kalerkantho

শনিবার । ৩১ আশ্বিন ১৪২৮। ১৬ অক্টোবর ২০২১। ৮ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

ঊর্ধ্বমুখী ডেঙ্গু, আক্রান্ত ৪৫%ই শিশু-কিশোর

তৌফিক মারুফ   

১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



ঊর্ধ্বমুখী ডেঙ্গু, আক্রান্ত ৪৫%ই শিশু-কিশোর

হাসপাতালগুলোতে করোনার পাশাপাশি এখন ডেঙ্গু রোগীর ভিড়। রাজধানীর শিশু হাসপাতাল থেকে গতকাল তোলা। ছবি : কালের কণ্ঠ

রাজধানীর মিরপুর থেকে ১২ বছরের সন্তান রাইসুলকে নিয়ে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় ঢাকা শিশু হাসপাতালে আসেন আক্তারুল ইসলাম। ভেতরে ঢুকে কয়েক মিনিট পরই ফিরে এসে ছেলেকে নিয়ে তিনি হুড়াহুড়ি করে একই অটোরিকশায় উঠে বসেন। কী হয়েছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এখানে নাকি বেড খালি নাই। সবই ডেঙ্গু রোগীতে ভরা। এখন দেখি অন্য কোনো হাসপাতালে নিয়ে যাব।’ এর পরপরই জরুরি বিভাগের ভেতর থেকে আরেক শিশুকে ধরাধরি করে নিয়ে বেরিয়ে এসে সামনে দাঁড়ানো অ্যাম্বুল্যান্সে ওঠেন হাজারীবাগের সুলতানা বেগম। প্রশ্নের উত্তরে তিনিও বলেন, ‘এইহানে সিট খালি নাইক্কা।’

ঢাকা শিশু হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. সৈয়দ শফি আহম্মেদ মোয়াজ বলেন, ‘এখন আর হাসপাতালে বেড খালি থাকে না। ৬৬ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি আছে এখন। আজ (গতকাল রবিবার) ২০ জনের বেশি রোগী ভর্তি হয়েছে। সবাইকে তো ঠাঁই দেওয়ার উপায় নেই। তাই অনেকেই ফিরে যাচ্ছেন অন্য কোথাও।’

ডা. মোয়াজ জানালেন, শিশু হাসপাতালে করোনা রোগীর চেয়ে অনেক বেশি ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হচ্ছে। কারণ এবার শিশুরাই বেশি আক্রান্ত হচ্ছে ডেঙ্গুতে। গত প্রায় দুই বছরে এই হাসপাতালে করোনা রোগী ভর্তি হয়েছে সাড়ে ৬০০ জন। আর শুধু গত দুই মাসে এখানে ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছে সাড়ে পাঁচ শর বেশি। গতকাল এখানে করোনা রোগী এসেছে চারজন। আর আগে থেকে ভর্তি রয়েছে আটজন। ফলে এখানে ডেঙ্গু রোগী সামাল দেওয়াই মুশকিল হয়ে পড়েছে।

এদিকে ঢাকায় করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীর সংখ্যার কাছাকাছি উঠে গেছে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য বলছে, গতকাল পর্যন্ত ঢাকার সব সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে করোনা রোগী ভর্তি ছিল এক হাজার ৫২৯ জন। সেখানে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা উঠে গেছে এক হাজার ৭৯ জনে। এ ক্ষেত্রে সরকারি হাসপাতালে বেশি করোনা রোগী আর বেসরকারিতে বেশি ডেঙ্গু রোগী। সরকারি হাসপাতালের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ডেঙ্গু রোগী রয়েছে মিটফোর্ড হাসপাতালে। আর সবচেয়ে বেশি করোনা রোগী রয়েছে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে।

স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ ও মিটফোর্ড হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল রশিদ উন নবী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের হাসপাতালে এ বছর সবচেয়ে বেশি ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছে। এখনো প্রতিদিন অন্য হাসপাতালের চেয়ে এখানে বেশি রোগী আসছে। বড়দের পাশাপাশি শিশু ডেঙ্গু রোগীও আছে। বিশেষ করে আজ (গতকাল) মোট ডেঙ্গু রোগী ভর্তি আছে ২৪৮ জন। তাদের মধ্যে ৩৮ জনই শিশু।’

তিনি বলেন, ডেঙ্গু রোগী আগের তুলনায় বেড়েছে। যদিও এত দিন অন্য হাসপাতালগুলোতে করোনার রোগীর চাপ বেশি থাকায় ডেঙ্গু রোগীরা বেশির ভাগই এখানে আসত। এখন অন্য হাসপাতালেও যাচ্ছে।

শিশু রোগীদের তথ্যের সঙ্গে অধ্যাপক ডা. সৈয়দ শফি আহম্মেদের কথার প্রতিফলন দেখা যায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণেও। ওই তথ্য অনুসারে, শেষ ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ৩১৯ রোগীর মধ্যে সর্বোচ্চ ২৫.৮ শতাংশ রোগীর বয়স এক থেকে ১০ বছরের মধ্যে। এরপর ২২.৭ শতাংশের বয়স ২১-৩০ বছর, ১৯.১ শতাংশের বয়স ১১-২০ বছর, ১৬ শতাংশের বয়স ৩১-৪০ বছর, ৬.৩ শতাংশের বয়স ৪১-৫০ বছর, ৫.৯ শতাংশের বয়স ৫১-৬০ বছর এবং ষাট বছরের ওপরে রয়েছে ৪.৩ শতাংশ রোগী।

একই সূত্র অনুসারে চলতি মাসে ডেঙ্গুর প্রকোপ ঊর্ধ্বমুখী হচ্ছে গত মাসের চেয়েও দ্রুতগতিতে। এ বছরে এখন পর্যন্ত এক মাসে সর্বোচ্চ সাত হাজার ৬৯৮ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয় গত মাসে। গড়ে দিনে রোগী ভর্তির সংখ্যা ছিল ২৪৮। কিন্তু এই মাসে দিনে গড়ে ২৯৩ জন করে গত ১২ দিনেই হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে তিন হাজার ৫১৯ জন ডেঙ্গু রোগী। অন্যদিকে গত মাসের তুলনায় গতকাল পর্যন্ত এই মাসে মৃতের সংখ্যা কমের দিকেই রয়েছে। অর্থাৎ গত মাসে মোট মারা যায় ৩৪ জন ডেঙ্গু রোগী। এই মাসে গতকাল পর্যন্ত মারা গেছে আটজন।

মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ও প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত চিকিৎসক অধ্যাপক ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ কালের কণ্ঠকে বলেন, ডেঙ্গু রোগীর বিস্তার খুব দ্রুত ঘটছে। সবাইকে সতর্ক থাকা উচিত। শুধু করোনা নিয়ে থাকলে হবে না, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে আরো জোরালোভাবে কাজ করতে হবে। এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে আরো কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। একই সঙ্গে সুরক্ষার বিষয়ে মানুষকে আরো সচেতন হতে হবে।

এই বিশেষজ্ঞ বলেন, করোনা মহামারি ও ডেঙ্গুর প্রকোপ চলছে। তাই জ্বর হলেই পরীক্ষা করাতে হবে। তবে পরীক্ষায় ডেঙ্গু পজিটিভ হলেই হাসপাতালে ছুটতে হবে এমন নয়। প্লাটিলেট কী পর্যায়ে আছে, অন্য কোনো জটিলতা বা একাধিক রোগ আছে কি না সেগুলো বিবেচনায় নিতে হবে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাপক ডা. নাজমুল ইসলাম বলেন, ‘ডেঙ্গুর জন্য এবার ছয়টি হাসপাতালকে বিশেষায়িত করা হয়েছে। তবে এখন সব হাসপাতালেই কমবেশি ডেঙ্গু রোগীর চিকিৎসা চলছে। এ ক্ষেত্রে আমরা বলব, জ্বর হলেই করোনার পাশাপাশি ডেঙ্গু পরীক্ষা করাটা জরুরি। সরকারি হাসপাতালে ডেঙ্গু পরীক্ষা হচ্ছে ফ্রি। আমরা হাসপাতালগুলোতেও বলে দিয়েছি, জ্বর নিয়ে রোগী এলেই প্রথমে ডেঙ্গু টেস্ট করাতে হবে। এ জন্য সব হাসপাতালে পর্যাপ্ত ডেঙ্গু টেস্ট কিট দেওয়া হয়েছে। হাসপাতালগুলো নিজেরাও কিনছে। তবে আশা করা যাচ্ছে, আগামী মাস নাগাদ ডেঙ্গুর প্রকোপ কমে আসবে।’

শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. খলিলুর রহমান কালের কণ্ঠকে জানান, ওই হাসপাতালে করোনা রোগীর পাশাপাশি এখন প্রতিদিনই বিভিন্ন সংখ্যায় ডেঙ্গু রোগী আসছে।



সাতদিনের সেরা