক অভিযোগের প্রমাণ রয়েছে এ কথা সঠিক। প্রথাগতভাবে এমন অভিযোগে কোথাও সাময়িক বরখাস্ত করা হয়, কখনো কর্মহীন করে রাখা হয়। ইস্যুটি পিডিবিএফ বোর্ডে উত্থাপিত হয়েছিল, বোর্ড মনে করেছে কোনো একজন কর্মকর্তাকে কর্মহীনভাবে রাখলে প্রতিষ্ঠানের ক্ষতি, তাই ভালো হচ্ছে আর্থিকভাবে কম গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় রাখা। সে কারণে আমিনুল ইসলামকে মাঠ পরিচালক থেকে সরিয়ে নতুন ইউনিট গবেষণা ও উন্নয়ন বিভাগের পরিচালক হিসেবে রাখা হয়েছে। অনেক কম লোকবল ও সম্পদ পরিচালনা করবেন তিনি।’

আরেক প্রশ্নের জবাবে ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, ‘প্রবিধানমালায় রয়েছে বিভাগীয় মামলা পরিচালনার ক্ষেত্রে অভিযুক্তের নিম্নপদস্থ কোনো কর্মকর্তা থাকতে পারবে না। পিডিবিএফএ আমিনুল ইসলামের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা একমাত্র আমি, আমি যেহেতু নিয়োগকারী, তাই আমি হতে পারব না। মন্ত্রণালয় থেকে কাউকে নিয়োগ দিয়ে সঙ্গে পিডিবিএফের লোকজন থাকবে। অন্যদিকে যুগ্ম পরিচালক মনারুল ইসলামের বিষয়ে পিডিবিএফ থেকেই কমিটি হবে।’

জানা যায়, পিডিবিএফের ৮৪তম বোর্ডসভায় (১৭ জুন ২০২১) বিভাগীয় মামলা করার সিদ্ধান্ত হয়। পরিচালক আমিনুল ইসলামের বিরুদ্ধে করা মামলায় চার দফা অভিযোগ আনা হয়েছে। নোটিশে বলা হয়েছে, আমিনুল ইসলাম ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক থাকার সময় নিজের কম্পানির মাধ্যমে কাজ করেছেন। প্রকল্প বাস্তবায়নে বাজার দরের তুলনায় দ্বিগুণ খরচ দেখিয়েছেন। চাকরি প্রবিধানমালা ৪/২০২১-এর ৪১-এর (ঙ) উপ-প্রবিধান মতে দুর্নীতিজনিত নৈতিক স্খলন এবং প্রবিধান ৪১-এর (ঘ) উপ-প্রবিধান মতে শাস্তিযোগ্য অপরাধ করেছেন। এ ছাড়া ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে আর্থিক সুবিধা গ্রহণ, অনৈতিক সুবিধা গ্রহণের মাধ্যমে চুক্তিভিত্তিক কর্মী নিয়োগ এবং আর্থিক সুবিধা গ্রহণের মাধ্যমে সাজাপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে উচ্চতর পদে পদায়ন করেন।

মনারুল ইসলামের বিরুদ্ধে করা বিভাগীয় মামলার নোটিশে বলা হয়, মন্ত্রণালয় গঠিত কমিটির প্রতিবেদন এবং বাংলাদেশ ব্যাংক ফিন্যানশিয়াল ইনটেলিজেন্স ইউনিটের প্রতিবেদনে আপনার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগগুলোর সত্যতা প্রতিপাদিত হয়েছে। প্রকল্প চলাকালীন শাবনুর আক্তার নামের এক কর্মীর বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাতের ঘটনা প্রমাণিত হয়। প্রকল্প সমাপ্তির পর শাবনুর আক্তারকে স্থায়ীকরণে মনারুল ইসলামের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। দ্বিতীয় অভিযোগে বলা হয়েছে, পিডিবিএফের কয়েকজন কর্মচারীসহ আরো কিছু ব্যক্তির নামে পরিচালিত ব্যাংক হিসাবে অস্বাভাবিক লেনদেনের সঙ্গে আপনার (মনারুল ইসলাম) সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে।

আমিনুল ইসলামের নম্বরে একাধিকবার ফোন করা হলেও কেউ ধরেননি। পরে এসএমএস দিলেও সাড়া দেননি। মনারুল ইসলাম ফোন রিসিভ করলেও ফোনে কথা বলতে রাজি হননি। তিনি বলেছেন, লিখে পাঠালে প্রমাণসহ উত্তর দেবেন। নিউজের জন্য ছোট করে বক্তব্য চাইলে তিনি ফোনের লাইন কেটে দেন।

‘পিডিবিএফ দুর্নীতির মানিকজোড় আমিনুল-মনারুল’ শিরোনামে গত ১৬ জুন দৈনিক কালের কণ্ঠে প্রকাশিত নিউজে তোলপাড় শুরু হয়। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে প্রেরিত এক চিঠিতে পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগের সচিবকে তদন্তপূর্বক গৃহীত ব্যবস্থা এক মাসের মধ্যে জানানোর জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নির্বাহী সেলের পরিচালক মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান স্বাক্ষরিত ওই চিঠিটি গত ২২ জুন ইস্যু করা হয়। ওই দুই কর্মকর্তার বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনও তদন্তে মাঠে নেমেছে।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের চিঠি প্রসঙ্গে পিডিবিএফ ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, ‘ওই চিঠি পাওয়ার পরপরই মন্ত্রণালয় থেকে আমাদের চিঠি দেওয়া হয়। আমরা বোর্ডসভায় বিভাগীয় মামলা দায়েরের সিদ্ধান্ত নিই। এক মাসের মধ্যেই তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। সেসব বিষয়ে কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়কে অবগত করেছি।’

অভিযোগ মতে, আমিনুল ইসলাম ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক থাকাকালে নিজের কম্পানি সানার্জি টেকনোলজিসকে সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে কাজ দিয়েছেন। তিনজনের নামে গঠিত ওই কম্পানিতে আমিনুল ইসলামের রয়েছে পাঁচ হাজার শেয়ার (মেমোরান্ডাম অ্যান্ড আর্টিক্যাল অব অ্যাসোসিয়েশনের সার্টিফায়েড কপি কালের কণ্ঠে এসেছে)। তিনি সানার্জিকে ২৫টি কার্যাদেশের মাধ্যমে তিন কোটি ২৯ লাখ ৯৬ হাজার ২৬৪ টাকা কাজ প্রদান করেন। তা ছাড়া অন্য একটি সোলার প্রকল্পে সানার্জি টেকনোলজিস লিমিটেডকে ৩০ উপজেলায় ৩০টি কার্যাদেশের মাধ্যমে চার কোটি ২৭ লাখ ২৭ হাজার ৭০০ টাকার কাজ দিয়ে প্রকল্পের টাকা লোপাট করেছেন।



সাতদিনের সেরা