kalerkantho

বৃহস্পতিবার  । ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৮। ৯ ডিসেম্বর ২০২১। ৪ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৩

সবল বাজারে দুর্বল শেয়ারের ‘কূটচাল’

► শেয়ার কারসাজিকারীদের শনাক্ত করতে মাঠে ডিএসই
► ৯ কম্পানির শেয়ারের দর বাড়ার কারণ খুঁজতে তদন্ত কমিটি
► পেইড আপ ক্যাপিটাল ৩০ কোটি টাকার নিচে ৬৯ কম্পানি শনাক্ত

মাসুদ রুমী   

১২ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



সবল বাজারে দুর্বল শেয়ারের ‘কূটচাল’

বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) কার্যকর পদক্ষেপ আর বাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে খাদের কিনারা থেকে ফের ঘুরে দাঁড়িয়েছে পুঁজিবাজার। তবে স্বল্প মূলধনী কম্পানির শেয়ারে ‘কারসাজি’ করে পুঁজিবাজার অস্থিতিশীল করতে আবারও একটি চক্র তৎপর হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তাঁরা বলছেন, স্থিতিশীল এই বাজারকে আবারও কেউ যাতে অস্থিতিশীল করতে না পারে সে জন্য নজরদারি বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে ভালো শেয়ারের জোগানের পাশাপাশি বিনিয়োগকারীদেরও সচেতন করতে হবে। 

দেশের প্রধান পুঁজিবাজারে গত ৫ সেপ্টেম্বর মূল্যসূচক সাত হাজার পয়েন্টের মাইলফলক পাড়ি দেয়। প্রায় সাড়ে ১০ বছর পর ঘটল এমন ঘটনা। একই সঙ্গে বাজার মূলধনেও হয় নতুন রেকর্ড। গত সপ্তাহজুড়ে মূল্যসূচকের উত্থান অব্যাহত ছিল। সপ্তাহের শেষ কার্যদিবস গত বৃহস্পতিবার লেনদেনের শুরুতে মূল্যসূচকে বড় পতন দেখা দিলেও শেষ পর্যন্ত বড় উত্থান হয়েছে।

বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রধান বাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) এবং আরেক বাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) সব কয়টি মূল্যসূচকের বড় উত্থানের সঙ্গে বেড়েছে লেনদেনের পরিমাণ। ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স আগের দিনের চেয়ে ৬২ পয়েন্ট বেড়ে সাত হাজার ২৫৮ পয়েন্টে ঠেকেছে। ডিএসইর বাজার মূলধন বেড়ে এখন পাঁচ লাখ ৮৬ হাজার ৩১৮ কোটি টাকা হয়েছে, যা ইতিহাসের সর্বোচ্চ। গত বৃহস্পতিবার হাতবদল হয়েছে দুই হাজার ৬৯৬ কোটি ৫৮ লাখ টাকার শেয়ার, যা আগের কর্মদিবসে ছিল দুই হাজার ৫৫৫ কোটি ৫৩ লাখ টাকা।

অন্যদিকে চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জেও (সিএসই) গত বৃহস্পতিবার প্রধান সূচক সিএএসপিআই ১৫২.৩৭ পয়েন্ট বেড়ে হয়েছে ২১ হাজার ১৩১.৩৯ পয়েন্ট। মোট ৯৬ কোটি ৭৩ লাখ টাকার শেয়ার ওই দিন লেনদেন হয়েছে, যা আগের দিন ছিল ৮৪ কোটি ৪৫ লাখ টাকা।

তবে এত সব ইতিবাচক খবরের আড়ালেও চলছে কিছু নেতিবাচক ঘটনা। শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত ৯ কম্পানির অস্বাভাবিক দর বাড়ায় কম্পানিগুলোর কর্তৃপক্ষের মতামতের ভিত্তিতে ডিএসই কম্পানিগুলোর শেয়ার নিয়ে সতর্কবার্তা জারি করেছে। কম্পানি ৯টি হলো ইমাম বাটন, ডরিন পাওয়ার, এডিএন টেলিকম, দুলামিয়া কটন, শেফার্ড, ডমিনেজ স্টিল, ইস্টার্ন লুব্রিকেন্টস, সমতা লেদার ও বাংলাদেশ সাবমেরিন কেবল।

গত ২৬ আগস্ট সমতা লেদারের শেয়ারের দর ছিল ৮৫.৯০ টাকা। আর ৮ সেপ্টেম্বর কম্পানিটির শেয়ারের দর বেড়ে দাঁড়ায় ১২২.৭০ টাকায়। অর্থাৎ এই ৮ কার্যদিবসে কম্পানিটির শেয়ারের দর ৩৬.৮০ টাকা বা ৪৩ শতাংশ বেড়েছে।

ইমাম বাটনের শেয়ারের দর গত ৯ আগস্ট ছিল ৩২ টাকা ৫০ পয়সা। ৫ সেপ্টেম্বর কম্পানিটির শেয়ারের দর ৪৩ টাকা ৫০ পয়সায় উন্নীত হয়। অর্থাৎ এই ২৫ কার্যদিবসে কম্পানিটির শেয়ারের দর ১১ টাকা বা ৩৩.৮৪ শতাংশ বেড়েছে।

ডরিন পাওয়ারের শেয়ারের দর গত ৯ আগস্ট ছিল ৭০ টাকা ২০ পয়সা। ৬ সেপ্টেম্বর কম্পানিটির শেয়ারের দর ৯১ টাকা ৩০ পয়সায় ওঠে। অর্থাৎ এই ২৫ কার্যদিবসে কম্পানিটির শেয়ারের দর ২১ টাকা ১০ পয়সা বা ৩০.০৫ শতাংশ বেড়েছে।

এডিএন টেলিকমের শেয়ারের দর গত ৩১ আগস্ট ছিল ৬১ টাকা ৩০ পয়সা। ৯ সেপ্টেম্বর কম্পানিটির শেয়ারের দর ৭৮ টাকা ৬০ পয়সায় ওঠে। অর্থাৎ এই সাত কার্যদিবসে কম্পানিটির শেয়ারের দর ১৭ টাকা ৩০ পয়সা বা ২৮.২২ শতাংশ বেড়েছে।

গত ১৮ আগস্ট দুলামিয়া কটনের শেয়ারের দর ছিল ৫৮ টাকা ৯০ পয়সা। গত ৭ সেপ্টেম্বর কম্পানিটির শেয়ারের দাম বেড়ে দাঁড়ায় ৭৮ টাকা ৫০ পয়সায়। অর্থাৎ এই ১৩ কার্যদিবসে কম্পানিটির শেয়ারের দাম বেড়েছে ১৯ টাকা ৬০ পয়সা, যা ৩৩ শতাংশ।

গত ২৯ আগস্ট ডমিনেজ স্টিলের শেয়ারের দাম ছিল ২৯ টাকা ৪০ পয়সা। আর ৭ সেপ্টেম্বর দাম বেড়ে দাঁড়ায় ৩৮ টাকা ১০ পয়সায়।

এমন অনেক স্বল্প মূলধনী, লোকসানি, উৎপাদন বন্ধ থাকা এবং নামমাত্র আয়ের কম্পানিগুলোর অস্বাভাবিক হারে দর বাড়ার পেছনে কারসাজির অভিযোগ উঠেছে। ডিএসই জানায়, ৯ কম্পানির শেয়ারের দর অস্বাভাবিকভাবে বাড়ার কারণে সপ্তাহজুড়ে নোটিশ পাঠায় প্রতিষ্ঠানটি। এর জবাবে কম্পানিগুলো জানায়, কোনো অপ্রকাশিত মূল্য সংবেদনশীল তথ্য ছাড়াই শেয়ারগুলোর দর বাড়ছে। বাজারকে অস্থিতিশীলতা থেকে রক্ষা করতে নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্দেশনা পেয়ে যেসব শেয়ারের মূল্য-আয় অনুপাত (পিই রেশিও) ৪০-এর বেশি রয়েছে, সেসব শেয়ারে নিয়মবহির্ভূতভবে মার্জিন ঋণ দেওয়া হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে মাঠে নেমেছে ডিএসই।

এর আগে গত বুধবার শেয়ারবাজার বিএসইসি ৪০-এর বেশি পিই রেশিওর শেয়ারের দর বাড়ার কারণ তদন্ত করতে ডিএসইকে লিখিত নির্দেশনা দেয়। নির্দেশনায় আগামী ১৫ দিনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়েছে।

সর্বশেষ প্রকাশিত ইপিএস অনুযায়ী, গত বুধবার দিন শেষে ডিএসইতে তালিকাভুক্ত ৩৪৫ কম্পানির শেয়ারের মধ্যে ৭২টির পিই রেশিও ছিল মোট শেয়ারের প্রায় ২১ শতাংশ। পিই রেশিও ১০০-এর ওপরে রয়েছে ৩৩টি শেয়ার। গত সোয়া এক বছরে এসব শেয়ারের বাজারদর দ্বিগুণ থেকে সাড়ে ১৮ গুণ হয়েছে। ৫০ থেকে ৯৩ শতাংশ বেড়েছে ১৯টির দাম।

বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলাম সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, পুঁজিবাজার আরো বড় হবে। এ জন্য যাঁরা এখানে বিনিয়োগ করেন, তাঁদের সঞ্চয়ের নিরাপত্তা দিতে হবে।

জানতে চাইলে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, শেয়ারবাজারে সব সময় বিনিয়োগকারীদের সতর্ক থাকা উচিত। যেহেতু সাম্প্রতিককালে ঊর্ধ্বগতি বেশি চলছে, তাই বিনিয়োগকারীদের সতর্ক থাকা উচিত। জাংক শেয়ারের দাম যে বাড়ে, সেই সব শেয়ারে বিনিয়োগ থেকে সরে আসা উচিত। এই অর্থনীবিদ বলেন, দুর্বল কম্পানির শেয়ারের অস্বাভাবিক দর বাড়ার পেছনে কারসাজি হচ্ছে, না বিনিয়োগকারীদের নির্বুদ্ধিতার কারণে হচ্ছে তা নিয়ন্ত্রক সংস্থার খতিয়ে দেখা উচিত।

নিয়ন্ত্রক সংস্থার পদক্ষেপ সম্পর্কে জানতে চাইলে বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মোহাম্মদ রেজাউল করিম বলেন, ‘আমরা ৬৯টি কম্পানি শনাক্ত করেছি, যেগুলোর পেইড আপ ক্যাপিটাল ৩০ কোটি টাকার নিচে। এর মধ্যে কিছু আছে উৎপাদন বন্ধ, আবার কিছু আছে অপারেশন আছে কিন্তু শেয়ারপ্রতি আয় নেগেটিভ। এসব কম্পানির শেয়ারের ভ্যালু যা হওয়া উচিত তার চেয়ে বেশি দাম বেড়ে যাওয়ায় এগুলো পর্যালোচনায় একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।’

তিনি বলেন, যে ৯টি কম্পানির শেয়ারের দর অস্বাভাবিক বেড়েছে, সেগুলো নিয়ে একটি তদন্ত কমিটি কাজ করছে। বাজারে কোনো ইনসাইডার ট্রেডিং, ম্যানুপুলেশন হচ্ছে কি না, কোনো ম্যালপ্র্যাকটিস হচ্ছে কি না, তা দেখা হচ্ছে। সম্প্রতি ডিএসইকেও যেসব কম্পানির পিই রেশিও ৪০-এর ওপরে আছে এবং কী কারণে শেয়ারের দাম বাড়ল, তা খতিয়ে দেখার জন্য বলা হয়েছে। কোনো বেআইনি ট্রেডিং অ্যাক্টিভিটি হচ্ছে কি না কিংবা যেগুলোর ৪০ পিইর ওপরে সেসব শেয়ার ঋণ পাওয়ার অযোগ্য হওয়ার পরও ঋণ দেওয়া হচ্ছে কি না, তা জেনে বিএসইসিকে জানাতে বলা হয়েছে। প্রতিবেদন পাওয়ার পর কমিশন এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নেবে।



সাতদিনের সেরা