kalerkantho

মঙ্গলবার । ১০ কার্তিক ১৪২৮। ২৬ অক্টোবর ২০২১। ১৮ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

কম্পানি খোলার কথা বলে প্রতারণা করাই তাঁর কাজ!

ধূর্ত হাসানের ফাঁদে বহু পরিবহন ব্যবসায়ী

জয়নাল আবেদীন   

১২ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



কম্পানি খোলার কথা বলে প্রতারণা করাই তাঁর কাজ!

হাসানুল আমীন

বিত্তশালী পরিবহন ব্যবসায়ীদের সঙ্গে শুরুতে গড়ে তোলেন সখ্য। তারপর সুযোগ বুঝে টোপ দেন কম্পানি খোলার। এরপর কৌশলে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে লাপাত্তা হয়ে যান। কখনো বা যৌথ মালিকানায় কম্পানি খোলার কথা বলে ফুসলিয়ে অন্যদের দিয়ে গাড়ি কেনান। পরে ওই গাড়িগুলো থেকে নানা খাতে নিয়মিত আদায় করেন টাকা। এই ধূর্ত প্রতারকের নাম হাসানুল আমীন তপাদার। লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জ উপজেলার আমীনুল হকের ছেলে তিনি। হাসানের প্রতারণায় সর্বস্বান্ত হয়েছেন বহু পরিবহন ব্যবসায়ী।

ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীরা জানান, ঢাকা-রামগঞ্জ রুটে একই নামের এ পর্যন্ত চারটি কম্পানি খুলেছেন হাসান। প্রতিটি কম্পানিতে যুক্ত করেছেন নতুন নতুন অংশীদার। মূল নাম আল-রিয়াদ। এর সঙ্গে একেক সময় যুক্ত করেছেন একেক নাম। আবার কম্পানির স্বত্ব বিক্রি করে পুনরায় একই নামে নতুন কম্পানি খোলার অভিযোগও রয়েছে হাসানের বিরুদ্ধে। গাড়িপ্রতি বিভিন্ন খাতে চাঁদা আদায়, হোটেলের সঙ্গে চুক্তি করে এককালীন মোটা অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নেওয়া, গাড়ির গ্যারেজ থেকে নানা কৌশলে টাকা আদায়ের বিস্তর অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।

জানা গেছে, হাসানের বাবা আমীনুল হক ঢাকা-সিলেট রুটে ‘মিতালী’ নামের একটি পরিবহন কম্পানির মালিক। সেই সূত্রে তিনিও পরিবহন ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হন। ২০১৮ সালে প্রথম কয়েকজন অংশীদার নিয়ে ঢাকা-রামগঞ্জ রুটে আটটি বাস দিয়ে চালু করেন ‘আল-রিয়াদ এক্সপ্রেস’। কিছুদিনের মধ্যে এই কম্পানির স্বত্ব বিক্রি করে দেন। এরপর খোলেন ‘আল-রিয়াদ ট্রান্সপোর্ট’। এই কম্পানিটি খোলার সময় সঙ্গে নেন পার্ক লাইনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহবুবুল হককে। এখান থেকেও কৌশলে সরে পড়েন হাসান। কিছুদিন পর নতুন কয়েকজন অংশীদারকে রাজি করিয়ে খোলেন ‘আল-রিয়াদ এয়ারকন লিমিটেড’। শুরুর দিকে অন্যদের উদ্বুদ্ধ করতে নিজের এবং বাবার নামে দুটি গাড়ি বুকিং দেন। কিন্তু পরে নিজে না কিনে অন্যদের গাড়ি দিয়ে কম্পানি চালুর কৌশল নেন। এক পর্যায়ে অংশীদারদের ফাঁসিয়ে সটকে পড়েন সেখান থেকেও। সর্বশেষ খোলেন ‘আল-রিয়াদ বিলাস’। এই কম্পানির গাড়ি রাস্তায় নামলেও চলে মাত্র তিন দিন। হাসানের প্রতারণার শিকার হয়ে শুধু গাড়িই বন্ধ হয়নি, বিপুল ক্ষতির মুখে পড়েন অংশীদাররা।

আল-রিয়াদ এয়ারকনের চেয়ারম্যান করা হয়েছিল অনিক ইসলামকে। নবীনগর-আবদুল্লাহপুর রুটে ‘আশুলিয়া ক্লাসিক’ নামে অনিকের গাড়ি রয়েছে। পরিবহন ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত থাকায় হাসানের সঙ্গে পরিচয় ও ঘনিষ্ঠতা হয় অনিকের।

অনিক বলেন, ‘কম্পানি গঠনের যাবতীয় প্রক্রিয়া শেষে সবাই যখন গাড়ি বুকিং দিই, তখন জানতে পারি, হাসানের কোনো গাড়ি থাকবে না এ কম্পানিতে। তাঁর সম্পর্কে খোঁজখবর নিতে গিয়ে জানলাম, এর আগেও সে এভাবে কম্পানি খুলে সটকে পড়েছে। কম্পানির নামে ১১ লাখ টাকা নেন বডি গ্যারেজ থেকে। সে টাকার দায়ভার এখন আমাদের ওপর।’

অনিক আরো বলেন, ‘কভিড-১৯ পরিস্থিতিতে ঢাকায় অফিস নিয়ে চরম বিপাকে পড়তে হয়েছে। লকডাউন শেষে সরকার যখন যানবাহন চলাচলের অনুমতি দেয়, তখন জানতে পারি এই কম্পানির স্বত্ব আগেই বিক্রি করে দিয়েছেন হাসান। এ পরিস্থিতিতে এই নামে রাস্তায় গাড়ি নামানোর সুযোগ নেই। ফলে আমরা বাধ্য হয়ে গাড়িগুলো অন্য একটি কম্পানির ব্যানারে চালাচ্ছি।’

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মিজানুর রহমানের কাছে ‘আল-রিয়াদ’ কম্পানির স্বত্ব বিক্রি করেছিলেন হাসান। নানা প্রলোভন দেখিয়ে কম্পানির লাইসেন্স বিক্রি করেন ২৪ লাখ টাকা। সাধারণত এ ধরনের লাইসেন্স পেতে সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা খরচ হয়।

মিজানুর রহমান কালের কণ্ঠকে জানান, আল-রিয়াদ পরিবহনের বাসগুলো তাঁর মালিকানাধীন মায়ামী হোটেলে (কুমিল্লা) যাত্রাবিরতি করত। এসংক্রান্ত একটি চুক্তিও হয়েছিল উভয় পক্ষের মধ্যে। এক পর্যায়ে আল-রিয়াদ পরিবহনের লাইসেন্স তাঁর (মিজানুরের) কাছে বিক্রি করেন হাসান। তবে কিছুদিন পরে হাসান একই নামে একই রুটে বাস নামান। এ বিষয়ে মিজানুরের মামলায় তিন মাস জেলও খাটেন হাসান। কিছুদিন আগে পরিবহন ব্যবসায়ী নেতাদের হস্তক্ষেপে বিষয়টির সুরাহা হয়েছে।

মিজানুর আরো বলেন, ‘হাসানের নেতৃত্বে একটি সংঘবদ্ধ চক্র প্রতিনিয়ত পরিবহন ব্যবসায়ীদের সঙ্গে প্রতারণা করে আসছে। প্রলোভন দেখিয়ে প্রথমে কিছু গাড়ি ধরিয়ে দেয়। প্রথমে পায় কম্পানি থেকে কমিশন, এরপর বডি প্রতিস্থাপন ও নানা মেরামতের কাজে শুরু করে জালিয়াতি।’

হাসানের প্রতারণার আরেক শিকার লক্ষ্মীপুর জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মো. শাহজাহান। কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, ‘আমার ছেলেকে একটি কম্পানির পরিচালক বানানোর কথা বলে আমার কাছ থেকে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নিয়েছে হাসান। সে এতটাই ধূর্ত, আংকেল আংকেল বলে এমনভাবে মিশে গিয়েছিল, তার চতুরতা বুঝতেই পারিনি। কিছুদিনে সখ্য গড়ে টাকা হাতিয়ে নিয়ে দ্রুতই সটকে পড়ে। একইভাবে আরো বহু মানুষের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিয়েছে হাসান।’

জানতে চাইলে ঢাকা-ফেনী-নোয়াখালী-লক্ষ্মীপুর আন্ত জেলা বাস মালিক সমিতির সভাপতি হাজি আলাউদ্দিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘পরিবহন খাতে অনেকেই হাসানের প্রতারণার শিকার বলে শুনেছি। দুই সপ্তাহ আগে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির কার্যালয়ে একটি বৈঠক হয়েছিল। সেখানেও দু-তিনজন পরিবহন মালিক হাসানের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন। হাসানের বিরুদ্ধে তাঁরা মূলত প্রতারণার অভিযোগ করেছেন। আমাদের সমিতিতেও তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে।’

হাসানের প্রতারণার শিকার ঢাকার আরিফুল ইসলাম জানান, তাঁকে আল-রিয়াদ এয়ারকন লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বানানো হয়েছিল। চুক্তির শর্তানুযায়ী তিনিও দুটি গাড়ি দিয়েছিলেন কম্পানিতে। কিন্তু শেষমেশ ওই কম্পানির নামে আর গাড়ি রাস্তায় নামানো যায়নি। কারণ হাসান আগেই এ কম্পানির স্বত্ব বিক্রি করে দিয়েছেন।

আরিফুল বলেন, ‘এভাবে বহু ব্যবসায়ীর সঙ্গে প্রতারণা করে আসছেন হাসান। কখনো মন্ত্রী, কখনো বা পরিচিত পরিবহন নেতাদের দিয়ে গাড়ি উদ্বোধন করান। পরে কম্পানি খুলতে সেই ছবি দেখিয়ে অন্যদের উদ্বুদ্ধ করেন। সরলমনে হাসানকে বিশ্বাস করে ঠকতে হয়েছে।’

এ বিষয়ে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব এনায়েত উল্লাহ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘হাসানের বিরুদ্ধে দু-তিনটি অভিযোগ এসেছিল আমার কাছে। এর মধ্যে একটি অভিযোগের বিষয়ে দুই পক্ষকে ডেকে সমাধান করে দিয়েছি। বাকি দুটি অভিযোগ আমাদের এখতিয়ারের বাইরে। তাই সেগুলো নিয়ে আমরা কিছু করতে পারিনি।’

তিনি জানান, কারো সঙ্গে যদি প্রতারণার ঘটনা ঘটে, তাঁরা নিশ্চয়ই আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন। কারণ সেগুলো নিয়ে সমিতির কিছু করণীয় নেই।

অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে হাসানুল আমীন তপাদারের মোবাইল ফোনে কল করলেও তিনি রিসিভ করেননি।



সাতদিনের সেরা